সিউলের ‘দানবীয় ক্ষেপণাস্ত্র’ হিউনমু-৫: কোরীয় উপদ্বীপে বাড়ছে উত্তেজনা

হিউনমু-৫ ক্ষেপণাস্ত্রটি প্রায় ৩৬ টন ওজনের একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, যা আট টন ওজনের একটি ওয়ারহেড বহন করতে পারে। এটি 'বাঙ্কার বাস্টার' ওয়ারহেড বহন করতে পারে, যা মাটির গভীরে প্রবেশ করে উত্তর কোরিয়ার নেতাদের সুরক্ষিত ভূগর্ভস্থ বাঙ্কারগুলো ধ্বংস করার ক্ষমতা রাখে।

উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক হুমকির মুখে নিজেদের অস্ত্রভাণ্ডারকে শক্তিশালী করতে দক্ষিণ কোরিয়া এ বছরের শেষ নাগাদ তাদের সবচেয়ে বড় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হিউনমু-৫ মোতায়েন শুরু করবে। স্থানীয় গণমাধ্যম এটিকে 'দানবীয় ক্ষেপণাস্ত্র' বা 'মনস্টার মিসাইল' নামে অভিহিত করেছে। খবর দ্য গার্ডিয়ান।

দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী আন গিউ-ব্যাক রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ইয়নহ্যাপকে জানান, উত্তর কোরিয়ার হুমকির মুখে ‘ভয়াবহতার ভারসাম্য’ বজায় রাখতে যথেষ্ট সংখ্যক হিউনমু-৫ ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করা প্রয়োজন। তিনি আরো বলেন, ভবিষ্যতে এর চেয়েও শক্তিশালী নতুন প্রজন্মের ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করা হবে।

হিউনমু-৫ ক্ষেপণাস্ত্রটি প্রায় ৩৬ টন ওজনের একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, যা আট টন ওজনের একটি ওয়ারহেড বহন করতে পারে। এটি 'বাঙ্কার বাস্টার' ওয়ারহেড বহন করতে পারে, যা মাটির গভীরে প্রবেশ করে উত্তর কোরিয়ার নেতাদের সুরক্ষিত ভূগর্ভস্থ বাঙ্কারগুলো ধ্বংস করার ক্ষমতা রাখে। ক্ষেপণাস্ত্রটির দৈর্ঘ্য প্রায় ১৬ মিটার এবং এটি একটি সার্ফেস-টু-সার্ফেস ক্ষেপণাস্ত্র হিসাবে তৈরি। মোবাইল প্ল্যাটফর্ম থেকে এটি উৎক্ষেপণ করা যেতে পারে। ওয়ারহেডের ওজন অনুযায়ী, এর পাল্লা ৬০০ কিলোমিটার থেকে ৫ হাজার কিলোমিটারেরও বেশি হতে পারে।

দক্ষিণ কোরিয়া পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তির (এনপিটি) স্বাক্ষরকারী দেশ হওয়ায় তারা পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকারী নয়। তাই এই হিউনমু-৫ হলো একটি কনভেনশনাল বা প্রচলিত ক্ষেপণাস্ত্র। সিউলের আসান ইনস্টিটিউট ফর পলিসি স্টাডিজের প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞ ড. ইয়াং উক বলেন, ‘আমাদের পারমাণবিক অস্ত্র নেই, তাই আমাদের একমাত্র প্রতিরক্ষা হলো সম্ভাব্য সবচেয়ে শক্তিশালী প্রচলিত অস্ত্র তৈরি করা।‘

২০১০ সালে উত্তর কোরিয়ার প্রাণঘাতী হামলা, বিশেষত 'চেওনান' যুদ্ধজাহাজ ডুবিয়ে দেয়া এবং ইয়েওনপিওং দ্বীপে বোমা হামলার পর এই ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির ধারণা আসে। তবে ২০১৭ সাল পর্যন্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্র পেলোড সংক্রান্ত বিধিনিষেধের কারণে এর উন্নয়নকাজ আটকে ছিল। উত্তর কোরিয়ার হাইড্রোজেন বোমা পরীক্ষার পর তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সেই বিধিনিষেধ প্রত্যাহার করেন।

হিউনমু-৫ মোতায়েনের ঘোষণাটি এমন সময়ে এসেছে, যখন দুই কোরিয়ার সম্পর্ক প্রচণ্ড শীতল। ক্ষমতায় আসার পর থেকে প্রেসিডেন্ট লি জে মিয়ং–এর শান্তি প্রচেষ্টা উপেক্ষা করেছে পিয়ংইয়ং।

লি নিজস্ব প্রতিরক্ষা সক্ষমতাকে তার প্রশাসনের মূল ভিত্তি হিসেবে ঘোষণা করেছেন। তিনি বলেন, ‘যারা মনে করে বিদেশী সেনা ছাড়া আমরা নিজেদের রক্ষা করতে পারি না—তাদের মানসিকতাই পরাধীনতার মূল।‘

দক্ষিণ কোরিয়া বর্তমানে প্রতিরক্ষায় ব্যয় করছে উত্তর কোরিয়ার পুরো জিডিপির প্রায় দেড়গুণ। বিশ্বে পঞ্চম শক্তিশালী সামরিক রাষ্ট্র হিসেবে অবস্থান করছে দেশটি। ইউক্রেন যুদ্ধের পর দেশটির অস্ত্র রফতানি দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, হিউনমু-৫ উত্তর কোরিয়ার উসকানি থামাতে পারবে কি না, নাকি বরং নতুন উত্তেজনা সৃষ্টি করবে—তা এখনো স্পষ্ট নয়।

ড. ইয়াং উক বলেন, ‘উত্তর কোরিয়া হয়তো প্রকাশ্যে এটিকে তুচ্ছ করবে, কিন্তু বাস্তবে তাদের নেতৃত্বের ভেতরে ভয় কাজ করবে—এতে কোনো সন্দেহ নেই।‘

আরও