মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কবলে কিউবা: দীর্ঘ লোডশেডিংয়ে স্থবির জনজীবন

কিউবার জাতীয় মুদ্রা পেসো দ্রুত মূল্য হারাচ্ছে, যার ফলে বাজারে প্রয়োজনীয় খাদ্যদ্রব্যের দামও বাড়ছে।

বয়স্কদের পাশাপাশি তরুণ প্রজন্মও আশা হারাতে বসেছে। অনেকেই দেশ ছাড়ার কথাও ভাবছেন। ‘এটা রাজনীতি না, এটা শুধু টিকে থাকার ব্যাপার,’ বলেন রিপার্তো ইলেকট্রিকোর তরুণী আইমি মিলানেস।

চরম অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে কমিউনিস্ট শাসিত দেশ কিউবা। যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর অর্থনৈতিক অবরোধ ও জ্বালানি সরবরাহে বাধার মুখে দেশটির সাধারণ মানুষ এখন কেবল টিকে থাকার লড়াই চালাচ্ছে। রাজধানী হাভানাসহ আশপাশের এলাকায় দীর্ঘস্থায়ী লোডশেডিং, খাদ্য ও জ্বালানির আকাশচুম্বী দাম এবং পরিবহন সংকটে স্থবির হয়ে পড়েছে কিউবানদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। খবর রয়টার্স।

হাভানার বিভিন্ন শ্রমজীবী মানুষ, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, ট্যাক্সিচালক, গৃহিণী ও রাষ্ট্রীয় কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে তৈরি চিত্রটি সংকটের তীব্রতা স্পষ্ট করে। যাদের অনেকেই বলছেন—জীবন এখন টিকে থাকার লড়াইয়ে আটকে আছে। জ্বালানির অভাব এতটাই প্রকট যে পাবলিক পরিবহনের বেশ কিছু বাস বন্ধ হয়ে গেছে, বেসরকারি ট্যাক্সির ভাড়া বেড়েছে, আর ঘণ্টাব্যাপী বিদ্যুৎ বিভ্রাটে ইলেকট্রিক ট্যাক্সিগুলোতেও চার্জ দেয়া যাচ্ছে না। তাই সেসব ট্যাক্সি নামতে পারছে না রাস্তায়।

কিউবার জাতীয় মুদ্রা পেসো দ্রুত মূল্য হারাচ্ছে, যার ফলে বাজারে প্রয়োজনীয় খাদ্যদ্রব্যের দামও বাড়ছে। ‘এভাবে কোনো বেতন দিয়ে চলা সম্ভব নয়,’ বলেন হাভানার গৃহিণী ইয়াতে ভার্দেসিয়া। অনেকের মতে, পণ্যের অভাবের পাশাপাশি ডলারের ওপর নির্ভরতা সংকটকে আরো তীব্র করেছে, কারণ সাধারণ মানুষের কাছে বিদেশী মুদ্রা সহজলভ্য নয়।

সম্প্রতি ভেনিজুয়েলা ও মেক্সিকো থেকে তেল সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর পরিস্থিতি আরো খারাপ হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য শুল্ক আরোপের হুমকি কিউবার জন্য বড় ধরনের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করেছে। কিউবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী এরইমধ্যে এ অবস্থাকে ‘আন্তর্জাতিক জরুরি অবস্থা’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। তবে সংকট মোকাবেলায় সরকারের কার্যকর পরিকল্পনা এখনো স্পষ্ট নয় বলে বহু নাগরিক অভিযোগ করছেন।

বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে সড়ক দুর্ঘটনার সংখ্যাও বাড়ছে। হাভানার উপকণ্ঠ মারিয়ানাও এলাকার বাসিন্দা রাইসা লেমু বলেন, এক দিনে ৮ থেকে ১২ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না। সিগন্যাল বন্ধ থাকায় দুর্ঘটনা লেগেই থাকে।

বয়স্কদের পাশাপাশি তরুণ প্রজন্মও আশা হারাতে বসেছে। অনেকেই দেশ ছাড়ার কথাও ভাবছেন। ‘এটা রাজনীতি না, এটা শুধু টিকে থাকার ব্যাপার,’ বলেন রিপার্তো ইলেকট্রিকোর তরুণী আইমি মিলানেস।

দীর্ঘদিন ধরে কিউবায় সরকারবিরোধী বিক্ষোভ কঠোরভাবে দমন করা হয়েছে। ২০২১ সালের পর বড় কোনো প্রতিবাদ না দেখা গেলেও বর্তমানের এই অভাবনীয় কষ্ট মানুষকে কতটা ধৈর্যশীল রাখবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। সাধারণ মানুষের কাছে এখন রাজনৈতিক মতাদর্শের চেয়েও বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে দুবেলা দুমুঠো অন্ন জোগাড় করা।

সত্তরোর্ধ্ব বৃদ্ধা মির্তা ত্রুহিলো বলেন, ‘আমি দেশের বিরুদ্ধে নই, কিন্তু আমি না খেয়ে মরতে চাই না।‘ কিউবার ভবিষ্যৎ এখন এক অনিশ্চিত অন্ধকারের দিকে ধাবিত হচ্ছে, যেখানে টিকে থাকাই এখন একমাত্র লক্ষ্য।

আরও