সিউল থেকে ১৩০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে দক্ষিণ কোরিয়ার ইয়াংগু কাউন্টি। সেখানকার একটি খেতে আলুর চাষ করেছিলেন লি সাং-হিউক। তিনি সম্প্রতি মাটি খুঁড়ে দেখেন আলু বিক্রির করার মতো অবস্থায় নেই।
দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন অনুসারে, এক সপ্তাহ আগেও গ্যাংওন প্রদেশের ওই জমির আলুগুলো ভালোই ছিল। কিন্তু এখন মাটি খুঁড়ে তোলা আলুগুলো নরম হয়ে গলে পড়ছে— ‘সেদ্ধ আলুর মতো’। তীব্র গরমে মাটি যেন চুলার ওভেনে পরিণত হয়েছে, যার কারণে আলু নষ্ট হয়ে গেছে।
স্থানীয় সম্প্রচারমাধ্যম এসবিএসকে তিনি বলেন, ‘এটা শুধু এক-দুটি খেতের ঘটনা নয়। কীভাবে বিষয়টি ভাষায় প্রকাশ করব, বুঝতে পারছি না। খুবই কষ্ট লাগছে।’
তার নষ্ট হয়ে যাওয়া ফসল পূর্ব এশিয়াজুড়ে চলা ভয়াবহ গরমেরই একটি চিত্র। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোয় দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান ও হংকংয়ে রেকর্ড তাপমাত্রা দেখা গেছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় শহর ইয়াংসানে গত ২ আগস্ট তাপমাত্রা ৪২ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছায়। দেশটিতে আধুনিক আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ শুরু হয় ১৯০৪ সালে, এর পর থেকে এটিই সর্বোচ্চ তাপমাত্রা।
দেশটির রোগ নিয়ন্ত্রণ সংস্থার তথ্যানুযায়ী, এই তীব্র গরমে এখন পর্যন্ত অন্তত ৩১ জনের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া ৯ লাখের বেশি গবাদিপশু এবং খামারের ১৪ লাখ মাছ মারা গেছে।
কর্তৃপক্ষ তাপপ্রবাহের সতর্কতা জারি করে মানুষকে ‘অবিলম্বে বাইরের সব ধরনের কার্যক্রম বন্ধ করার’ আহ্বান জানিয়েছে।
প্রতিবেশী জাপানেও বিভিন্ন এলাকায় তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার বেশি হয়েছে। চলতি বছর দেশটির আবহাওয়া সংস্থা ৪০ ডিগ্রির বেশি তাপমাত্রার জন্য এই নতুন শ্রেণি চালু করেছে।
টোকিওর একটি চিড়িয়াখানায় হিটস্ট্রোকে তিনটি সিংহ মারা গেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই চরম তাপমাত্রা আরো বিস্তৃত একটি প্রবণতার অংশ। জাপানের ওয়েদার অ্যাট্রিবিউশন সেন্টারের গবেষকরা বলছেন, বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ছাড়া জুলাইয়ে জাপানে এতটা তীব্র তাপপ্রবাহ ‘প্রায় অসম্ভব’ ছিল।
গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, মানুষের কর্মকাণ্ডের কারণে সৃষ্ট উষ্ণায়ন না থাকলে এ মাত্রার তাপপ্রবাহ গড়ে প্রতি ১০ হাজার বছরে একবার দেখা যেত।
চলতি বছর এল নিনো পরিস্থিতি চলার মধ্যেই এ তাপপ্রবাহ আঘাত হেনেছে। অতীতে জাপানে এল নিনোর সঙ্গে গ্রীষ্মকালে চরম তাপমাত্রার সম্পর্ক কমই দেখা গেছে।
হংকংয়ে আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ সংস্থা ৩৬ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করেছে, যা ১৮৮৪ সালে রেকর্ড রাখা শুরুর পর শহরটির সর্বোচ্চ তাপমাত্রা। টাইফুন ডলফিনের বাইরের অংশের প্রভাবে গরম বাতাস শহরটির ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় এই তাপমাত্রা তৈরি হয়।
এ রেকর্ড গরম শহরটির বাইরে কাজ করা শ্রমিকদের জন্য তাপজনিত ঝুঁকির সতর্কতা ব্যবস্থার দুর্বলতাও সামনে এনেছে। তাপমাত্রা রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছালেও সতর্কতার মাত্রা সর্বনিম্ন পর্যায়েই ছিল। এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন হংকং অবজারভেটরির সাবেক প্রধান লাম চিউ-ইং। তিনি ফেসবুকে লিখেছেন, রেকর্ড ভাঙা তাপমাত্রাও যদি রেড অ্যালার্ট চালু করতে না পারে, তাহলে এটি কি শুধু দোকানের সাজানোর প্রদর্শনী সামগ্রী?
এর পর হংকংয়ের শ্রম বিভাগ জানিয়েছে, তারা আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ সংস্থার সঙ্গে সতর্কতা ব্যবস্থাটি পর্যালোচনা করছে।
চীনের পশ্চিমাঞ্চলীয় শিনজিয়াং অঞ্চলে জুলাইয়ে একটি আবহাওয়া স্টেশনে ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড হয়েছে। দেশটির উত্তর-পূর্বাঞ্চলেও তাপপ্রবাহ বয়ে গেছে। অন্যদিকে উত্তর কোরিয়ার রাজধানী পিয়ংইয়ংয়ে একটানা কয়েক রাত তাপমাত্রা ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নামেনি।
পুসান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির জলবায়ুবিজ্ঞানী এবং জাতিসংঘের সর্বশেষ জলবায়ু মূল্যায়ন প্রতিবেদনের সমন্বয়কারী প্রধান লেখক জুন-ই লি বলেন, বায়ুমণ্ডলীয় প্রবাহের বিভিন্ন ধরন এবং উষ্ণ হয়ে ওঠা জলবায়ুর সম্মিলিত প্রভাবে এ আঞ্চলিক তাপপ্রবাহ তৈরি হয়ে থাকতে পারে।
তার মতে, তিব্বত মালভূমি ও পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ওপর শক্তিশালী উচ্চচাপ বলয় এবং এল নিনো মিলিত হয়ে এই তাপপ্রবাহের জন্য অনুকূল পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার (ডব্লিউএমও) সর্বশেষ ‘স্টেট অব দ্য ক্লাইমেট ইন এশিয়া’ প্রতিবেদ অনুসারে, ১৯৯১ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে এশিয়ায় উষ্ণায়নের গতি আগের ৩০ বছরের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।
অধ্যাপক লি সতর্ক করে বলেন, জলবায়ু যত উষ্ণ হবে, তাপপ্রবাহ তত ঘন ঘন এবং আরো তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। পাশাপাশি পরপর তাপপ্রবাহ এবং ভারি বৃষ্টির মতো একাধিক চরম আবহাওয়ার ঘটনা একসঙ্গে ঘটার প্রবণতাও বাড়ছে।
তিনি বলেন, ‘বৈশ্বিক উষ্ণায়ন আররো বাড়া ঠেকাতে গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ দ্রুত ও ব্যাপকভাবে কমানো জরুরি। একই সঙ্গে এরই মধ্যে ঘটে চলা জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলায় সুপরিকল্পিত অভিযোজন ব্যবস্থা নিতে হবে।’