ইরানে সামরিক অভিযানের প্রয়োজন কমাতে পারে সবচেয়ে কঠোর নিষেধাজ্ঞা: স্কট বেসেন্ট

বেসেন্টের বক্তব্যের আগে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞার নিন্দা জানায়। তেহরান এগুলোকে ‘অর্থনৈতিক সন্ত্রাসবাদ’ হিসেবে আখ্যায়িত করে জানিয়েছে, এসব নিষেধাজ্ঞা ইরানের স্বাধীনতা, মর্যাদা ও জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষার বিষয়ে ইরানিদের সংকল্পে ‘সামান্যতম দ্বিধাও’ তৈরি করবে না

ইরানের ওপর ‘ইতিহাসের কঠোরতম নিষেধাজ্ঞা’ আরোপ করবে যুক্তরাষ্ট্র— এমন মন্তব্য করেছেন মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট। তার মতে, এর ফলে নতুন করে বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালানোর প্রয়োজন কমে আসতে পারে। খবর রয়টার্স।

বেসেন্ট গতকাল এ মন্তব্য করেন। এর আগের দিন অর্থাৎ বুধবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে ‘অর্থনৈতিক যুদ্ধের’ হুমকি দেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, কোনো দেশ ইরানকে ‘যেকোনো ধরনের সহায়তা’ দিলে সেই দেশকেও অর্থনৈতিক পরিণতির মুখে পড়তে হবে। বেসেন্ট জানিয়েছেন, আগামী সপ্তাহে নতুন নিষেধাজ্ঞার বিস্তারিত জানানো হবে।

ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের এসব আর্থিক শাস্তির হুমকির পর বৃহস্পতিবার জ্বালানি তেলের দাম তিন সপ্তাহের বেশি সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে ওঠে। প্রায় ছয় মাস ধরে চলা যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের লাখ লাখ ব্যারেল জ্বালানি তেল আটকে আছে। এই যুদ্ধ বন্ধে ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়াতেই নতুন নিষেধাজ্ঞার হুমকি দেয়া হচ্ছে।

বেসেন্ট সিএনবিসিকে বলেন, ‘এ নিয়ে তেলের দাম কেন বেড়েছে, তা আমি নিশ্চিত নই।’

তিনি বলেন, ‘আমরা যদি সর্বোচ্চ মাত্রার অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগ করি, তাহলে সম্ভবত বড় ধরনের সামরিক অভিযান আবার শুরু হবে না।’

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার মাধ্যমে শুরু হওয়া এ সংঘাতে ইরানে হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন। যুদ্ধটি উপসাগরীয় দেশগুলোকে জড়িয়ে ফেলেছে এবং তেহরান হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল সীমিত করার পর বিশ্ববাজারে ব্যাপক উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ফেব্রুয়ারির আগে বিশ্বে বাণিজ্য হওয়া মোট জ্বালানি তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই জলপথ দিয়ে পরিবহন করা হতো।

যুদ্ধ শেষ করতে এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করার লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান এপ্রিলে ও জুনে দুই দফা যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হওয়ার ঘোষণা দিয়েছিল। তবে দুটিই দ্রুত ভেঙে পড়ে।

হরমুজ প্রণালি। ছবি: রয়টার্স

নিষেধাজ্ঞার বিস্তারিত আসবে সোমবার

১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর থেকে প্রায় ৫০ বছর ধরে ইরান একের পর এক কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার মুখে রয়েছে।

বেসেন্টের বক্তব্যের আগে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞার নিন্দা জানায়। তেহরান এগুলোকে ‘অর্থনৈতিক সন্ত্রাসবাদ’ হিসেবে আখ্যায়িত করে জানিয়েছে, এসব নিষেধাজ্ঞা ইরানের স্বাধীনতা, মর্যাদা ও জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষার বিষয়ে ইরানিদের সংকল্পে ‘সামান্যতম দ্বিধাও’ তৈরি করবে না।

বেসেন্ট জানান, আগামী সোমবার এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি নতুন নিষেধাজ্ঞা প্যাকেজের আরো বিস্তারিত তুলে ধরবেন এবং ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ঠিক কী পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে, তা ব্যাখ্যা করবেন।

তিনি বলেন, ‘এটি পরপর দুই দফা আঘাত। ইরানের ওপর অবরোধ রয়েছে এবং এখন আমরা ইতিহাসের কঠোরতম নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে যাচ্ছি।’ তিনি এপ্রিল থেকে ইরানের ওপর আরোপ করা মার্কিন নৌ অবরোধের কথা উল্লেখ করেন, যা জুনের মাঝামাঝি এক মাসের জন্য স্থগিত করা হয়েছিল।

বেসেন্ট আরো বলেন, ‘এটি ইরানে কাজ করবে এবং আমরা এই সরকারকে পতন ঘটাব। এখন আমাদের মিত্র ও বিশ্বের বাকি দেশগুলোর সিদ্ধান্ত নেয়ার সময়।’

২০২৫ সালের তথ্যানুযায়ী, ইরান থেকে সমুদ্রপথে রফতানি হওয়া জ্বালানি তেলের ৮০ শতাংশের বেশি কিনে থাকে চীন। তবে ইরানের সঙ্গে বাণিজ্যের কারণে চীনের বিরুদ্ধে নতুন অর্থনৈতিক যুদ্ধ শুরু করলে ওয়াশিংটনও পাল্টা পদক্ষেপের ঝুঁকিতে পড়তে পারে। চীন যুক্তরাষ্ট্রের বড় রফতানিকারক দেশগুলোর একটি এবং গুরুত্বপূর্ণ দুস্প্রাপ্য খনিজও সরবরাহ করে।

ইরানের সঙ্গে ব্যবসা করার কারণে চীনকেও যুক্তরাষ্ট্র নিশানা করতে পারে কিনা—এ প্রশ্নের জবাবে বেসেন্ট বলেন, অনেক আলোচনা প্রকাশ্যে না করাই ভালো।

তিনি বলেন, ‘মনে রাখতে হবে, চীনের জ্বালানি চাহিদার ৫০ শতাংশ আসে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে। তাই এই কর্মসূচিতে যোগ দেয়া তাদের জন্যই বড় সুবিধা হবে।’

তবে ওয়াশিংটনে চীনের দূতাবাস বলেছে, ‘নিষেধাজ্ঞা ও চাপ সমস্যা সমাধানে সহায়তা করে না।’

দূতাবাসের এক মুখপাত্র বলেন, চীন সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে দায়িত্বশীল আচরণ করতে এবং রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক উপায়ে সমস্যার সমাধানের আহ্বান জানায়।

ব্যাপক অর্থনৈতিক পরিণতি

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বুধবার দেয়া এক বার্তায় ট্রাম্প ‘নজিরবিহীন মাত্রায় অর্থনৈতিক যুদ্ধ ও বিচ্ছিন্নতার’ হুমকি দেন। তবে তিনি কী ধরনের নির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেবেন বা কোন দেশকে লক্ষ্য করবেন, তা জানাননি। তার এই সতর্কবার্তার আওতায় শান্তি আলোচনায় মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করা যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোও পড়তে পারে।

ট্রাম্প লেখেন, ‘যেকোনো দেশ যদি তার আর্থিক প্রতিষ্ঠান, ব্যবসা, বিমানবন্দর বা সরকারি সংস্থাকে ইরানকে যেকোনো ধরনের সহায়তা দিতে দেয়, তাহলে সেই দেশকেও ব্যাপক অর্থনৈতিক পরিণতির মুখে পড়তে হবে।’

তবে দেশে যুদ্ধ বন্ধের জন্য ট্রাম্পের ওপর চাপ বাড়ছে। এই যুদ্ধ এরই মধ্যে অজনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। জ্বালানির উচ্চমূল্য তার জনসমর্থনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে এবং নভেম্বরে মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের কংগ্রেস নিয়ন্ত্রণে রাখার সম্ভাবনাকেও হুমকির মুখে ফেলছে।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি বলেন, রেকর্ড ঋণ ও সুদহার বৃদ্ধির মতো অভ্যন্তরীণ আর্থিক সমস্যা থেকে মার্কিন জনগণের দৃষ্টি সরাতেই ট্রাম্প এসব মন্তব্য করছেন।

তিনি বলেন, ওয়াশিংটন ব্যর্থ প্রমাণিত নীতিগুলো আঁকড়ে থাকলে আরো ব্যর্থতার মুখে পড়বে এবং তাদের কাছ থেকে ইরানিদের আরো বেশি বিচ্ছিন্ন করে ফেলবে।

তবে ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যেসব হুমকি ও ঘোষণা দেন, সেগুলো সবসময় ঘোষিতভাবে বাস্তবায়িত হয় না।

আরও