বেলারুশের একটি সাবেক বিমানঘাঁটিতে রাশিয়া তাদের নতুন পরমাণু সক্ষমতাসম্পন্ন হাইপারসোনিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন করছে বলে দাবি মার্কিন গবেষকদের। স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণ করে তারা জানিয়েছেন, এ পদক্ষেপের ফলে পুরো ইউরোপ জুড়ে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার সক্ষমতা আরো বৃদ্ধি পাবে মস্কোর। গবেষকদের এই মূল্যায়ন যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর পর্যবেক্ষণের সঙ্গেও মোটামুটি সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে জানান বিষয়টি সম্পর্কে অবগত এক ব্যক্তি, যিনি নাম প্রকাশ না করার শর্তে কথা বলেছেন।
রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন আগেই জানিয়েছেন, সর্বোচ্চ ৫,৫০০ কিলোমিটার পাল্লার মধ্যম-পাল্লার ‘ওরেশনিক’ ক্ষেপণাস্ত্র বেলারুশে মোতায়েন করা হবে। তবে এর নির্দিষ্ট অবস্থান এতদিন প্রকাশ্যে আসেনি। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই মোতায়েন ন্যাটো সদস্যদের ইউক্রেনকে দূরপাল্লার অস্ত্র সরবরাহ থেকে বিরত রাখতে পারমাণবিক হুমকির ওপর মস্কোর বাড়তি নির্ভরতার ইঙ্গিত দেয়।
বেলারুশের রাষ্ট্রায়ত্ত সংবাদ সংস্থা বেল্টা দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী ভিক্টর খ্রেনিনের উদ্ধৃতি দিয়ে জানায়, এই মোতায়েন ইউরোপে শক্তির ভারসাম্য বদলাবে না এবং এটি পশ্চিমাদের ‘আগ্রাসী পদক্ষেপের জবাব’।
ক্যালিফোর্নিয়ার মিডলবেরি ইনস্টিটিউটের জেফ্রি লুইস ও ভার্জিনিয়াভিত্তিক সিএনএ’র ডেকার ইভালেথ জানান, প্ল্যানেট ল্যাবসের স্যাটেলাইট ছবিতে রুশ কৌশলগত ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটির সঙ্গে মিল থাকা অবকাঠামো দেখা গেছে। তারা প্রায় ৯০ শতাংশ নিশ্চিত যে, বেলারুশের রাজধানী মিনস্ক থেকে প্রায় ১৯০ মাইল (৩০৭ কিলোমিটার) পূর্বে এবং মস্কো থেকে ৩০০ মাইল (৪৭৮ কিলোমিটার) দক্ষিণ-পশ্চিমে ক্রিচেভ নামক স্থানে একটি সাবেক বিমানঘাঁটিতে মোবাইল ওরেশনিক লঞ্চার বসানো হবে। ছবিতে সুরক্ষিত রেল ট্রান্সফার পয়েন্ট ও রানওয়ের শেষে কংক্রিটের ঢালাই করা একটি অংশ দেখা যায়, যা ক্যামোফ্লেজ করা উৎক্ষেপণস্থলের ইঙ্গিত দেয় বলে গবেষকদের দাবি।
এদিকে, বেলারুশের প্রেসিডেন্ট আলেক্সান্ডার লুকাশেঙ্কো গত সপ্তাহে ১০টি ক্ষেপণাস্ত্রের কথা বলেছিলেন। তবে স্যাটেলাইট চিত্রে আলোচ্য ঘাঁটিতে সর্বোচ্চ ৩টি লঞ্চারের জন্য পর্যাপ্ত জায়গা দেখা গেছে।
ওরোশনিক ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা প্রায় ৩ হাজার ৪০০ মাইল (৫ হাজার ৫০০ কিমি) এবং এর গতি শব্দের চেয়ে ১০ গুণ বেশি (ম্যাক ১০)। রাশিয়ার দাবি, এটি প্রতিহত করা প্রায় অসম্ভব। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ইউক্রেনকে ন্যাটোর দূরপাল্লার অস্ত্র সরবরাহ থেকে বিরত রাখতে এবং পরমাণু অস্ত্রের হুমকি দিয়ে পশ্চিমাদের চাপে রাখতেই পুতিন এই কৌশল গ্রহণ করেছেন।
প্ল্যানেট ল্যাবসের ছবিতে দেখা গেছে, গত আগস্ট মাস থেকেই সেখানে অত্যন্ত দ্রুতগতিতে সামরিক মানের রেল পয়েন্ট এবং বিশেষ নিরাপত্তা বেষ্টনী তৈরির কাজ শুরু হয়েছে।
ব্রিটিশ থিঙ্ক ট্যাঙ্ক চ্যাথাম হাউসের বিশেষজ্ঞ জন ফোরম্যান বলেন, ২০২৫ সালে জার্মানিতে মার্কিন ‘ডার্ক ঈগল’ হাইপারসোনিক ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েনের সিদ্ধান্তের পাল্টা জবাব হিসেবেই পুতিন বেলারুশে এই ক্ষেপণাস্ত্র পাঠাচ্ছেন। স্নায়ুযুদ্ধের পর এই প্রথম রাশিয়া তাদের ভূখণ্ডের বাইরে পরমাণু অস্ত্র মোতায়েন করছে, যা মূলত পশ্চিমাদের প্রতি একটি কঠোর রাজনৈতিক বার্তা।
যদিও জেনেভাভিত্তিক রুশ পরমাণু বিশেষজ্ঞ পাভেল পোডভিগ মনে করেন, এই মোতায়েনে রাশিয়ার সামরিক শক্তিতে খুব বড় কোনো পরিবর্তন আসবে না। তবে এটি বেলারুশকে সুরক্ষার আশ্বাস দেয়ার একটি রাজনৈতিক কৌশল মাত্র।