এশিয়ার পর এখন জেনজি আন্দোলন আফ্রিকায়

এশিয়াজুড়ে জেনারেশন জেড বা জেনজি নেতৃত্বাধীন বিক্ষোভের ঝড় এখন ছড়িয়ে পড়েছে আফ্রিকায়। মৌলিক সেবা, দুর্নীতি, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের দাবিতে যেভাবে দক্ষিণ ও পূর্ব এশিয়ার রাস্তায় তরুণরা গত এক বছরে রাষ্ট্রক্ষমতাকে কাঁপিয়ে তুলেছে, ঠিক সে ঢেউ এবার আঘাত হেনেছে আফ্রিকার দেশগুলোতেও।

এশিয়াজুড়ে জেনারেশন জেড বা জেনজি নেতৃত্বাধীন বিক্ষোভের ঝড় এখন ছড়িয়ে পড়েছে আফ্রিকায়। মৌলিক সেবা, দুর্নীতি, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের দাবিতে যেভাবে দক্ষিণ ও পূর্ব এশিয়ার রাস্তায় তরুণরা গত এক বছরে রাষ্ট্রক্ষমতাকে কাঁপিয়ে তুলেছে, ঠিক সে ঢেউ এবার আঘাত হেনেছে আফ্রিকার দেশগুলোতেও। সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে মাদাগাস্কারে পানি ও বিদ্যুতের দীর্ঘমেয়াদি সংকটের বিরুদ্ধে তরুণদের বিক্ষোভ সহিংস রূপ নেয়। অন্তত ২২ জন নিহত ও শতাধিক আহত হওয়ার পর গত সোমবার প্রেসিডেন্ট আন্দ্রি রাজোয়েলিনা মন্ত্রিসভা ভেঙে দেন। জেনজি আন্দোলনের মুখে মহাদেশটিতে সরকার পতনের ঘটনা এটাই প্রথম। তবে মন্ত্রিসভা ভেঙে দেয়ার পরও সন্তুষ্ট নয় আন্দোলনকারীরা। রাজধানী আন্তানানারিভোসহ বিভিন্ন শহরে প্রেসিডেন্টের পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভ অব্যাহত রয়েছে। এ ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন বাস্তবতা নয়। ২০২৪ সালের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত আফ্রিকা ও এশিয়ার বহু দেশে জেনারেশন জেড (জেনজি) নেতৃত্বাধীন বিক্ষোভ দেখা গেছে। যেখানে তরুণরা মৌলিক সেবা, দুর্নীতি, শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও জবাবদিহির প্রশ্নে সংগঠিত হয়ে রাস্তায় নেমেছেন। তাদের

চাপেই কোথাও সরকারের পতন ঘটেছে, কোথাও মন্ত্রিসভা বদলেছে, কোনো কোনো

দেশে ক্ষমতাসীনরা নীতিগত সিদ্ধান্ত বদলাতে বাধ্য হয়েছেন।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক নীতি-গবেষণা সংস্থা কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসের বিশ্লেষণ অনুযায়ী এসব আন্দোলন সাময়িক প্রতিক্রিয়া নয়; বরং দীর্ঘদিনের বৈষম্য, অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ, অর্থনৈতিক নিরাপত্তাহীনতা, রাষ্ট্রীয় দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে এক প্রজন্মের সম্মিলিত প্রতিরোধের বহিঃপ্রকাশ।

২০২২ সালে শ্রীলংকায় অর্থনৈতিক সংকট ও রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় তরুণ প্রজন্মের নেতৃত্বে শুরু হওয়া গণবিক্ষোভকেই অনেকে জেনজি আন্দোলনের প্রথম দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখেন। গোতাবায়া রাজাপাকসের পতনের মধ্য দিয়ে তরুণদের নেতৃত্বাধীন ওই প্রতিবাদ দক্ষিণ এশিয়ায় নতুন এক রাজনৈতিক বাস্তবতার সূচনা করেছিল।

গত মাসেই ফিলিপাইন ‘ট্রিলিয়ন পেসো মার্চ’ নামে পরিচিত জেনজি আন্দোলন শুরু হয়। বন্যা নিয়ন্ত্রণ প্রকল্পে ব্যাপক দুর্নীতি ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগই ছিল এর মূল কারণ। শিক্ষার্থী ও তরুণরা সোশ্যাল মিডিয়ায় সংগঠিত হয়ে রাজধানী ম্যানিলায় লাখো মানুষের সমাবেশ ঘটায়। বিক্ষোভে জনরোষ এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে সরকার দুর্নীতির তদন্তে একটি স্বাধীন কমিশন গঠন করে। সরকারের পতন না ঘটলেও প্রশাসনিক কাঠামোয় বড় পরিবর্তন আসে এবং নীতিগত দিক থেকে ক্ষমতাসীনদের পিছু হটতে হয়।

গত সেপ্টেম্বরে নেপালে জেনজি আন্দোলনের মুখে পতন ঘটে কে পি শর্মা অলির সরকারের। সরকারের দুর্নীতি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আরোপিত সেন্সরশিপ এ আন্দোলনের মূল ইস্যু হয়ে ওঠে। তরুণরা অনলাইন প্লাটফর্ম ব্যবহার করে যোগাযোগ ও সংগঠনের নেটওয়ার্ক গড়ে তোলে। ছাত্র, শ্রমজীবী ও নাগরিক সমাজের হাজার হাজার মানুষ এতে অংশ নেয়। সরকারি ভবন ঘেরাও করা হয় এবং রাজধানী কাঠমান্ডু অচল হয়ে পড়ে। চাপের মুখে প্রধানমন্ত্রী অলি পদত্যাগ করেন এবং একটি অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়।

২০২৪ সালের শেষ দিক থেকে চলতি বছর কয়েক ধাপে ইন্দোনেশিয়ায় তরুণদের নেতৃত্বে ধারাবাহিক বিক্ষোভ শুরু হয়, যা পরিচিতি পায় ‘ডার্ক ইন্দোনেশিয়া’ নামে। সরকারের নতুন বাজেট প্রস্তাবে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ কমানোর পাশাপাশি সামরিক আইন সংস্কার ও স্থানীয় নির্বাচনের নিয়ম পরিবর্তনের উদ্যোগ তরুণ সমাজের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। গত আগস্টের শেষ দিকে অনলাইন ডেলিভারি ও রাইডশেয়ার প্লাটফর্ম ‘গিগ’-এর কর্মীরা প্রেসিডেন্ট প্রাবোও সুবিয়ান্তোর প্রস্তাবিত কল্যাণ ভাতা কমানোর বিরুদ্ধে রাস্তায় নামে। ক্ষোভ বৃদ্ধি পায় সংসদ সদস্যদের জন্য বিপুল ভাতার ঘোষণার পর, যা সাধারণ নাগরিকদের কাছে ছিল তীব্র বৈষম্যের প্রতীক। বিশ্ববিদ্যালয় ও ছাত্রসংগঠনগুলো এ নীতির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়ে অনলাইনে প্রচারণা চালায়। রাজধানী জাকার্তা থেকে শুরু করে বিভিন্ন প্রদেশে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে, সরকারি ভবন অবরোধ ও রাস্তায় অবস্থান ধর্মঘট হয়। চাপের মুখে সরকার মন্ত্রিসভায় বড় ধরনের রদবদল আনে। এমপিদের জন্য ভাতা বাতিল করা হয়।

এছাড়া বর্তমানে মরক্কোতে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে অধিকারের দাবিতে জেনজি আন্দোলন চলছে। ‘জেনজি ২১২’ নামে পরিচিত এ আন্দোলন শুরুতে ছোট আকারের ছাত্রসমাবেশ হলেও কয়েক দিনের মধ্যেই তা দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে, গণ-আন্দোলনে রূপ নেয়। আন্দোলনকারীদের অন্যতম অভিযোগ, মরক্কো সরকার আগামী ২০৩০ বিশ্বকাপ আয়োজনের লক্ষ্যে বহু বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে নতুন স্টেডিয়াম ও অবকাঠামো নির্মাণে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। অথচ শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ দীর্ঘদিন ধরে স্থবির রয়ে গেছে। ‘আমরা স্টেডিয়াম নয়, হাসপাতাল চাই’—এ স্লোগান দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং আন্দোলনের মূল প্রতীকে পরিণত হয়। চাপের মুখে দেশটির সরকার শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিলেও আন্দোলন এখনো চলছে।

এর আগে ২০২৪ সালে জুনে বাংলাদেশে সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থার সংস্কারের দাবিতে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের আন্দোলন শুরু হয়। মূল দাবি ছিল—চাকরির নিয়োগে মেধার ভিত্তিকে প্রাধান্য দেয়া। কিন্তু সরকারি দমন-পীড়ন ও হত্যাযজ্ঞের মুখে এটি রূপ নেয় গণ-অভ্যুত্থানে। অবশেষে গত বছরের ৫ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে ভারতে পালান।

এছাড়া ২০২৪ সালের মে মাসে ইউরোপের দেশ জর্জিয়ার সরকার যখন রাশিয়ার বিতর্কিত নীতির সঙ্গে তুলনীয় ‘ফরেন এজেন্ট ল’ পাসের উদ্যোগ নেয় তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও তরুণরা রাস্তায় নামে। তাদের আশঙ্কা ছিল, এ আইন দেশের ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগদানের পথ রুদ্ধ করবে এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা হ্রাস করবে। তিবিলিসি ও অন্যান্য শহরে টানা কয়েক সপ্তাহ অবস্থান ধর্মঘট, অবরোধ ও বৃহত্তর জনসমাবেশ হয়।

এছাড়া ২০২৪ সালের জুনে কেনিয়ায় তরুণ প্রজন্ম সরকারের নতুন কর কাঠামোর বিরুদ্ধে রাস্তায় নামে। ‘রিজেক্ট ফাইন্যান্স বিল’ নামে পরিচিত এ আন্দোলনের সূচনা হয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে, যেখানে শিক্ষার্থী ও তরুণরা কর বৃদ্ধির ফলে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা তুলে ধরে। তরুণরা শুধু করনীতির বিরোধিতা করেনি, তারা বাজেট প্রণয়নের স্বচ্ছতা ও সরকারি ব্যয়ের জবাবদিহি চেয়েছিল। আন্দোলনের মুখে দেশটির সরকার অর্থবিল ২০২৪ প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়।

গত চার বছরে জেনজি আন্দোলনে যে চার দেশে সরকার পতন হয়েছে তার মধ্যে তিনটি দেশই দক্ষিণ এশিয়ায়। এর বাইরে সরকার পতন ঘটেছে আফ্রিকার দেশ মাদাগাস্কারে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক নীতি-গবেষণা সংস্থা কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, অর্থনৈতিক অনিরাপত্তাই এ আন্দোলনের বড় কারণ। মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের এশিয়া ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ভেদি হাদিজ যেমন বলেছেন, ‘তরুণরা রাগান্বিত, তারা মনে করছে তাদের কোনো সুরক্ষা নেই, ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত।’ আন্দোলনের আরেকটি বড় কারণ হলো রাষ্ট্রীয় দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার। সামরিক বাহিনী ও ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর হাতে ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন, দুর্নীতি ও পৃষ্ঠপোষকতাভিত্তিক শাসন ব্যবস্থা তরুণদের আস্থা নষ্ট করছে। তাদের দৃষ্টিতে শাসকগোষ্ঠী কেবল নিজেদের স্বার্থে কাজ করছে, আর সাধারণ মানুষের জন্য ন্যায্যতা নিশ্চিত করতে পারছে না। বিশ্লেষকদের মতে, জেনজি প্রজন্মের এ আন্দোলন শুধুই বিক্ষোভ নয়, এটি এক সতর্কবার্তা। তরুণরা রাষ্ট্রকে জানিয়ে দিচ্ছে, বৈষম্য ও অনিশ্চিত ভবিষ্যতের বোঝা তারা আর বহন করবে না। এটি কেবল প্রজন্মের ক্ষোভ নয়, বরং নতুন এক রাজনৈতিক শক্তির উত্থান। যা রাষ্ট্রকে বাধ্য করছে তাদের দাবি শোনার এবং ভবিষ্যতের জন্য ন্যায্য পথ তৈরি করার।

আরও