ইয়েমেনে নতুন করে শুরু হওয়া গৃহযুদ্ধে সৌদি আরবের সঙ্গে কোনো দেশকে যোগ না দেয়ার সতর্কবার্তা দিয়েছে হুথিরা। একইসঙ্গে লোহিত সাগরে মার্কিন জাহাজে হামলা চালাবে না বলে যুক্তরাষ্ট্রকে আশ্বস্ত করেছে গোষ্ঠীটি। গতকাল বার্তা সংস্থা এপি-কে এ তথ্য জানিয়েছেন এক জ্যেষ্ঠ হুথি কর্মকর্তা।
হুথিদের রাজনৈতিক ব্যুরোর সদস্য মোহাম্মদ আল-বুখাইতি বলেন, চলতি মাসের শুরুতে ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূল ধরে দ্রুত অগ্রসর হয়ে বাব আল-মানদেব প্রণালির দিকে যাওয়ার পর হুথিদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল যুক্তরাষ্ট্র।
হুথি-নিয়ন্ত্রিত রাজধানী সানা থেকে জুমে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘আমরা নিশ্চিত করেছি যে প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্র কিংবা অন্য কোনো দেশকে লক্ষ্যবস্তু করছি না। একমাত্র ব্যতিক্রম সৌদি শত্রু। এ অবস্থান এখনো বহাল আছে।’
গত সপ্তাহান্তে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছিলেন, মার্কিন প্রশাসন হুথিদের সঙ্গে ‘আলোচনা করেছে’। তবে কখন আলোচনা হয়েছে, তা তিনি জানাননি। ট্রাম্প বলেন, ‘হুথিরা আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে এবং তারা আমাদের সঙ্গে লড়াই করতে চায় না। তারা বরং চায় আমরা এতে জড়িত না থাকি এবং বেশির ভাগ জাহাজকে চলাচল করতে দিচ্ছে।’
গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র ও হুথি প্রতিনিধিদের মধ্যে একটি বৈঠক হয়েছে ওমানে। এক হুথি এক কর্মকর্তা এবং ওই আলোচনার বিষয়ে অবগত আরেক ব্যক্তি এ তথ্য জানিয়েছেন।
তবে আল-বুখাইতি মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের কথা নিশ্চিত করেননি। তিনি শুধু বলেন, দীর্ঘদিনের মধ্যস্থতাকারী ওমানের মাধ্যমে মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে পরোক্ষ যোগাযোগ হয়েছে।
২০২৫ সালে ওমানের মধ্যস্থতায় হুথিদের সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসনের যুদ্ধবিরতি হয়েছিল। এর মাধ্যমে হুথিদের বিরুদ্ধে কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা মার্কিন বোমাবর্ষণ বন্ধ হয় এবং এর বিনিময়ে হুথিরা লোহিত সাগরে মার্কিন জাহাজে হামলা বন্ধ করে।
আল-বুখাইতি বলেন, ‘আমাদের সামরিক অভিযানের লক্ষ্য বাব আল-মানদেব প্রণালি বন্ধ করা নয়। বরং ইয়েমেনসহ সবার জন্য এর মধ্য দিয়ে অবাধ নৌ চলাচল নিশ্চিত করা।’
তিনি বলেন, সৌদি আরবের পাশাপাশি অন্য কোনো দেশ ইয়েমেনের বিরুদ্ধে ‘আগ্রাসনে’ জড়িয়ে পড়লে একাধিক ফ্রন্টে যুদ্ধ করার সক্ষমতা হুথিদের রয়েছে।
তিনি বলেন, ‘আজ ইয়েমেন শুধু অভ্যন্তরীণ সংঘাত নয়, আন্তর্জাতিক যুদ্ধও চালানোর সক্ষমতা রাখে।’
ছবি: রয়টার্স
আল-বুখাইতি বলেন, প্রতিবেশী সৌদি আরবের বিরুদ্ধে হুথিদের হামলা অব্যাহত থাকবে, যতক্ষণ না রিয়াদ ইয়েমেনে বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলোর ওপর এক দশক ধরে চলা অবরোধ প্রত্যাহার করে এবং লোহিত সাগরে হুথি-নিয়ন্ত্রিত বন্দরগুলোয় জাহাজ চলাচলের অনুমতি দেয়। এরপর তারা আলোচনায় বসতে প্রস্তুত থাকবে বলে জানান তিনি।
ইয়েমেনে সর্বশেষ সহিংসতা বৃদ্ধির জন্য সৌদি আরবকে দায়ী করেন আল-বুখাইতি। তার ভাষ্য, হুথিদের বিরুদ্ধে লড়াইরত সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের একটি বিমান হামলার পর নতুন করে সহিংসতা শুরু হয়। ওই হামলায় সানা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর আক্রান্ত হয়। এতে হুথিদের একটি প্রতিনিধিদল বহনকারী ইরানি উড়োজাহাজ সেখানে অবতরণ করতে পারেনি। জোটের আকাশ ও নৌ অবরোধকে চ্যালেঞ্জ করতেই ওই ফ্লাইট পরিচালনা করা হয়েছিল বলে জানান তিনি।
এর জবাবে সৌদি আরবে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায় হুথিরা। গত শনিবার রিয়াদকে লক্ষ্য করেও একটি হামলা চালানো হয়, তবে সেটি প্রতিহত করা হয়। সৌদি কর্মকর্তারা জানান, হুথিদের একটি ড্রোনের ধ্বংসাবশেষের আঘাতে একজন বেসামরিক নাগরিক নিহত এবং আরো কয়েকজন আহত হয়েছেন।
হুথিরা বাব আল-মানদেব প্রণালি ও লোহিত সাগরে সৌদি জাহাজ চলাচলের ওপরও অবরোধ ঘোষণা করেছে। তারা সৌদি-সংশ্লিষ্ট জাহাজ এবং বিশ্বের শীর্ষ জ্বালানি তেল রফতানিকারক দেশটির ভেতরে তেল স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে।
সৌদি আরব ও তার মিত্ররা দীর্ঘদিন ধরেই হুথিদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে হিমশিম খাচ্ছে। ফলে হামলা বন্ধে তারা কূটনৈতিক সমাধানের পথ খুঁজতে পারে। তবে শেষ পর্যন্ত এর জন্য ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কিছু বিষয়ে সমঝোতায় যেতে হতে পারে। কারণ হুথিদের ওপর প্রভাব খাটানোর সক্ষমতা রয়েছে একমাত্র ইরানের। কিন্তু নিজেদের যুদ্ধ নিয়ে ওয়াশিংটন ও তেহরানের আলোচনা কয়েক সপ্তাহ আগে ভেঙে গেছে।
হুথিদের সর্বোচ্চ রাজনৈতিক পরিষদের প্রেসিডেন্ট মাহদি আল-মাশাত রোববার এক ভাষণে বলেন, ‘আমরা শান্তির দরজা বন্ধ করিনি।’ ২০১৪ সালে হুথিদের সানা দখলের বার্ষিকী উপলক্ষে তিনি এ বক্তব্য দেন। হুথিদের সর্বোচ্চ রাজনৈতিক পরিষদই তাদের শীর্ষ নির্বাহী সংস্থা।
ইয়েমেনের ভেতরে অগ্রসর হয়ে হুথিরা গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী মোখা এবং লোহিত সাগরের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দ্বীপ দখল করেছে। এর ফলে বাব আল-মানদেব দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের ওপর নজরদারির সক্ষমতা আরো বেড়েছে। বিশ্বের মোট বাণিজ্যের প্রায় ১২ শতাংশ সাধারণত এই প্রণালি দিয়ে চলাচল করে।
দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন উপদলে বিভক্ত সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেনি সরকারি বাহিনী পিছু হটেছে। তবে তারা আবার সংগঠিত হওয়ার অঙ্গীকার করেছে।
সাম্প্রতিক উত্তেজনা বৃদ্ধিতে অবসান ঘটেছে ২০২২ সালের যুদ্ধবিরতির। ওই যুদ্ধবিরতির ফলে ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধের লড়াই অনেকটাই থেমে গিয়েছিল। ১২ বছর আগে নিজেদের পার্বত্য ঘাঁটি থেকে বেরিয়ে হুথিরা উত্তর ও মধ্য ইয়েমেনের বড় অংশ, যার মধ্যে রাজধানী সানাও ছিল, দখল করার মধ্য দিয়ে এই গৃহযুদ্ধ শুরু হয়।
পরের বছর আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারের পক্ষে যুদ্ধে নামে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, এই গৃহযুদ্ধে অন্তত ১ লাখ ৫০ হাজার মানুষ নিহত হয়েছে এবং দেশটি দুর্ভিক্ষের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গিয়েছিল।
এখন লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের দিকে মুখ করা ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূল হুথিদের নিয়ন্ত্রণে থাকায় ‘ক্ষমতার ভারসাম্য সানা সরকারের পক্ষে চলে গেছে’ বলে মন্তব্য করেন আল-বুখাইতি। তিনি হুথিদের কার্যত নিয়ন্ত্রিত প্রশাসনকে সানা সরকার হিসেবে উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, ‘শেষ পর্যন্ত সৌদি আরব তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তাস পশ্চিম উপকূল হারিয়েছে।’