শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ২০ দিন ধরে অনশনে সোনম ওয়াংচুক, ওজন কমেছে ৯ কেজি

ভারতের রাজধানী দিল্লির যন্তর মন্তরে ২০ দিন ধরে অনশন করছেন সোনম ওয়াংচুক। কেবল স্যালাইনের ওপর নির্ভর করে বেঁচে থাকায় ১৯ দিনেই তার ওজন কমে গেছে ৯ কেজির বেশি। কারো সাহায্য ছাড়া একা দাঁড়াতে পারছেন না তিনি। চিকিৎসকেরা বলছেন, চর্বি গলে শেষ হওয়ার পর এবার পেশিক্ষয় শুরু হয়েছে, যেকোনো মুহূর্তে বিকল হতে পারে লিভার-কিডনি

বলিউডের ‘থ্রি ইডিয়টস’ সিনেমার সেই খ্যাপাটে, জিনিয়াস ‘ফুংসুক ওয়াংড়ু’ চরিত্রটি নিশ্চয়ই মনে আছে? যিনি মুখস্থ বিদ্যার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে লাদাখে গড়ে তুলেছিলেন এক জাদুকরী স্কুল? সেই চরিত্রটি যার জীবন থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে বানানো হয়েছিল, তিনি কোনো কাল্পনিক চরিত্র নন। বাস্তবের সোনম ওয়াংচুক।

উনষাট বছর বয়সী লাদাখের এ বিশ্বখ্যাত প্রকৌশলী ও শিক্ষা-সংস্কারক এখন মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। ভারতের রাজধানী দিল্লির যন্তর মন্তরে ২০ দিন ধরে অনশন করছেন তিনি। কেবল স্যালাইনের ওপর নির্ভর করে বেঁচে থাকায় ১৯ দিনেই তার ওজন কমে গেছে ৯ কেজির বেশি। কারো সাহায্য ছাড়া একা দাঁড়াতে পারছেন না। চিকিৎসকেরা বলছেন, চর্বি গলে শেষ হওয়ার পর এবার পেশিক্ষয় শুরু হয়েছে, যেকোনো মুহূর্তে বিকল হতে পারে লিভার-কিডনি।

তবুও অলৌকিক জেদের বলে এ জীর্ণ শরীরেই আগামী ২০ জুলাই পর্যন্ত যেকোনো মূল্যে বেঁচে থাকতে চান তিনি। কিন্তু কেন? ২০১৮ সালে এশিয়ার নোবেল খ্যাত ‘রমন ম্যাগসেসে’জয়ী এ মানুষটা নিজের জীবন বাজি রেখে কেন দিল্লির তীব্র গরমে ধুঁকছেন?

ঘটনার শুরু গত মে মাসে। ৩ মে ভারতে অনুষ্ঠিত হয় মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা (নিট-ইউজি)। প্রায় ২৩ লাখ পরীক্ষার্থীর বিপরীতে সিট ছিল মাত্র ১ লাখ ৩০ হাজার। অর্থাৎ, প্রতি ১৭ জনে সুযোগ পাবেন ১ জন। কিন্তু পরীক্ষার আগেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হাতে-লেখা একটি প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়। ভারতজুড়ে তোলপাড় শুরু হলে ৯ দিনের মাথায় পুরো পরীক্ষাটাই বাতিল করতে বাধ্য হয় সরকার।

প্রশ্নফাঁসকে কেন্দ্র করে উত্তাল পরিস্থিতর মধেই বেকার তরুণদের ‘তেলাপোকা’র সঙ্গে তুলনা করেন ভারতের প্রধান বিচারপতি। সে গালিকেই দলের নাম বানিয়ে চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) গঠন করেন বোস্টন ইউনিভার্সিটির ভারতীয় ছাত্র অভিজিৎ দিপকে। দলটির দাবি—শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে ছিনিমিনি খেলার নৈতিক দায় নিয়ে ভারতের শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে পদত্যাগ করতে হবে। এই ‘তেলাপোকা’দের ব্যানার নিয়েই তরুণরা গত ২৮ জুন থেকে দিল্লির যন্তর মন্তরে অবস্থান কর্মসূচি শুরু করে। আর তাদের এ লড়াইকে আন্তর্জাতিক রূপ দিতে অনশনে বসে যান প্রবীণ সোনম ওয়াংচুক।

আগামী ২০ জুলাই থেকে শুরু হচ্ছে ভারতের পার্লামেন্টের নতুন অধিবেশন। আর সেদিনই আন্দোলনকারী তরুণরা সংসদ ভবন অভিমুখে পদযাত্রার ঘোষণা দিয়ে রেখেছে। সেই ২০ তারিখের ডেডলাইন ছুঁতেই মূলত মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছেন সোনম ওয়াংচুক।

ওয়াংচুকের অবনতিশীল স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে এক যৌথ বিবৃতিতে প্রায় দুই হাজার শিল্পী, লেখক, শিক্ষাবিদ ও সমাজকর্মী তাকে অনশন ভাঙার অনুরোধ জানিয়েছেন। এছাড়াও সমাজবাদী পার্টির নেতা অখিলেশ যাদব, কংগ্রেস সংসদ সদস্য শশী থারুরও তাকে অনশন শেষ করার আহ্বান জানিয়েছেন।

তবে ওয়াংচুক অনশন ভাঙতে রাজি নন। গত বছর লাদাখের পূর্ণ রাজ্যের মর্যাদার দাবিতে আন্দোলন করায় তাকে ‘জাতীয় নিরাপত্তা আইনে’ কোনো বিচার ছাড়াই প্রায় ছয় মাস বন্দি করে রাখা হয়েছিল। কারাগার থেকে ছাড়া পাওয়ার সাড়ে তিন মাসের মাথায় তিনি আবার অনশনে বসলেন অচেনা তরুণদের জন্য। বিবিসিকে তিনি বলেছেন, আমি যা শুরু করেছি, সেটিকে যৌক্তিক পরিণতিতে নিয়ে যেতে হবে।

আরও