জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও সরকারি সেবার অবনতির প্রতিবাদে শুরু হওয়া বিক্ষোভ সহিংসতায় রূপ নেয়ার পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ফ্রান্সের বিভিন্ন এলাকায় স্থানীয়ভাবে কারফিউ আরোপের ঘোষণা দিয়েছে সরকার। একযোগে সব স্থানে কারফিউ জারির বদলে পরিস্থিতি বিবেচনায় নির্দিষ্ট এলাকা ও নির্দিষ্ট সময়ের জন্য চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপের ক্ষমতা দেয়া হয়েছে স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে। এরই মধ্যে মার্সেইয়ে জনসমাবেশ ও বিক্ষোভের ওপর সাময়িক নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছে। তবে গতকালও ফ্রান্সের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ, অবরোধ ও সমাবেশ অব্যাহত ছিল। এর মধ্যেই ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলনের সংগঠকরা ২৪ অক্টোবর নতুন করে বিক্ষোভের ডাক দিয়েছেন। কয়েকদিন ধরে চলা সহিংসতায় প্রায় তিন হাজার দোকান ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গ্রেফতার হয়েছেন প্রায় ২ হাজার ৪০০ জন। পরিস্থিতির অবনতিতে জার্মানি, ইতালি, পোল্যান্ডসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশের পাশাপাশি চীনও ফ্রান্সে অবস্থানরত ও ভ্রমণেচ্ছু নাগরিকদের সতর্ক করেছে।
গতকাল জরুরি বৈঠকের পর ফরাসি প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়েন লেকর্নু জানান, পুরো প্যারিসে কারফিউ দেয়া বাস্তবসম্মত নয়। বরং যেখানে প্রয়োজন সেখানে ‘সীমিত ও স্থানীয়’ কারফিউ কার্যকর করাই আপাতত উপযুক্ত ব্যবস্থা। তবে কোন কোন শহর বা এলাকায় ঠিক কখন থেকে কারফিউ কার্যকর হবে, তাৎক্ষণিকভাবে তার পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশ করা হয়নি। পরিস্থিতির আরো অবনতি হলে জরুরি অবস্থা জারির সম্ভাবনাও নাকচ করেননি তিনি। সরকারের ভাষ্য, এসব বিধিনিষেধের মূল উদ্দেশ্য মানুষ ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে সহিংসতা ও লুটপাট থেকে রক্ষা করা।
এরই মধ্যে ফ্রান্সের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর মার্সেইয়ে গতকাল দুপুর ১২টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত জনসমাবেশ ও বিক্ষোভ নিষিদ্ধ করে স্থানীয় প্রশাসন। সপ্তাহান্তের সহিংসতায় শহরটি সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর একটি। স্থানীয় ব্যবসায়ী সংগঠনের হিসাবে শুধু মার্সেইয়েই ছয় শতাধিক দোকান লুট হয়েছে। প্যারিস, লিওঁ ও মার্সেইয়ের মেয়ররা যৌথভাবে অভিযোগ করেছেন, শনিবার সহিংসতার সময় তাদের শহরের অনেক এলাকা কার্যত নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়েছিল। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরঁ নুনেজও স্বীকার করেছেন, কয়েকটি বড় শহরে পুলিশ পরিস্থিতির ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছিল।
এদিকে পরিস্থিতি পুরোপুরি শান্ত হওয়ার লক্ষণ এখনো নেই। শিক্ষার্থীদের একটি অংশ গতকালও প্যারিসের ল্যুভর জাদুঘর ও সায়েন্সেস পোসহ বিভিন্ন স্থানে অবরোধ ও কর্মসূচি চালিয়েছে। ইয়েলো ভেস্ট আন্দোলনের সংগঠকরাও ২৪ অক্টোবর নতুন বিক্ষোভের ডাক দিয়েছেন। আর শ্রমিক ইউনিয়নগুলো ৫ নভেম্বর দেশজুড়ে নতুন ধর্মঘট ও সমাবেশের ঘোষণা দিয়েছে। ফলে তাৎক্ষণিক সহিংসতা নিয়ন্ত্রণ করা গেলেও ফরাসি সরকারের সামনে রাজনৈতিক ও সামাজিক চাপ দ্রুত কমছে না।
পরিস্থিতির রাজনৈতিক অভিঘাতও ক্রমে বড় হচ্ছে। আগামী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের মাত্র ছয় মাস আগে এ অস্থিরতা মাখোঁ সরকারের নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা ও রাজনৈতিক কর্তৃত্বকে নতুন করে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। সরকার সহিংসতার জন্য উগ্র বামপন্থী গোষ্ঠী ও লুটেরাদের দায়ী করছে। বিরোধীরা পাল্টা বলছে, মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় ও সরকারি সেবা নিয়ে গভীর অসন্তোষের রাজনৈতিক সমাধান ছাড়া শুধু নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা দিয়ে সংকট থামানো কঠিন।
শনিবারের বিক্ষোভে ফ্রান্সজুড়ে সাড়ে পাঁচ লাখের বেশি মানুষ অংশ নিয়েছে বলে দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাবে উঠে এসেছে। বিক্ষোভের মূল কারণ ছিল জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয়, জ্বালানির দাম এবং শিক্ষা ও অন্যান্য সরকারি সেবার মান নিয়ে অসন্তোষ। অধিকাংশ বিক্ষোভকারী শান্তিপূর্ণ থাকলেও বিভিন্ন শহরে একাংশ পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ায়। পরে লুটপাট, অগ্নিসংযোগ ও ভাংচুর ছড়িয়ে পড়ে। প্যারিস, লিওঁ, মার্সেইসহ বিভিন্ন শহরে রোববার রাতেও বিচ্ছিন্ন সহিংসতা চলে।
ফ্রান্সের ফেডারেশন অব ট্রেড অ্যান্ড রিটেইলের হিসাবে সপ্তাহান্তের সহিংসতায় প্রায় তিন হাজার দোকান ক্ষতিগ্রস্ত বা লুট হয়েছে। প্যারিসের অভিজাত প্লাস ভঁদোম এলাকায় বহু দোকান বন্ধ করে দেয়া হয়। বিশ্বখ্যাত ব্যান্ড ডিওরের একটি দোকানের প্রবেশপথ ভাঙা হয়েছে; রোলেক্স, লুইস ভিটন, গুচ্চির মতো বিলাসবহুল ব্র্যান্ড দোকানও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মার্সেইয়ে অলিম্পিক দে মার্সেই ফুটবল ক্লাবের অফিশিয়াল স্টোর লুট হয়। মধ্য ফ্রান্সের লিমোজ শহরের উনিশ শতকে নির্মিত সিটি হল আগুনে মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর ছাদ ধসে পড়েছে এবং ভবনের বড় অংশ ধ্বংস হয়েছে।
ক্ষয়ক্ষতির আর্থিক পরিমাণ এখনো চূড়ান্ত হয়নি। তবে ফ্রান্সের চেম্বারস অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির প্রধানের হিসাবে তা কয়েকশ কোটি ইউরো নয়, বরং কয়েকশ মিলিয়ন ইউরো পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের কর্মীদের জন্য আংশিক বেকারত্ব সহায়তা চালুর ঘোষণা দিয়েছে সরকার। লুট হওয়া পণ্য অনলাইন প্লাটফর্মে বিক্রির চেষ্টাও নজরে এসেছে। ফরাসি সরকার সংশ্লিষ্ট প্লাটফর্মগুলোকে এ ধরনের বিজ্ঞাপন সরিয়ে নিতে এবং বিক্রেতাদের শনাক্তে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে সহযোগিতা করতে বলেছে। সহিংসতার ঘটনায় প্রায় ২ হাজার ৪০০ মানুষকে গ্রেফতার করা হয়েছে। সরকারের হিসাবে গ্রেফতার ব্যক্তিদের প্রায় ৮০ শতাংশের বিরুদ্ধে ফৌজদারি অভিযোগ আনা হচ্ছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে প্রায় ৬০ হাজার পুলিশ ও নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন করা হয়েছিল। তা সত্ত্বেও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নুনেজ বলেছেন, বিপুল ও দ্রুত স্থান পরিবর্তনকারী সহিংস দলগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য এ সংখ্যাও যথেষ্ট ছিল নয়।
ব্যর্থতার দায় নিয়ে নুনেজ রোববার পদত্যাগের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তবে প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ তা প্রত্যাখ্যান করেছেন। বরং গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ ও সহিংসতার মাত্রা আগাম বুঝতে না পারার ব্যর্থতার বিষয়ে পূর্ণ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে এবং দ্রুত নতুন পুলিশি কৌশল নিতে তাকে নির্দেশ দিয়েছেন। সরকারি হিসাবে আগে প্রায় দুই লাখ মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেবে বলে ধারণা করা হয়েছিল; বাস্তবে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা এর দ্বিগুণেরও বেশি হওয়ায় নিরাপত্তা পরিকল্পনার ঘাটতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
অস্থিরতার মধ্যে বিদেশী নাগরিকদের জন্য সতর্কবার্তা বাড়ছে। ইতালি তার নাগরিকদের ফ্রান্সে অবস্থানের তথ্য সরকারি ওয়েবসাইট বা অ্যাপে নিবন্ধন করতে বলেছে এবং বড় জনসমাগম এড়িয়ে ‘সর্বোচ্চ সতর্কতা’ অবলম্বনের পরামর্শ দিয়েছে। জার্মানি বলেছে, আগামী কয়েক দিনে আরো বিক্ষোভ ও সহিংসতার আশঙ্কা উড়িয়ে দেয়া যাচ্ছে না। দেশটির নাগরিকদের বিক্ষোভ এড়িয়ে চলা এবং ফরাসি পুলিশের নির্দেশ মেনে চলতে বলা হয়েছে। জার্মান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ১৮ অক্টোবর হালনাগাদ করা নির্দেশনাতেও বিক্ষোভ থেকে দূরে থাকার পরামর্শ রয়েছে। চেক প্রজাতন্ত্রও তার নাগরিকদের বিক্ষোভ, মিছিল ও জনসমাগম এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছে। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও ফ্রান্সে থাকা ও ভ্রমণরত চীনা নাগরিকদের স্থানীয় পরিস্থিতির দিকে নজর রাখা, ব্যক্তিগত নিরাপত্তা জোরদার করা এবং বিক্ষোভ ও দাঙ্গাপ্রবণ এলাকা এড়িয়ে চলার নির্দেশ দিয়েছে।