গাজায় গণহত্যা: রায় দিতে এত দেরি করছে কেন আইসিজে

আইসিজে চাইলে বিপর্যয়ের তীব্রতা অনুযায়ী ‘প্রভিশনাল মেজারস’ নামক জরুরি নির্দেশনা দিতে পারে, যা ২০২৪ সালে তিন দফায় তারা দিয়েছে।

১৯৪৫ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে আইসিজে বরাবরই দ্রুত সিদ্ধান্তের চেয়ে বিচারিক সতর্কতায় বিশ্বাস করে এসেছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ইসরায়েল তাদের ডিফেন্স পেশ করার পর, দুই পক্ষই আবার পাল্টা যুক্তি উপস্থাপন করতে ছয় মাস করে সময় পাবে।

গাজা উপত্যকায় প্রতিদিন অনাহারে প্রাণ হারাচ্ছেন ফিলিস্তিনিরা। আন্তর্জাতিক আইনের বহু বিশেষজ্ঞ, মানবাধিকার সংস্থা ও রাজনৈতিক নেতারা ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডকে গণহত্যা হিসেবে আখ্যা দিতে শুরু করেছেন। তবে আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে) ইসরায়েলের বিরুদ্ধে গণহত্যা মামলার চূড়ান্ত রায় দিতে বহু বছর সময় নেবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। খবর দ্য গার্ডিয়ান।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গাজায় গণহত্যা সংঘটিত হচ্ছে কিনা সে বিষয়ে আইসিজের চূড়ান্ত রায় ২০২৭ সালের শেষের আগে আসা অনিশ্চিত। আদালতের দীর্ঘসূত্রতাকে ‘অজুহাত’ হিসেবে ব্যবহার করে যেন বিশ্ব সম্প্রদায় ইসরায়েলি আগ্রাসন থামাতে বিলম্ব না করে—এমন আহ্বানও জানিয়েছেন অনেকে।

দক্ষিণ আফ্রিকার করা গণহত্যার অভিযোগে সোমবার ইসরায়েলের জবাব দেয়ার কথা ছিল। কিন্তু আদালত ছয় মাসের সময় বৃদ্ধি করেছেন। ইসরায়েলের দাবি, দক্ষিণ আফ্রিকার উপস্থাপনায় ‘প্রমাণগত অস্পষ্টতা’ আছে, ফলে মামলার পরিধি এখনো পরিষ্কার নয়।

তবে এ অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে দক্ষিণ আফ্রিকা বলেছে, এ ধরনের দেরি একেবারেই অগ্রহণযোগ্য। বিশেষ করে গাজার মানবিক বিপর্যয়ের প্রেক্ষাপটে। তবুও, আদালত ইসরায়েলের পক্ষে অবস্থান নিয়ে ২০২৫ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত তাদের সময় দিয়েছে।

আইনের অধ্যাপক জুলিয়েট ম্যাকইনটাইয়ার বলেন, ‘আদালত এখানে খুবই সতর্কভাবে এগোচ্ছে, রাজনৈতিক চাপের কারণেই। তারা চায় না যেন ইসরায়েলের প্রক্রিয়াগত অধিকার লঙ্ঘন হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠুক।‘

১৯৪৫ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে আইসিজে বরাবরই দ্রুত সিদ্ধান্তের চেয়ে বিচারিক সতর্কতায় বিশ্বাস করে এসেছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ইসরায়েল তাদের ডিফেন্স পেশ করার পর, দুই পক্ষই আবার পাল্টা যুক্তি উপস্থাপন করতে ছয় মাস করে সময় পাবে। সাবেক আইসিজে কর্মকর্তা ও আইরিশ অধ্যাপক মাইকেল বেকার বলেন, ‘এই হিসেব অনুযায়ী শুনানি হবে সম্ভবত ২০২৭ সালে, আর রায় আসবে বছরের শেষ দিকে।‘ তবে মধ্যবর্তী সময়ে অন্যান্য রাষ্ট্র হস্তক্ষেপ চাইলে তা প্রক্রিয়া আরও দীর্ঘায়িত করতে পারে।

আইসিজে চাইলে বিপর্যয়ের তীব্রতা অনুযায়ী ‘প্রভিশনাল মেজারস’ নামক জরুরি নির্দেশনা দিতে পারে, যা ২০২৪ সালে তিন দফায় তারা দিয়েছে। সে বছরের জানুয়ারিতে, আদালত গণহত্যার অভিযোগকে ‘বিশ্বাসযোগ্য’ বলে আখ্যা দিয়ে ইসরায়েলকে গণহত্যা রোধে প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নিতে নির্দেশ দেয়। এরপর মার্চে, মানবিক সহায়তা ঢুকতে দিতে বলা হয়। মে মাসে, ইসরায়েলকে রাফা শহরের সামরিক অভিযান বন্ধ ও রাফা সীমান্ত খুলে দিতে নির্দেশ দেয় আদালত। তবে ইসরায়েল এসব নির্দেশনা প্রায় উপেক্ষাই করেছে এবং গণহত্যার অভিযোগকে ‘অসত্য ও অযৌক্তিক’ বলে উড়িয়ে দেয়।

দক্ষিণ আফ্রিকাও কোনো নতুন জরুরি পদক্ষেপ চাইছে না। এর পেছনে ওয়াশিংটনের চাপ কাজ করছে বলে জানা গেছে। এমনকি ২০২৪ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্প দক্ষিণ আফ্রিকার প্রতি সহায়তা বন্ধ করে দেন এবং তাদের আইসিজের ভূমিকার জন্য দোষারোপ করেন। তবে দক্ষিণ আফ্রিকা সরকার বলেছে, তারা গাজার মামলা থেকে সরে আসার কোনো পরিকল্পনা করছে না।

আইনের ভাষায়, ১৯৪৮ সালের জেনোসাইড কনভেনশনে গণহত্যার সংজ্ঞায় বলা হয়েছে—‘আংশিক বা সম্পূর্ণভাবে একটি জাতি, গোষ্ঠী বা ধর্মীয় জনগোষ্ঠীকে ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে কোনো কাজ করা’। কিন্তু আইসিজে তাদের রায়ে এর জন্য ‘সম্পূর্ণ ও চূড়ান্ত প্রমাণ’ চায়।

এ কারণেই, আজ পর্যন্ত আইসিজে কোনো রাষ্ট্রকে গণহত্যার জন্য দোষী সাব্যস্ত করেনি। তবে গাজা মামলার আগেই মিয়ানমারের রোহিঙ্গা নির্যাতন ইস্যুতে শুনানি শুরু হবে। এ ঘটনা এই মানদণ্ডে কিছুটা শিথিলতা আনতে পারে।

তবুও, অনেক আইনি বিশ্লেষকের মতে, ইসরায়েল এরইমধ্যে সেই কঠিন মানদণ্ডও অতিক্রম করে ফেলেছে। আইন বিশেষজ্ঞ জুলিয়েট ম্যাকইনটাইয়ার বলেন, ‘মামলার কার্যক্রম ধীর এবং হতাশাজনক। তবুও যখন আদালত রায় দেবে যে ইসরায়েল গণহত্যা করেছে, তখন কেউ তা নিয়ে সন্দেহ করতে পারবে না।‘

আরও