হরমুজ প্রণালিতে দুই জাহাজে নতুন করে হামলা এবং ইরানের ওপর অনির্দিষ্টকালের জন্য নৌ-অবরোধ বজায় রাখার মার্কিন ঘোষণার পর কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ এ জলপথে বাণিজ্যিক জাহাজের চলাচল প্রায় পুরোপুরি থমকে গেছে। খবর রয়টার্স।
গত জুনে যুদ্ধবিরতির লক্ষ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা চুক্তি ভেস্তে যাওয়ার পর থেকে এ অঞ্চলে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা জোরদার করেছে ইরান। দেশটির এক জ্যেষ্ঠ কূটনৈতিক সূত্র বুধবার জানিয়েছেন, যুদ্ধ বন্ধে গত জুনে স্বাক্ষরিত সমঝোতা চুক্তিটি কার্যকর করা বা সেটির ওপর ভিত্তি করে পরবর্তী আলোচনাকে এগিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে কোনো ইতিবাচক অগ্রগতি হয়নি।
বর্তমানে তেহরানের অনুমোদন ছাড়া প্রণালিটি অতিক্রমের চেষ্টা করা জাহাজগুলোকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে দেশটির বিরুদ্ধে। সবশেষ স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় দুটি তেলবাহী জাহাজে হামলার জন্য ইরানকে দায়ী করেছে সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি আবুধাবি ন্যাশনাল অয়েল কোম্পানি (এডিএনওসি)। তবে এ বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করেনি ইরান।
শিপ ট্র্যাকিং ফার্ম 'কেপলার'-এর তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার মাত্র দুটি জাহাজ এ সংকীর্ণ জলপথ অতিক্রম করতে সক্ষম হয়েছে। এর একটি ইরানি জলসীমায় প্রবেশ করা শস্যবাহী জাহাজ এবং অপরটি বিপরীতমুখী খালি বাল্ক ক্যারিয়ার।
এদিকে পানামা সফরকালে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ সাংবাদিকদের বলেন, মার্কিন নৌবাহিনী অনির্দিষ্টকালের জন্য এ অবরোধ বজায় রাখতে সক্ষম। আমরা পর্যায়ক্রমে জাহাজ পরিবর্তন করে আমাদের উপস্থিতি অব্যাহত রাখব।
অন্যদিকে নিউজমেক্সকে দেয়া সাক্ষাৎকারে মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট জানান, ইরানের ওপর অভূতপূর্ব অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপের পরিকল্পনা করছে ওয়াশিংটন। তিনি বলেন, আগামী সপ্তাহে নতুন ঘোষণার জন্য প্রস্তুত থাকুন। কোনো একটি দেশকে অর্থনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করার ইতিহাসে যা কখনো দেখা যায়নি, আমরা তেমনই কঠোর পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছি।
ভূ-রাজনৈতিক এ উত্তেজনার প্রভাব জ্বালানি বাজারেও পড়েছে। আন্তর্জাতিক বেঞ্চমার্ক ব্রেন্ট ক্রুড ফিউচার্স এবং মার্কিন ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) ক্রুডের দাম বেড়ে যথাক্রমে ব্যারেল প্রতি প্রায় ৮৭ ডলার এবং ৮১ ডলারে উঠে এসেছে। জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিতে এশিয়ার রিফাইনারিগুলো চলতি সপ্তাহে মার্কিন অপরিশোধিত তেল কেনা বাড়িয়েছে। একই কারণে গত জুলাই মাসে ভারতে রুশ তেলের আমদানি রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একাধিকবার দাবি করেছেন, হরমুজ প্রণালির ওপর আমেরিকার 'পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ' রয়েছে। তবে ট্রাম্পের এ দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে ইরান। তেহরান স্পষ্ট জানিয়েছে, তাদের ওপর থেকে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং জব্দ করা সম্পদ ফেরত না দেয়া পর্যন্ত এ জলপথ খুলে দেয়া হবে না। গত বৃহস্পতিবার ইরানের সংসদীয় কমিটি এক পরিকল্পনায় মার্কিন, ইসরায়েলি এবং অন্য শত্রুভাবাপন্ন দেশের সম্পত্তি ও সামরিক সরঞ্জাম পরিবহন নিষিদ্ধের বিধান অনুমোদন করেছে।
গত জুনের মাঝামাঝি সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দর ও নৌ-পরিবহনের ওপর থেকে এক মাসের জন্য অবরোধ তুলে নিলেও পরে তা পুনরায় বহাল করে। এর ফলে তেহরানের বৈদেশিক মুদ্রার প্রধান উৎস বন্ধ হয়ে যায়। এছাড়া অন্য সংকটের মধ্যে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি গোষ্ঠী বৃহস্পতিবার সৌদি আরামকোর একটি তেল শোধনাগারে ড্রোন হামলা চালিয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে। এ হামলা আঞ্চলিক সংঘাত আরো বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা বাড়িয়ে দিয়েছে।
অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে বলেছেন, যুদ্ধ দ্রুত বন্ধ না হলে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি চরমভাবে ব্যাহত হবে এবং একাধিক অঞ্চল মন্দার কবলে পড়তে পারে।