ডেমোক্র্যাটদের জয়

আইন প্রণয়ন থেকে নিয়োগ, পদে পদে বাধার মুখে পড়বেন ট্রাম্প

দুই কক্ষেই বিরোধী দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকার অর্থ, ট্রাম্পকে এখন নিজের প্রায় প্রতিটি বড় আইনগত উদ্যোগ বাস্তবায়নে ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে সমঝোতা করতে হবে

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারানো প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য বড় রাজনৈতিক ধাক্কা। নির্বাচনে রিপাবলিকানদের পরাজিত করে প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে ডেমোক্র্যাটরা। এর মধ্য দিয়ে ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের বাকি দুই বছরের ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে যাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এতদিন হোয়াইট হাউসের পাশাপাশি কংগ্রেসের দুই কক্ষ নিয়ন্ত্রণ করায় নিজের রাজনৈতিক কর্মসূচি বাস্তবায়নে তুলনামূলক সুবিধা পেয়েছেন ট্রাম্প। কিন্তু আগামী জানুয়ারিতে নতুন কংগ্রেস দায়িত্ব নেয়ার পর সেই সুবিধা আর থাকবে না।

মার্কিন রাজনৈতিক ব্যবস্থায় প্রেসিডেন্টের হাতে নির্বাহী ক্ষমতা থাকলেও আইন প্রণয়ন, সরকারি ব্যয় অনুমোদন, গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগ এবং প্রশাসনের জবাবদিহি নিশ্চিত করার ক্ষমতা কংগ্রেসের। ফলে দুই কক্ষেই বিরোধী দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকার অর্থ, ট্রাম্পকে এখন নিজের প্রায় প্রতিটি বড় আইনগত উদ্যোগ বাস্তবায়নে ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে সমঝোতা করতে হবে। শুধু তা-ই নয়, তার প্রশাসনের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত, সরকারি অর্থের ব্যবহার, পররাষ্ট্রনীতি ও ব্যক্তিগত ব্যবসায়িক স্বার্থের বিষয়েও কংগ্রেসের তদন্তের মুখে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

আইন প্রণয়নে বড় বাধা

ট্রাম্পের সামনে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা তৈরি হবে আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে। যুক্তরাষ্ট্রে কোনো সাধারণ বিল আইনে পরিণত হতে হলে কংগ্রেসের প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট—উভয় কক্ষে পাস হতে হয়। এরপর প্রয়োজন হয় প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষর। ডেমোক্র্যাটরা দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ পাওয়ায় ট্রাম্পের পছন্দের আইনগুলো ভোটাভুটির পর্যায়ে পৌঁছানোর আগেই আটকে দিতে পারবেন।

বিশেষ করে অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ, করনীতি, সরকারি ব্যয় সংকোচন, জ্বালানিনীতি এবং প্রশাসনিক সংস্কারের মতো বিষয়ে ট্রাম্পের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে উঠতে পারে। একই সঙ্গে আগের মেয়াদে পাস হওয়া আইন পরিবর্তন কিংবা নতুন করে বড় ধরনের করছাড় দিতে চাইলে ডেমোক্র্যাটদের সমর্থন প্রয়োজন হবে।

অবশ্য কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারানোর অর্থ এই নয় যে ট্রাম্প কোনো সিদ্ধান্তই নিতে পারবেন না। বিদ্যমান আইনের আওতায় নির্বাহী আদেশ জারি, সরকারি সংস্থাগুলোকে নির্দেশনা দেয়া এবং পররাষ্ট্রনীতির অনেক সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা তার থাকবে। তবে নির্বাহী আদেশ দিয়ে নতুন আইন তৈরি করা যায় না এবং সেগুলো আদালতের পর্যালোচনার আওতাধীন।

বাজেট ও সরকারি অর্থায়নে সংকট

মার্কিন প্রেসিডেন্টের জন্য দ্বিতীয় বড় চ্যালেঞ্জ হবে ফেডারেল বাজেট। সরকারি সংস্থাগুলোর কার্যক্রম পরিচালনা, প্রতিরক্ষা খাতে বরাদ্দ, সীমান্ত নিরাপত্তা, অবকাঠামো ও বিভিন্ন সামাজিক কর্মসূচির অর্থায়নে কংগ্রেসের অনুমোদন প্রয়োজন।

ট্রাম্প প্রশাসন কোনো খাতে ব্যয় বাড়াতে কিংবা কমাতে চাইলে ডেমোক্র্যাটরা তার বিরোধিতা করতে পারবেন। বিশেষ করে সীমান্তে দেয়াল নির্মাণ, অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম সম্প্রসারণ কিংবা নির্দিষ্ট সরকারি কর্মসূচির অর্থায়ন নিয়ে বড় ধরনের দরকষাকষি হতে পারে।

নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ব্যয়সংক্রান্ত আইন পাস না হলে যুক্তরাষ্ট্রে আংশিক বা পূর্ণাঙ্গ সরকারি কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়, যা ‘গভর্নমেন্ট শাটডাউন’ নামে পরিচিত। ফলে আগামী দুই বছরে ট্রাম্পকে বাজেট নিয়ে একাধিক রাজনৈতিক সংঘাত মোকাবেলা করতে হতে পারে।

গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগেও ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণ

কংগ্রেসের উচ্চকক্ষ সিনেটের নিয়ন্ত্রণ হারানো ট্রাম্পের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্রে মন্ত্রিসভার গুরুত্বপূর্ণ সদস্য, রাষ্ট্রদূত, ফেডারেল বিচারক এবং সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি নিয়োগে সিনেটের অনুমোদন প্রয়োজন হয়।

রিপাবলিকানরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানোয় ট্রাম্পের মনোনীত বিতর্কিত প্রার্থীদের নিয়োগ আটকে দিতে পারবেন ডেমোক্র্যাটরা। কোনো মন্ত্রিসভার সদস্য পদত্যাগ করলে কিংবা গুরুত্বপূর্ণ বিচারিক পদ শূন্য হলে নতুন নিয়োগে দীর্ঘসূত্রতা দেখা দিতে পারে।

বিশেষ করে সুপ্রিম কোর্টে শূন্যপদ তৈরি হলে তা নিয়ে বড় রাজনৈতিক সংঘাতের আশঙ্কা থাকবে। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের বিচারব্যবস্থায় দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বিস্তারের অন্যতম উপায় হলো ফেডারেল বিচারক নিয়োগ। এ ক্ষেত্রে সিনেটের নিয়ন্ত্রণ ট্রাম্পের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার তৈরির ক্ষমতা সীমিত করতে পারে।

তদন্তের মুখে পড়তে পারে ট্রাম্প প্রশাসন

ডেমোক্র্যাটদের জন্য সবচেয়ে কার্যকর হাতিয়ার হতে পারে কংগ্রেসের তদন্তক্ষমতা। প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটের বিভিন্ন কমিটির নেতৃত্ব পাওয়ায় তারা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের শুনানিতে ডাকতে, নথি চাইতে এবং প্রয়োজনে সমন জারি করতে পারবেন।

রয়টার্স ও এপির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ডেমোক্র্যাটরা ইতোমধ্যে ট্রাম্প প্রশাসনের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড তদন্তের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এর মধ্যে রয়েছে সরকারি ক্ষমতার ব্যবহার, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, ট্রাম্প পরিবারের ব্যবসায়িক কার্যক্রম এবং জেফ্রি এপস্টেইন-সংক্রান্ত তদন্তের নথি ব্যবস্থাপনার বিষয়।

এ ধরনের তদন্তে ট্রাম্প বা তার ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ উঠতে পারে।

অভিশংসনের ঝুঁকি কতটা

কংগ্রেসের দুই কক্ষ ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণে যাওয়ায় ট্রাম্পের বিরুদ্ধে নতুন করে অভিশংসন প্রক্রিয়া শুরুর রাজনৈতিক সুযোগ তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী, প্রতিনিধি পরিষদ সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে অভিশংসনের অভিযোগ অনুমোদন করতে পারে। কিন্তু তাকে পদ থেকে অপসারণের জন্য সিনেটে উপস্থিত সদস্যদের অন্তত দুই-তৃতীয়াংশের সমর্থন প্রয়োজন। ফলে শুধু ডেমোক্র্যাটদের সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা দিয়ে ট্রাম্পকে ক্ষমতাচ্যুত করা সম্ভব নয়।

ইরান যুদ্ধ ও পররাষ্ট্রনীতিতে চাপ

ট্রাম্পের জন্য পররাষ্ট্রনীতিও বড় সংঘাতের ক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে ইরান যুদ্ধের ব্যয়, সামরিক অভিযান পরিচালনার যৌক্তিকতা এবং মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি অবস্থান নিয়ে কংগ্রেসে প্রশ্ন উঠতে পারে।

রয়টার্সের নির্বাচন-পরবর্তী বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ইরান যুদ্ধ নিয়ে অসন্তোষ এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির উদ্বেগ রিপাবলিকানদের পরাজয়ের গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিল। ফলে নতুন কংগ্রেসে যুদ্ধের ব্যয় ও সামরিক কর্মকাণ্ডের ওপর নজরদারি জোরদার হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

তবে প্রেসিডেন্টের সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক হিসেবে ক্ষমতা বহাল থাকবে। কংগ্রেস যুদ্ধের অর্থায়ন ও আইনগত অনুমোদনের মাধ্যমে চাপ তৈরি করতে পারলেও সব সামরিক সিদ্ধান্ত সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না।

একইভাবে চীনসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাণিজ্যনীতি, শুল্ক আরোপ ও আন্তর্জাতিক চুক্তির ক্ষেত্রে ট্রাম্পের ওপর চাপ বাড়তে পারে। যদিও বিদ্যমান আইনে অর্পিত ক্ষমতার ভিত্তিতে কিছু শুল্কসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত তিনি নিজেই নিতে পারবেন। বড় ধরনের বাণিজ্য আইন পরিবর্তনের ক্ষেত্রে প্রয়োজন হবে কংগ্রেসের সমর্থন।

ভেটো ক্ষমতা কি ট্রাম্পকে রক্ষা করবে

কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে গেলেও ট্রাম্পের হাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতা থাকবে—প্রেসিডেন্টের ভেটো। ডেমোক্র্যাটরা কোনো বিল পাস করলেও ট্রাম্প চাইলে সেটিতে স্বাক্ষর না করে ভেটো দিতে পারবেন। সেই ভেটো অকার্যকর করতে প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট উভয় কক্ষে ভোটদানকারী সদস্যদের দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থন প্রয়োজন হবে। ডেমোক্র্যাটদের সেই পরিমাণ আসন না থাকলে রিপাবলিকানদেরও সমর্থন নিতে হবে। অ

র্থাৎ ডেমোক্র্যাটরা ট্রাম্পের আইন প্রণয়ন কর্মসূচি আটকে দিতে পারলেও নিজেদের সব পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারবেন না। এতে ওয়াশিংটনে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক অচলাবস্থা তৈরির আশঙ্কা রয়েছে।

নির্বাহী ক্ষমতার ওপর নির্ভরতা বাড়াতে পারেন ট্রাম্প

কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারানোর পরিস্থিতি মাথায় রেখে ট্রাম্প প্রশাসন আগে থেকেই বিকল্প পরিকল্পনা তৈরি করেছে। গত ১ নভেম্বর রয়টার্স জানিয়েছিল, হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তারা অভিবাসন, শুল্কনীতি, আবাসন ও সরকারি ব্যয়ের মতো বিষয়ে কংগ্রেসের নতুন অনুমোদন ছাড়াই নির্বাহী ক্ষমতা ব্যবহারের সম্ভাবনা পরীক্ষা করছেন। এতে আগামী দুই বছরে নির্বাহী আদেশের ওপর ট্রাম্পের নির্ভরতা আরো বাড়তে পারে। তবে নির্বাহী ক্ষমতার সীমা নিয়ে আদালতে একের পর এক মামলা হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।

২০২৮ সালের নির্বাচনের রাজনীতিতেও প্রভাব

কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারানোর প্রভাব শুধু ট্রাম্পের প্রশাসনিক কার্যক্রমেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। রিপাবলিকান পার্টির ভেতরেও তার রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে। বিশেষ করে রিপাবলিকানদের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত টেক্সাস, কানসাস ও সাউথ ক্যারোলাইনায় ডেমোক্র্যাটদের অগ্রগতি দলটির জন্য উদ্বেগের বিষয়। এতে ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সামনে রেখে রিপাবলিকানদের নেতৃত্ব ও রাজনৈতিক কৌশল নিয়ে নতুন বিতর্ক শুরু হতে পারে।

অন্যদিকে কংগ্রেসের দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের জন্যও পরীক্ষা। ট্রাম্পের কার্যক্রমে বাধা দেয়ার পাশাপাশি ভোটারদের অর্থনৈতিক উদ্বেগ নিরসনে কার্যকর উদ্যোগ দেখাতে না পারলে তাদেরও রাজনৈতিক মূল্য দিতে হতে পারে।

সব মিলিয়ে মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফল ট্রাম্পের প্রেসিডেন্ট পদ কিংবা সাংবিধানিক নির্বাহী ক্ষমতা কেড়ে নেয়নি। তবে এককভাবে রাজনৈতিক কর্মসূচি এগিয়ে নেয়ার সুযোগ উল্লেখযোগ্যভাবে সংকুচিত করেছে। নতুন কংগ্রেস দায়িত্ব নেয়ার পর তাকে হয় ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে সমঝোতার পথে হাঁটতে হবে, নয়তো ভেটো, নির্বাহী আদেশ, আদালতের লড়াই ও কংগ্রেসের তদন্তের মধ্য দিয়ে মেয়াদের বাকি সময় পার করতে হবে।

আরও