জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ইউরোপে দাবানল সৃষ্টির অনুকূল আবহাওয়া আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। নতুন এক বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, জলবায়ু সংকটের কারণে স্পেনে ভয়াবহ গরম, খরা ও শুষ্ক আবহাওয়ার মতো পরিস্থিতি অন্তত ২০ গুণ এবং ফ্রান্সে প্রায় দুই গুণ বেশি ঘটার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। খবর দ্য গার্ডিয়ান।
বিজ্ঞানীদের আন্তর্জাতিক জোট ওয়ার্ল্ড ওয়েদার অ্যাট্রিবিউশন (ডব্লিউডব্লিউএ)-এর এই বিশ্লেষণ বলছে, জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানোর ফলে সৃষ্ট বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ইউরোপের ভয়াবহ গ্রীষ্ম ও দাবানলকে আরো তীব্র করে তুলছে।
এর আগে ডব্লিউডব্লিউএর আরেক গবেষণায় বলা হয়েছিল, জুনের শেষের তীব্র তাপপ্রবাহ মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তন ছাড়া সম্ভব হতো না। ওই সময় গরমে আনুমানিক ২০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। আরেকটি গবেষণায় দেখা যায়, জলবায়ু সংকটের কারণে ইউরোপে চরম খরা ছড়িয়ে পড়ায় মাটির আর্দ্রতা দ্রুত কমে যাচ্ছে।
নতুন বিশ্লেষণ বলছে, প্রচণ্ড তাপ ও শুষ্ক ভূমির কারণে দাবানলের তীব্রতার সূচক ডিএসআর খুবই উচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। দাবানল কতটা ভয়াবহ হতে পারে, তা এ সূচক দিয়ে পরিমাপ করা হয়। ২০২৫ সালে হওয়া গবেষণাগুলোও একইভাবে দেখিয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তন দাবানলকে আরো ভয়াবহ করে তুলেছে।
গবেষকদের মতে, চলতি বছরে পশ্চিম ইউরোপের দাবানল আরো তীব্র হওয়ার একটি কারণ শীত ও বসন্তে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত। এতে প্রচুর উদ্ভিদ জন্মায়, পরে গ্রীষ্মে সেগুলো শুকিয়ে গিয়ে জ্বালানিতে পরিণত হয়। এ পরিস্থিতিকে ‘হুইপল্যাশ কন্ডিশন’ বলা হয়। বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে ইউরোপে শীত আরো আর্দ্র এবং গ্রীষ্ম আরো গরম ও শুষ্ক হয়ে উঠছে।
ছবি: রয়টার্স
ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের গবেষক এবং ডব্লিউডব্লিউএ দলের সদস্য ড. ক্লেয়ার বার্নস বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন বারবার এমন গরম, শুষ্ক ও দাহ্য পরিবেশ তৈরি করছে, যা দাবানল ছড়িয়ে পড়ার জন্য অত্যন্ত অনুকূল।
তিনি বলেন, ‘স্পেন ও ফ্রান্সে জুলাইয়ের দাবানলের বিশেষ দিক হলো, এটি মৌসুমের একেবারে শুরুতেই ঘটেছে। সামনে আরো একটি তাপপ্রবাহের আশঙ্কা রয়েছে। তাই এ ফলাফল অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এটি মানবসৃষ্ট উষ্ণায়নের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের স্পষ্ট ইঙ্গিত।’
রেড ক্রস রেড ক্রিসেন্ট ক্লাইমেট সেন্টারের কর্মসূচি পরিচালক জুলি অ্যারিগি বলেন, স্পেন ও ফ্রান্সে এখন যা ঘটছে, তা অতীতের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে করা পূর্বাভাসের তুলনায় অনেক বেশি।
এদিকে দাবানল থেকে বিপুল পরিমাণ বিষাক্ত ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়েছে। ফরাসি ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর ইন্ডাস্ট্রিয়াল এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড রিস্কসের গবেষক ড. অগুস্তাঁ কোলেত বলেন, দাবানলের ধোঁয়ার কারণে বাতাসে ক্ষুদ্র কণাদূষণের মাত্রা গ্রহণযোগ্য বায়ুমানের সীমার তুলনায় ২০ গুণ পর্যন্ত বেড়েছে। অগ্নিকাণ্ডের এলাকা থেকে ৪০০ কিলোমিটার দূরেও অত্যন্ত খারাপ বায়ুমান অনুভূত হয়েছে। দাবানলের ধোঁয়ার কারণে প্রতি বছর বিশ্বে প্রায় ১৫ লাখ মানুষের আয়ু কমে যায় বলে ধারণা করা হয়।
জুলাইয়ের শুরু থেকে স্পেন ও ফ্রান্সজুড়ে ভয়াবহ দাবানলে অনেক মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এসময় হাজার হাজার বাড়িঘর পুড়ে গেছে এবং তিন লাখের বেশি মানুষ নিরাপদ স্থানে সরে যেতে বাধ্য হয়েছেন।
স্পেন ও ফ্রান্স ছাড়াও যুক্তরাজ্য ও গ্রিসে বড় ধরনের দাবানল ছড়িয়ে পড়েছে। গ্রিসে আগুন নেভাতে গিয়ে তিনজন দমকলকর্মী প্রাণ হারিয়েছেন।
জাতিসংঘের জলবায়ুবিষয়ক প্রধান সাইমন স্টিল বলেন, ইউরোপের বড় আকারের দাবানল দেখিয়ে দিচ্ছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তীব্র তাপ ও শুষ্ক ভূমি কত দ্রুত দাবানলকে জাতীয় বিপর্যয়ে পরিণত করতে পারে।
তিনি বলেন, মানুষ যতদিন বিপুল পরিমাণ কয়লা, তেল ও গ্যাস পোড়াতে থাকবে, ততদিন এ পরিস্থিতি আরো বিপজ্জনক হবে এবং দাবানল আরো প্রাণঘাতী ও ধ্বংসাত্মক হয়ে উঠবে। তবে সমাধানও স্পষ্ট—সব দেশকে দ্রুত জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে যেতে হবে এবং দাবানল, ঝড়, বন্যা ও খরার মতো জলবায়ুজনিত দুর্যোগ থেকে মানুষকে সুরক্ষিত করতে হবে।