জাপানের রাজকীয় উত্তরাধিকার আইন সংস্কার, বন্ধই থাকল নারীদের সম্রাট হওয়ার পথ

নতুন আইনে বর্তমান সম্রাট নারুহিতোর একমাত্র সন্তান রাজকুমারী আইকো সিংহাসনের উত্তরাধিকারী হওয়ার যোগ্য নন। এমনকি ভবিষ্যতে তার কোনো পুত্রসন্তান হলেও তিনিও সম্রাট হওয়ার অধিকার পাবেন না

বিশ্বের সবচেয়ে প্রাচীন রাজতন্ত্র হিসেবে পরিচিত জাপানের ‘চন্দ্রমল্লিকা সিংহাসন’ (ক্রিস্যান্থেমাম থ্রোন) দীর্ঘদিন ধরেই উত্তরাধিকার সংকটে ভুগছে। রাজপরিবারের সদস্যসংখ্যা কমে আসা ও যোগ্য পুরুষ উত্তরাধিকারীর অভাব মোকাবিলায় ইম্পেরিয়াল হাউস ল’ সংস্কার করে নতুন আইন অনুমোদন করেছে দেশটির পার্লামেন্ট। তবে নারী সম্রাটের সিংহাসন আরোহণের পথ এখনো বন্ধই থাকছে। খবর বিবিসি।

শুক্রবার পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষে পাস হওয়া বিল অনুযায়ী, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর রাজপরিবার থেকে বাদ পড়া ১১টি পার্শ্বশাখার ১৫ বছর বা তার বেশি বয়সী পুরুষ সদস্যদের দত্তক নিয়ে আবার রাজপরিবারে অন্তর্ভুক্ত করা যাবে। একই সঙ্গে রাজপরিবারের কোনো নারী সদস্য সাধারণ নাগরিককে বিয়ে করলেও তিনি আর রাজকীয় মর্যাদা হারাবেন না এবং আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব পালন অব্যাহত রাখতে পারবেন।

তবে আইনটিতে নারীদের সিংহাসনে আরোহণের সুযোগ রাখা হয়নি। ফলে বর্তমান সম্রাট নারুহিতোর একমাত্র সন্তান রাজকুমারী আইকো এখনো উত্তরাধিকারী হওয়ার যোগ্য নন। এমনকি ভবিষ্যতে তার কোনো পুত্রসন্তান হলেও তিনিও সম্রাট হওয়ার অধিকার পাবেন না।

প্রিন্সেস আইকো

জাপানের রাজতন্ত্র বিশ্বের সবচেয়ে প্রাচীন ধারাবাহিক বংশানুক্রমিক রাজতন্ত্র হিসেবে পরিচিত। এর ইতিহাস প্রায় ২ হাজার ৬০০ বছরেরও বেশি সময়ের বলে মনে করা হয়। বর্তমান আইন অপরিবর্তিত থাকলে যুবরাজ হিসাহিতোর কোনো পুত্রসন্তান না হলে উত্তরাধিকার ধারা কার্যত শেষ হয়ে যাবে।

জাপানের বর্তমান উত্তরাধিকার তালিকায় রয়েছেন মাত্র তিনজন পুরুষ সদস্য—সম্রাটের ৯০ বছর বয়সী চাচা প্রিন্স হিতাচি, ৬০ বছর বয়সী ছোট ভাই ক্রাউন প্রিন্স আকিশিনো এবং আকিশিনোর ১৯ বছর বয়সী ছেলে প্রিন্স হিসাহিতো। ফলে রাজবংশের ভবিষ্যৎ কার্যত হিসাহিতোর ওপরই নির্ভর করছে।

প্রিন্স হিসাহিতো

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৪৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের তত্ত্বাবধানে ইম্পেরিয়াল হাউস ল’ সংশোধন করে রাজপরিবারের ১১টি পার্শ্বশাখা বিলুপ্ত করা হয়। এতে এক রাতেই ৫১ জন সদস্য সাধারণ নাগরিক হয়ে যান। একই আইনে সাধারণ নাগরিককে বিয়ে করলে রাজপরিবারের নারী সদস্যদের রাজকীয় মর্যাদা হারানোর বিধানও যুক্ত হয়।

রক্ষণশীল রাজনৈতিক নেতাদের মতে, পুরুষানুক্রমিক উত্তরাধিকারই জাপানি রাজতন্ত্রের ঐতিহ্য ও বৈধতার ভিত্তি। প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচিসহ ক্ষমতাসীন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির নেতারা এ অবস্থানের পক্ষেই রয়েছেন।

তবে জনমত জরিপ বলেছ লিঙ্গসমতার যুগে সম্রাটের পদটি পুরুষের জন্য কঠোরভাবে সংরক্ষিত রাখাকে নেতিবাচক হিসেবে দেখছেন জাপানের নাগরিক।বিভিন্ন জরিপে ৭০ থেকে ৮৩ শতাংশ জাপানি নারী সম্রাটের পক্ষে মত দিয়েছেন। গবেষকদের মতে, জাপানের ইতিহাসে অন্তত আটজন নারী সম্রাট ছিলেন এবং নারী উত্তরাধিকার নিষিদ্ধ হয় মূলত ১৮৮৯ সালের ইম্পেরিয়াল হাউস আইনের মাধ্যমে।

বিলটি ইতোমধ্যে পার্লামেন্টের উভয় কক্ষে পাস হয়েছে এবং আনুষ্ঠানিক আইনি প্রক্রিয়া শেষে কার্যকর হবে। এর ফলে রাজপরিবারের সদস্যসংখ্যা কিছুটা বাড়লেও উত্তরাধিকার সংকটের মূল কারণের সমাধান হচ্ছে না। বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্বের সবচেয়ে প্রাচীন এ রাজতন্ত্রের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে হলে একসময় নারী উত্তরাধিকার প্রশ্নে জাপানকে নতুন করে সিদ্ধান্ত নিতেই হতে পারে।

আরও