দীর্ঘ 'স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন’ ভাষণে ‘যুক্তরাষ্ট্রের স্বর্ণযুগ’ বলে ট্রাম্পের গুণগান

ট্রাম্প তার এই টেলিভিশন ভাষণের প্রথম এক ঘণ্টা অর্থনীতির ওপর আলোকপাত করেন। তিনি মুদ্রাস্ফীতি কমিয়েছেন, শেয়ার বাজারকে রেকর্ড উচ্চতায় নিয়ে গেছেন, ব্যাপক কর ছাড় দিয়েছেন এবং ওষুধের দাম কমিয়েছেন বলে দাবি করেন।

জনগণের আস্থা কমে যাওয়া এবং ব্যাপক অসন্তোষের মাঝেও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার শাসনামলকে ‘যুক্তরাষ্ট্রের স্বর্ণযুগ’ হিসেবে দাবি করেছেন। মঙ্গলবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) তার ‘স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন’ ভাষণে নিজের সাফল্যের এক উজ্জ্বল চিত্র তুলে ধরার চেষ্টা করেন তিনি। খবর রয়টার্স।

৭৯ বছর বয়সী ট্রাম্পের এই ভাষণ প্রায় এক ঘণ্টা ৪৭ মিনিট স্থায়ী ছিল। এর আগে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন মার্কিন কংগ্রেসে দীর্ঘতম স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন ভাষণ দিয়েছিলেন। এবার ট্রাম্প তার রেকর্ড ভেঙ্গে দিয়েছেন।

ট্রাম্প তার এই টেলিভিশন ভাষণের প্রথম এক ঘণ্টা অর্থনীতির ওপর আলোকপাত করেন। তিনি মুদ্রাস্ফীতি কমিয়েছেন, শেয়ার বাজারকে রেকর্ড উচ্চতায় নিয়ে গেছেন, ব্যাপক কর ছাড় দিয়েছেন এবং ওষুধের দাম কমিয়েছেন বলে দাবি করেন।

উচ্চ দ্রব্যমূল্যের জন্য তার সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনকে দায়ী করার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু জনমত জরিপ বলছে ভিন্ন কথা। ভোটাররা চলমান অর্থনৈতিক সংকটের জন্যে ট্রাম্পকেই দায়ী করছেন। কারণ তিনি নির্বাচনী প্রচারণায় সংকট নিরসনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। ক্ষমতায় আসার পর যা নিয়ে তিনি যথেষ্ট পদক্ষেপ নেননি।

রিপাবলিকান আইনপ্রণেতাদের ‘ইউএসএস ইউএসএ’ উল্লাসধ্বনির মধ্যে ভাষণ দিতে উঠে ট্রাম্প বলেন, দেশ আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে আরও বৃহৎ, চমৎকার, ধনী ও শক্তিশালী হয়ে ফিরে এসেছে। এদিন ডেমোক্র্যাটদের অনেক আসনই ফাঁকা ছিল, তারা বাইরে ট্রাম্পবিরোধী সমাবেশে অংশ নিতে গিয়ে স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন ভাষণ বর্জন করেন।

কংগ্রেসের এই বার্ষিক ভাষণ এমন এক সময়ে দেওয়া হলো যখন ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সি এক কঠিন সময় পার করছে। জরিপে দেখা গেছে, অধিকাংশ নাগরিক তার কার্যক্রমে অসন্তুষ্ট। ইরান নিয়েও বাড়ছে উদ্বেগ এবং মার্কিন সর্বোচ্চ আদালত ট্রাম্পের আমদানি শুল্কনীতিকে অবৈধ বলায় তার প্রধান শুল্ক নীতি হুমকির মুখে পড়েছে।

এবারের ভাষণের বেশির ভাগ সময় ট্রাম্প ছিলেন অস্বাভাবিকভাবে সংযত। তিনি মূলত লিখিত বক্তব্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিলেন এবং অপ্রাসঙ্গিক কথাবার্তা এড়িয়ে চলেন। তবে অভিবাসনবিরোধী অভিযান নিয়ে আলোচনার সময় তিনি তার আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠেন এবং কয়েকজন ডেমোক্র্যাটিক আইনপ্রণেতাদেরকে রূঢ়ভাবে অপমান করেন।

মুদ্রাস্ফীতি ‘দ্রুত কমছে’ বললেও দৈনন্দিন ব্যবহার্য পণ্য, আবাসন, বীমা এবং ইউটিলিটি বিলের খরচ কয়েক বছর আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। শুক্রবার প্রকাশিত নতুন তথ্যে দেখা গেছে, গত বছর অর্থনীতি প্রত্যাশার চেয়ে বেশি মন্থর হয়েছে এবং মুদ্রাস্ফীতি বেড়েছে।

রয়টার্স\ইপসোসের এক জরিপে দেখা গেছে, মাত্র ৩৬ শতাংশ নাগরিক অর্থনীতি পরিচালনায় তার পদক্ষেপে সন্তুষ্ট। এদিকে ডেমোক্র্যাটরা চলতি বছরের নভেম্বরে রিপাবলিকানদের কাছ থেকে কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার আশা করছে। তখন প্রতিনিধি পরিষদের ৪৩৫টি আসনের সবকটি এবং সিনেটের ১০০টি আসনের প্রায় এক-তৃতীয়াংশের জন্য ভোটগ্রহণ হবে।

এর মধ্যে দেশটিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বর্তমানে শেয়ার বাজারকে চাঙ্গা করলেও কর্মীদের চাকরির নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। তবে ট্রাম্প তার ভাষণে এই বিষয়ে নিয়ে কোনো আলোচনা করেননি।

আবার তিনি নিয়মিত বিভিন্ন দেশের নানা ইস্যুতে প্রচুর শক্তি ও সময় ব্যয় করলেও, তার ভাষণে পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে খুব কম কথা বলেছেন। বরং আবারও তিনি আটটি যুদ্ধ ‘শেষ’ করার দাবি তোলেন তিনি।

রাশিয়া ও ইউক্রেন যুদ্ধের চার বছর পার হওয়া নিয়েও তিনি তা নিয়ে তেমন কোনো কথা বলেননি। এমনকি আমেরিকার প্রধান অর্থনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী চীন কিংবা ডেনমার্কের আধা-স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল গ্রিনল্যান্ড, যা তিনি দখল করার হুমকি দিয়েছিলেন, সে সম্পর্কেও তিনি নীরব ছিলেন।

তেহরানের সঙ্গে সামরিক সংঘাতের দিকে এগিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া গেলেও, ইরান নিয়ে তার পরিকল্পনা সম্পর্কে ট্রাম্প এবারও কোনো স্পষ্ট ধারণা দেননি।

নিজের প্রিয় বিষয় অভিবাসন প্রসঙ্গে কথা বলার সময় ট্রাম্প তার ২০২৪ সালের নির্বাচনী প্রচারণার পুরনো বুলিই আওরান। তার ভাষ্য, অবৈধ অভিবাসীরা দেশে সহিংস অপরাধের জন্য দায়ী, যদিও বিভিন্ন গবেষণায় বিষয়টি পুরোপুরি সত্য নয়।

এদিকে অভিবাসনবিরোধী আইসিই এজেন্টদের আগ্রাসী নিয়ন্ত্রণে পদক্ষেপ না নেওয়া পর্যন্ত ডেমোক্র্যাটরা ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটিকে তহবিল দিতে অস্বীকার করেছিল। এর জবাবে ট্রাম্প তাদের ভর্ৎসনা করেন।

আবার ট্রাম্প বরাবরই বছরের পর বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাচনী কারচুপির মিথ্যা দাবি করে এসেছেন। এবার তিনি ভোটার শনাক্তকরণ বাধ্যতামূলক করার আইন সমর্থন না করায় ডেমোক্র্যাটদের আক্রমণ করেন।

অন্যদিকে ডেমোক্র্যাটরা যুক্তি দেন, রিপাবলিকান সমর্থিত এই আইন ভোটারদের ওপর অপ্রয়োজনীয় বোঝা হয়ে দাঁড়াবে এবং তারা ভোট প্রদানে অনীহা দেখা দেবে।

বেশ কয়েকজন নারী ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতা ‘নথিগুলো প্রকাশ করুন’ লেখা ট্যাগ পরেছিলেন, যা কুখ্যাত যৌন নিপীড়ক জেফরি এপসটেইনের নথি প্রকাশের দিকে ইঙ্গিত করে। পাশাপাশি এপস্টেইনের বিরুদ্ধে অভিযোগকারী প্রায় এক ডজন নারী ডেমোক্র্যাটদের অতিথি হিসেবে অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।

আরও