ইউরোপে মার্কিন সামরিক বাহিনীতে উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধী অস্ত্রের ঘাটতি ‘সংকটজনক পর্যায়েরও নিচে’ নেমেছে। ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের কারণে এ পরিস্থিতি হয়েছে বলে জানান কর্মকর্তারা। এতে ন্যাটোভুক্ত দেশগুলো রাশিয়ার সম্ভাব্য হামলার মুখে ঝুঁকিতে পড়তে পারে। খবর এপি।
যুক্তরাষ্ট্রের ইউরোপীয় কমান্ডের এক প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা এবং ন্যাটোর এক কর্মকর্তা এসব তথ্য জানিয়েছেন। সংবেদনশীল সামরিক বিষয় হওয়ায় তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে কথা বলেন।
এক মার্কিন প্রতিরক্ষা কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধী ব্যবস্থায় সবচেয়ে উদ্বেগজনক ঘাটতি দেখা দিয়েছে। এসব ক্ষেপণাস্ত্র রুশ উচ্চগতির ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করতে পারে। ইউরোপে যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটো বাহিনীর হাতে প্যাট্রিয়টের মজুদ খুব কমে গেছে বলে ন্যাটোর ওই কর্মকর্তাও নিশ্চিত করেছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের ওই কর্মকর্তা বলেন, রাশিয়া কোনো পদক্ষেপ নিলে একের পর এক হামলার আঘাত সহ্য করা ছাড়া ন্যাটোর সামনে খুব বেশি বিকল্প থাকবে না।
ইউরোপে মার্কিন বাহিনীর কাছে সম্ভাব্য দীর্ঘস্থায়ী ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ঠেকানোর মতো পর্যাপ্ত প্যাট্রিয়ট নেই বলে জানান ওই কর্মকর্তা। এমনকি একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা বা লক্ষ্যচ্যুত কোনো রুশ ক্ষেপণাস্ত্রের বিরুদ্ধেও প্রতিরোধক্ষমতা ‘খুবই সীমিত’ বলে তিনি উল্লেখ করেন।
এর মধ্য দিয়ে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরুর সিদ্ধান্তের বহুমুখী প্রভাব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। আজ এ সংঘাত ছয় মাস পূর্ণ করছে। ইউরোপে যুক্তরাষ্ট্রের মজুদ ক্ষেপণাস্ত্র মধ্যপ্রাচ্যে সরিয়ে নেয়া হয়েছে। সেখানে ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করতে যুক্তরাষ্ট্র ও উপসাগরীয় মিত্ররা প্যাট্রিয়টসহ বিপুলসংখ্যক প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে। এসব হামলায় মার্কিন সেনারা নিহত-আহতও হয়েছেন।
ন্যাটো দেশগুলোর ওপর রুশ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আশঙ্কা এখনই নেই। তবে দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে, কয়েক দিন আগে মস্কো সফর করে রাশিয়াকে হামলা না চালানোর বিষয়ে সতর্ক করেছেন সিআইএর পরিচালক জন র্যাটক্লিফ।
ইউরোপীয় ও ন্যাটো কর্মকর্তারা বলছেন, ২০৩০ সালের মধ্যে জোটের কোনো কোনো দেশের ওপর হামলা চালানোর অবস্থানে যেতে পারে রাশিয়া। তবে ততদিনে প্যাট্রিয়টের মজুদ আবার বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে। একই সময়ে ইউক্রেনে রাশিয়ার যুদ্ধও ইউরোপে কোনো ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানোর সক্ষমতাকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। কারণ একইসঙ্গে দুই দিকের আকাশযুদ্ধে লড়াই করা মস্কোর জন্য কঠিন হবে।
ইউক্রেনে প্যাট্রিয়ট সরবরাহ কমেছে, তবে ইরান যুদ্ধ ছিল অপ্রত্যাশিত
ন্যাটোর জ্যেষ্ঠ সামরিক মুখপাত্র ও যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর কর্নেল মার্টিন ও’ডনেল বলেছেন, ইউরোপে প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রের সংখ্যা ‘সংকটজনক পর্যায়েরও নিচে’—এমনটা বলা ঠিক নয়।
তার ভাষ্য, ন্যাটো ‘আঘাত ঠেকাতে’ সক্ষম এবং নিজেদের প্রতিরক্ষার পাশাপাশি ইউক্রেনকে দেয়ার মতো পর্যাপ্ত আকাশ প্রতিরক্ষা গোলাবারুদও তাদের হাতে রয়েছে।
পেন্টাগনের প্রধান মুখপাত্র শন পার্নেল গতকাল এক বিবৃতিতে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রের মজুদ কমে যাওয়ার দাবি ‘মিথ্যা’।
তিনি বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট যখন যেখানে আঘাত হানার সিদ্ধান্ত নেবেন, আমাদের কাছে তার জন্য প্রয়োজনীয় সবকিছুই আছে।’ তিনি আরো বলেন, একাধিক সামরিক কমান্ড এলাকায় যুক্তরাষ্ট্র সফল অভিযান পরিচালনা করেছে এবং একইসঙ্গে নিজেদের জনগণ ও স্বার্থ রক্ষার জন্য প্রস্তুত বিপুল অস্ত্রভান্ডারও ধরে রেখেছে।
ইউক্রেনের কর্মকর্তারা রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ঠেকাতে আনো প্যাট্রিয়ট দেয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কাছে অনুরোধ জানিয়ে আসছেন। এর আগে যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেনকে প্যাট্রিয়ট দেয়ায় নিজেদের মজুদ কিছুটা কমে গেছে।
সাড়ে চার বছর ধরে চলা সংঘাতে কিয়েভ-কে শত শত প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র দিয়েছে ওয়াশিংটন। তবে লন্ডনের সামরিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ সহযোগী ফেলো এড আর্নল্ডের মতে, ইরান যুদ্ধই মজুদ কমে যাওয়ার ক্ষেত্রে মূল মোড় তৈরি করেছে।
তিনি বলেন, ইউক্রেনকে ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহের বিষয়টি আগে থেকেই পরিকল্পিত ছিল এবং তা মোটামুটি নিয়ন্ত্রিত ছিল। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে মজুত অপ্রত্যাশিতভাবে এবং দ্রুত কমে গেছে। এতে সরবরাহ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা প্রকাশ পেয়েছে।
তবে ইউরোপের সামগ্রিক অস্ত্রের মজুদের পরিস্থিতি শুধু আকাশ প্রতিরক্ষার তুলনায় এতটা ভয়াবহ নয়। কারণ কিছু ইউরোপীয় দেশের নিজস্ব আক্রমণাত্মক ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে।
মজুত কমে যাওয়ায় ইউরোপের বিকল্প কম
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইউরোপে প্যাট্রিয়ট প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্রের ঘাটতি রাশিয়ার উন্নত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকানোর বিকল্প খুব কমিয়ে দেবে। এসব ক্ষেপণাস্ত্রের সঙ্গে বিপুলসংখ্যক সস্তা ড্রোনও ব্যবহার করা যেতে পারে, যা প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অচল করে দিতে পারে।
ইউক্রেন ও কিছু মিত্রদেশ এরই মধ্যে এমন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যবহার করছে, যেগুলো তুলনামূলক ধীরগতির ড্রোন ধ্বংস করতে পারে এবং এর জন্য ব্যয়বহুল ক্ষেপণাস্ত্রের প্রয়োজন হয় না। কিন্তু ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকানো অনেক বেশি কঠিন। এগুলো শব্দের গতির পাঁচ গুণেরও বেশি গতিতে তীব্রভাবে নিচের দিকে লক্ষ্যবস্তুর দিকে ধেয়ে আসে। ফলে এগুলো ঠেকানোর সময় খুব কম থাকে।
প্যাট্রিয়ট ব্যবস্থা প্রথমে ক্ষেপণাস্ত্রটি শনাক্ত করে, এর পর তার গতিপথ অনুমান করে এবং কয়েক মিনিটের মধ্যেই প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে। এ সময় লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত নিশ্চিত করতে জটিল হিসাবও করা হয়। একটি প্যাট্রিয়ট ব্যাটারি শুধু সীমিত একটি এলাকা রক্ষা করতে পারে। যেমন, এটি একটি ছোট সামরিক ঘাঁটি রক্ষা করতে পারলেও পুরো একটি শহরকে রক্ষা করতে পারে না।
এর একটি বিকল্প হতে পারে ফ্রান্স ও ইতালির তৈরি এসএএমপি/টি এনজি আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। ইউক্রেনকে এই ব্যবস্থা সরবরাহ দ্রুত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে ফ্রান্স। তবে নতুন সংস্করণটি এখনো যুদ্ধক্ষেত্রে পরীক্ষিত হয়নি। আর
ইরান যুদ্ধের সময় প্যাট্রিয়টের মজুদ ব্যাপক কমেছে
২০২২ সালে রাশিয়া ইউক্রেনে হামলা শুরুর পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের মজুদ থেকে ইউক্রেন প্যাট্রিয়ট পেয়েছে। ওয়াশিংটনের থিংকট্যাংক সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের (সিএসআইএস) জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা ও অবসরপ্রাপ্ত মেরিন কর্নেল মার্ক ক্যানসিয়ানের মতে, বাইডেন প্রশাসনের সময় ইউক্রেনকে প্রায় ৬০০টি প্যাট্রিয়ট প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্র দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
তবে ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাতেই সবচেয়ে বেশি প্যাট্রিয়ট ব্যবহার হয়েছে। সিএসআইএসের হিসাবে, এ যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের প্যাট্রিয়ট মজুদের ৬৫ শতাংশ পর্যন্ত ব্যবহার হয়ে গেছে। অর্থাৎ দেশটির মোট ২ হাজার ৩৩০টি প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্রের মধ্যে প্রায় ১ হাজার ৫০০টি ব্যবহার করা হয়েছে।
ক্যানসিয়ান বলেন, এ বছর ইউরোপের জন্য নির্ধারিত ক্ষেপণাস্ত্রসহ প্রায় ৬০০টি প্যাট্রিয়ট তৈরি হওয়ার কথা রয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে বছরে ২ হাজারটি প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
ন্যাটো জানিয়েছে, ইউরোপে প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনের প্রথম কারখানা জার্মানিতে সেপ্টেম্বরে চালু হওয়ার কথা। আগামী বছরের শুরুতে সেখান থেকে সরবরাহ শুরু হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা কর্মকর্তার মতে, এরই মধ্যে অর্ডার দেয়া জার্মানি, নেদারল্যান্ডস, রোমানিয়া ও স্পেনসহ কিছু দেশ প্রথম দফার ক্ষেপণাস্ত্র পাবে। তবে আপাতত এর অর্থ হলো, জার্মানির মতো কিছু দেশ ব্যয়বহুল প্যাট্রিয়ট প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কিনেও তা থেকে ছোড়ার মতো কোনো গোলাবারুদ না থাকার ‘হাস্যকর’ পরিস্থিতিতে পড়েছে বলে মন্তব্য করেছেন লন্ডনের ওই গবেষণা প্রতিষ্ঠানের এক কর্মকর্তা।