ইউরোপের ধৈর্য যেন এবার বাঁধ ভেঙেছে। সোমবার ডোনাল্ড ট্রাম্প আবারো জোর দিয়ে বলেছেন, জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিনল্যান্ড প্রয়োজন। সাংবাদিকরা যখন প্রশ্ন করেন, এই দ্বীপ দখলের জন্য তিনি সামরিক শক্তি ব্যবহার করবেন কি না, ট্রাম্পের উত্তর ছিল— ‘নো কমেন্ট’ বা মন্তব্য নেই। ট্রাম্পের এই রহস্যময় নীরবতা গ্রিনল্যান্ডের সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম উৎকণ্ঠা ছড়িয়েছে।
ডেনমার্কের আধা-স্বায়ত্তশাসিত এ অঞ্চলটি ইইউ এবং ন্যাটোর সদস্য। ট্রাম্প এখন ইউরোপীয় মিত্রদের ওপর চাপ সৃষ্টি করছেন যেন তারা ডেনমার্কের পক্ষ ত্যাগ করে গ্রিনল্যান্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে ছেড়ে দেয়। অন্যথায়, ইউরোপ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে রফতানি হওয়া পণ্যের ওপর শাস্তিমূলক শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছেন তিনি। জার্মানির অটোমোবাইল শিল্প এবং ইতালির বিলাসবহুল পণ্যের বাজারের জন্য এটি একটি ভয়াবহ দুঃস্বপ্ন।
এতদিন ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে ইউরোপীয় নেতারা 'ধীরে চলো' নীতি অবলম্বন করলেও, এখন তারা সুর পাল্টেছেন। জার্মানির অর্থমন্ত্রী সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, ‘আমরা ব্ল্যাকমেইল সহ্য করব না।‘ অন্যদিকে, ফ্রান্সের অর্থমন্ত্রী রোলাঁ লেস্ক্যুর মন্তব্য করেন, ‘২৫০ বছরের মিত্র এখন শুল্ককে ভূরাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে চাইছে। এটা আগে কখনো দেখিনি।‘ জার্মান অর্থমন্ত্রী লার্স ক্লিংবাইল বলেন, ‘সীমা অতিক্রম করা হয়েছে। ইউরোপকে প্রস্তুত থাকতে হবে।‘
এর মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হচ্ছে, ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে ইউরোপ যে ‘সফট ডিপ্লোম্যাসি’র কৌশল নিয়েছিল, তার মেয়াদ প্রায় শেষ।
আসছে বুধবার সুইজারল্যান্ডের গ্লোবাল ইকোনমিক ফোরামে ইউরোপীয় নেতারা ট্রাম্পের সঙ্গে আলোচনার টেবিলে বসবেন। তাদের কৌশল হবে 'মিষ্টি কথা, কিন্তু হাতে বড় লাঠি'। একদিকে, ইউরোপীয় নেতারা ট্রাম্পকে আশ্বস্ত করছেন যে আর্কটিক অঞ্চলের নিরাপত্তায় তারা সহযোগিতায় প্রস্তুত, গ্রিনল্যান্ড নিয়ে একতরফা পদক্ষেপের প্রয়োজন নেই। অন্যদিকে, ইইউ কূটনীতিকরা ইঙ্গিত দিয়েছেন—যুক্তরাষ্ট্র যদি তথাকথিত ‘গ্রিনল্যান্ড শুল্ক’ আরোপ করে, তবে ইউরোপ ৯৩ বিলিয়ন ইউরোর মার্কিন পণ্যে পাল্টা শুল্ক বা ইউরোপীয় বাজারে মার্কিন কোম্পানির প্রবেশ সীমিত করতে পারে।
ইইউ বিশ্বের বৃহত্তম বাণিজ্যিক শক্তিগুলোর একটি। ২০২৪ সালে বৈশ্বিক বাণিজ্যের প্রায় ১৬ শতাংশ তাদের দখলে। যুক্তরাষ্ট্রে ইউরোপীয় বিনিয়োগের কারণে প্রায় ৩৪ লাখ মার্কিন নাগরিক কর্মসংস্থানের সঙ্গে যুক্ত। ফলে ইউরোপের পাল্টা পদক্ষেপ মার্কিন ভোক্তাদের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। তবু ইইউ কমিশনের মুখপাত্র ওলোফ গিল বলেন, ‘আমাদের অগ্রাধিকার আলোচনায় থাকা, উত্তেজনা বাড়ানো নয়।‘
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট দাভোসে স্পষ্ট ভাষায় জানান, গ্রিনল্যান্ড যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত সম্পদ এবং ওয়াশিংটন ‘নিজেদের নিরাপত্তা অন্যের হাতে ছেড়ে দেবে না’। ইউরোপীয় শুল্ক পাল্টা জবাবকে তিনি ‘অবিবেচক’ বলে আখ্যা দেন।
এখানেই ইউরোপের দ্বন্দ্ব। একদিকে ট্রাম্পের মুখোমুখি দাঁড়ানো প্রয়োজন, অন্যদিকে ইউক্রেন যুদ্ধ ও মহাদেশীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর ইউরোপ এখনো গভীরভাবে নির্ভরশীল। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রতিরক্ষা ও গোয়েন্দা সহযোগিতা যুক্তরাজ্যের জাতীয় স্বার্থ। কিন্তু ইউরোপ যদি ডেনমার্কের সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে দৃঢ় না হয়, তবে ন্যাটোর ভেতরেই দুর্বল বার্তা যাবে—এমন আশঙ্কা বাড়ছে।
পশ্চিমা বিশ্বের এই ফাটল গভীর পর্যবেক্ষণে রেখেছে রাশিয়া ও চীন। ট্রাম্পের অস্থির নীতির সুযোগ নিয়ে চীন নিজেকে এখন আরো স্থিতিশীল অংশীদার হিসেবে তুলে ধরছে। এমনকি কানাডাও ওয়াশিংটনের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে চীনের সঙ্গে সীমিত বাণিজ্য চুক্তি করেছে।
এদিকে, ট্রাম্প 'বোর্ড অব পিস' নামক একটি নতুন সংস্থা গড়ার প্রস্তাব দিয়েছেন, যা মূলত গাজা পুনর্গঠনের কথা বললেও এর পরিধি জাতিসংঘের বিকল্প হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ এই সংস্থায় যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। অন্যদিকে, ক্রেমলিন জানিয়েছে ভ্লাদিমির পুতিনকেও এই বোর্ডে যোগ দেয়ার আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে, যা পশ্চিমা জোটের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ।
মূলত, ট্রাম্পের নীতি আন্তর্জাতিক সম্পর্কের দীর্ঘদিনের নিয়মগুলোকে ওলটপালট করে দিচ্ছে। যদিও গ্রিনল্যান্ডের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় ইউরোপ একজোট হওয়ার চেষ্টা করছে, তবে শেষ পর্যন্ত তারা কতটা অটল থাকতে পারবে তা নিয়ে সংশয় আছে। কারণ, একটি পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্য যুদ্ধ ইউরোপের সাধারণ ভোটারদের জীবনযাত্রার ওপর সরাসরি আঘাত হানবে। ইউরোপ এখন এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে— যেখানে তাদের অস্তিত্ব রক্ষায় কেবল কূটনীতি নয়, মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়ানোর সময় এসেছে।