গাজার ‘ইয়েলো লাইন’ পশ্চিমে এগোচ্ছে, বাস্তুচ্যুতদের যাওয়ার জায়গা নেই

যুদ্ধবিরতি সত্ত্বেও গত এক বছরে ইসরায়েলি হামলায় প্রায় ১ হাজার ৫০০ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। ২০২৩ সালের অক্টোবরে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে নিহতের সংখ্যা ৭৪ হাজার ছাড়িয়েছে। এছাড়া, ইসরায়েলের যুদ্ধ ও ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞে গাজার অধিকাংশ মানুষ একাধিকবার বাস্তুচ্যুত হয়েছেন

গাজার পূর্বাঞ্চলীয় শুজাইয়ায় ইসরায়েলের তথাকথিত ‘ইয়েলো লাইন’ বা হলুদ রেখার প্রায় ২০০ মিটার দূরে তাঁবু খাটাচ্ছেন বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনি মাহমুদ হারজিন। পরিবার নিয়ে ষষ্ঠবারের মতো ঘর বদলের প্রস্তুতি নিচ্ছেন ৩৫ বছর বয়সী এ ব্যক্তি। ইসরায়েলি বাহিনী রেখাটি যতবার সামনে এগিয়ে নিচ্ছে, বিপদ এড়াতে ততবারই পরিবার নিয়ে পিছু হটছেন তিনি। তবে প্রতিবারের আশ্রয়ই হয়ে উঠছে সাময়িক।

আল জাজিরাকে হারজিন বলেন, তারা যতবার একটু সামনে এগোয়, আমরাও ততবার একটু পেছনে সরে যাই।

২০২৫ সালের অক্টোবরে যুদ্ধবিরতি চুক্তির অংশ হিসেবে গাজার ভূখণ্ডকে ইসরায়েলি ও ফিলিস্তিনি নিয়ন্ত্রিত এলাকায় ভাগ করে দেয় ‘ইয়েলো লাইন’। চুক্তি অনুযায়ী, ইসরায়েলি বাহিনী এ রেখার পেছনে সরে গেলেও পরে রেখাটি গাজার আরো ভেতরে এগিয়ে নিয়েছে।

জাতিসংঘের হিসাবে, বর্তমানে গাজার প্রায় ৬৫ শতাংশ ভূখণ্ড ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে, যা এক বছর আগে নির্ধারিত ৫৩ শতাংশের চেয়ে বেশি।

গত ১১ অক্টোবর গাজা সিটির পূর্বাঞ্চলীয় শুজাইয়ায় হলুদ কংক্রিটের ব্লকগুলো কয়েক মিটার পশ্চিমে সরিয়ে নেয় ইসরায়েলি বাহিনী। এতে এলাকার আরো বেশি অংশ ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। আবারো ঘর ছাড়তে বাধ্য হয় ফিলিস্তিনি পরিবারগুলো।

১০ সদস্যের পরিবারের ভরণপোষণ করেন হারজিন। গত এক বছরে পরিবার নিয়ে কখন কোথায় আশ্রয় নিয়েছেন সেই তারিখ মনে নেই তার। তবে জায়গার নাম মনে আছে—জেইতুন, সাহাত আল-শাওয়া ও আল-মুনতাজাহ।

তিনি বলেন, প্রায় ছয়বার জায়গা বদল করেছি। রেখাটি একটু এগিয়ে এলেই বিপদ মনে হতো। তাই পেছনে সরে গিয়ে কিছুদিন থাকার চেষ্টা করতাম।

সর্বশেষ তাঁবুতে খাটিয়ে সেখানে এক রাত ঘুমানোর পর সকালে জানতে পারেন, ইসরায়েলি বাহিনী আবারো ‘ইয়েলো লাইন’ এগিয়ে নিয়েছে। তাই বিছানাপত্র ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে আবারো সরে যেতে হয় তাদের।

হারজিন বলেন, যেদিন রেখাটি সরানো হয়, সেদিন রাতে ট্যাংক আসে, পদাতিক সেনারা এগিয়ে যায়, গোলা ছোড়া হয়। এসবই করা হয় হলুদ ব্লকটি একটু সামনে সরানোর জন্য।

যুদ্ধবিরতি সত্ত্বেও গত এক বছরে ইসরায়েলি হামলায় প্রায় ১ হাজার ৫০০ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। ২০২৩ সালের অক্টোবরে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে নিহতের সংখ্যা ৭৪ হাজার ছাড়িয়েছে। এছাড়া, ইসরায়েলের যুদ্ধ ও ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞে গাজার অধিকাংশ মানুষ একাধিকবার বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।

রাতে পালানো, সকালে ফিরে আসা

৩২ বছর বয়সী আসমা আলীর পরিবারেও বাস্তুচ্যুতির একই চক্র চলছে। শুজাইয়ার তিন সন্তানের এ জননী জানান, যুদ্ধবিরতি শুরুর পর থেকে সাত-আটবার জায়গা বদল করেছেন তারা।

গাজা সিটির কেন্দ্রীয় এলাকায় কিছুদিন থাকার পর শুজাইয়ার আল-মান্তার এলাকায় স্থায়ীভাবে বসবাসের আশায় ফিরে এসেছিলেন তারা। কিন্তু এক মাসের মাথায় আবারো গোলাবর্ষণ শুরু হয়। নতুন করে ঘর ছাড়ার আশঙ্কায় প্রথমে একটি স্কুলে আশ্রয় নেন। পরে বাসস্ট্যান্ডের কাছে একটি বাড়িতে ওঠেন, সেখানে থেকেও বেরিয়ে পড়তে হয় তাদের। এবার গাজা সিটির কেন্দ্রীয় এলাকায় স্বজনদের কাছে আশ্রয় নেন।

আসমা বলেন, প্রতিদিন রাতে পালিয়ে যেতাম, সকালে আবার ফিরে আসতাম। রাতটা কাটানোর জন্য কোথাও আশ্রয় খুঁজতে হতো, পরদিন সকালে আবার ফিরে আসতাম।

একবার যে বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলেন, সেটি ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় স্বর্ণালংকার, গৃহস্থালির জিনিসপত্র ও সন্তানদের পোশাকসহ সব হারিয়েছেন আসমা। হারিয়েছে তার প্রতিবন্ধী ছেলের ব্যবহারের জন্য কেনা একটি বিশেষ ব্রেসও।

আসমার চাওয়া খুব সাধারণ—এমন একটি নিরাপদ জায়গা, যেখানে তার সন্তানদের নিয়ে নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারবেন, বারবার পালাতে হবে না।

আরও