ব্রাজিলে লুলার নাটকীয় প্রত্যাবর্তন, চতুর্থবারের মতো প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত

একসময় লুলার পুনর্নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ বলে মনে হচ্ছিল। বছরের পর বছর দুর্নীতির কেলেঙ্কারি ও দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির কারণে তার এবং তার দল ওয়ার্কার্স পার্টি (পিটি)-র প্রতি ভোটারদের সমর্থন কমছিল। অন্যদিকে, সমাজে দ্রুত পরিবর্তনের ফলে সাবেক ধাতুশ্রমিক ও শ্রমিক ইউনিয়নের নেতা লুলাকে ক্রমেই অ্যাপভিত্তিক অর্থনীতির সঙ্গে খাপ খাওয়াতে হিমশিম খাওয়া একজন নেতা বলে মনে হচ্ছিল। এ অর্থনীতিতে অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত মানুষের সংখ্যাও বাড়ছে

চতুর্থবারের মতো ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন দেশটির লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা। গতকাল দেশটির নির্বাচনী আদালত এ ফল ঘোষণা করে। বিভিন্ন জরিপ, নির্বাচনী নজির ও বিশ্বজুড়ে ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে বাড়তে থাকা জনমতের প্রবণতাকে অগ্রাহ্য করে লুলার এ প্রত্যাবর্তন লাতিন আমেরিকায় ডানপন্থীদের একের পর এক নির্বাচনী বিজয়ের ধারায় বড় ধাক্কা দিয়েছে। খবর রয়টার্স।

বিশ্বে বামপন্থী রাজনীতির অন্যতম আইকন লুলা। চলতি শতকে ব্রাজিলের রাজনীতির সবচেয়ে প্রভাবশালী এ নেতা সাবেক প্রেসিডেন্ট জাইর বলসোনারোর বড় ছেলে ও সিনেটর ফ্লাভিও বলসোনারোকে পরাজিত করেছেন।

নির্বাচনের প্রথম দফায় এগিয়ে থাকলেও চূড়ান্ত দফায় ৪০ লাখের বেশি ভোটের ব্যবধানে হেরে যান ফ্লাভিও। তবে দ্বিতীয় দফা নির্বাচনে সুপ্রিম কোর্টের এক আদেশে ভোট গ্রহণের সময় দুই ঘণ্টা বাড়ানোর সিদ্ধান্তের কারণে ফল বাতিলের আবেদন করবেন বলে জানিয়েছেন তিনি।

নির্বাচনে পরাজয় স্বীকার করতে ফ্লাভিওর অস্বীকৃতির মধ্য দিয়ে ২০২২ সালে লুলার কাছে হেরে যাওয়ার পর তার বাবার প্রতিক্রিয়ারই প্রতিধ্বনি শোনা যাচ্ছে। সাবেক প্রেসিডেন্ট জাইর বলসোনারো কখনোই নিজের পরাজয় মেনে নেননি। ক্ষমতায় টিকে থাকতে অভ্যুত্থানের ষড়যন্ত্রের দায়ে পরে তাকে ২৭ বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়।

বিশ্লেষকদের মতে, লুলার কাছে ফ্লাভিওর পরাজয়ের ব্যবধান তার বাবার পরাজয়ের ব্যবধানের দ্বিগুণেরও বেশি। তা ছাড়া দক্ষিণাঞ্চলে বৃষ্টির কারণে ভোট গ্রহণের সময় বাড়ানোর আবেদন ফ্লাভিওর দলও করেছিল। ফলে নির্বাচনী ফল বাতিল হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম।

ঝুঁকি বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান রেনের লাতিন আমেরিকা-বিষয়ক বিশ্লেষক মারিও ব্রাগা বলেন, আগামী কয়েক দিনে ডানপন্থীদের বিক্ষোভ হতে পারে। তবে এর মাধ্যমে নির্বাচনী ফল পাল্টে যাওয়ার সম্ভাবনা ‘খুবই কম’।

৮০ বছর বয়সী লুলা ২০১৮ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত দুর্নীতির অভিযোগে কারাগারে ছিলেন। পরে তার বিরুদ্ধে দেয়া দণ্ডাদেশ বাতিল করা হয়। এর মধ্য দিয়ে ২০২২ সালের নির্বাচনে জাইর বলসোনারোকে পরাজিত করে ক্ষমতায় ফেরার পথ তৈরি হয়।

ভোট গণনার সময় সাও পাওলোতে লুলার সঙ্গে ছিলেন বামপন্থী আইনপ্রণেতা এরিকা হিলটন। তিনি বলেন, ‘লুলা একজন রাষ্ট্রনায়ক, একজন মহীরুহ।’

একসময় লুলার পুনর্নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ বলে মনে হচ্ছিল। বছরের পর বছর দুর্নীতির কেলেঙ্কারি ও দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির কারণে তার এবং তার দল ওয়ার্কার্স পার্টি (পিটি)-র প্রতি ভোটারদের সমর্থন কমছিল। অন্যদিকে, সমাজে দ্রুত পরিবর্তনের ফলে সাবেক ধাতুশ্রমিক ও শ্রমিক ইউনিয়নের নেতা লুলাকে ক্রমেই অ্যাপভিত্তিক অর্থনীতির সঙ্গে খাপ খাওয়াতে হিমশিম খাওয়া একজন নেতা বলে মনে হচ্ছিল। এ অর্থনীতিতে অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত মানুষের সংখ্যাও বাড়ছে।

জনমত জরিপ পরিচালনাকারীরা বলেছেন, প্রত্যাশার চেয়ে বেশি ভোটার উপস্থিতি লুলার জয়ের পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে। পরামর্শক প্রতিষ্ঠান থিংক পলিসির সহপ্রতিষ্ঠাতা লিওনার্দো বারেতো বলেন, ভোটাররা বলসোনারোর নতুনত্বের চেয়ে লুলার পরিচিত রাজনৈতিক পথকেই বেছে নিয়েছেন।

নির্বাচনী প্রচারে লুলা তার সরকারের সময়ে দারিদ্র্য ও বৈষম্য কমে আসার সাফল্য তুলে ধরেন। তার তৃতীয় মেয়াদে বেকারত্ব, নিরক্ষরতা ও বন উজাড়ের হার রেকর্ড সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসে।

লুলার অভিযোগ ছিল, ফ্লাভিও বলসোনারো ক্ষমতায় এলে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে ব্যয় কমাবেন, সামাজিক অগ্রগতির ধারাকে পেছনে নিয়ে যাবেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হাতে ব্রাজিলের সার্বভৌমত্ব তুলে দেবেন। ট্রাম্পের পররাষ্ট্র দপ্তর বলসোনারো পরিবারকে আবার ক্ষমতায় ফেরানোর লক্ষ্যে প্রচার চালিয়েছিল।

লুলার বিজয়ের ফলে লাতিন আমেরিকায় যুক্তরাষ্ট্রের অনুগত ডানপন্থী সরকারগুলোর ক্রমবর্ধমান জোটে নতুন একটি গুরুত্বপূর্ণ সদস্য যুক্ত করার সুযোগ হারালেন ট্রাম্প। এসব সরকার নিরাপত্তা ও অভিবাসন বিষয়ে ওয়াশিংটনের নীতিকে সমর্থন করে আসছে।

লুলার সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী সেলসো আমোরিম বলেন, লাতিন আমেরিকায় ভারসাম্য প্রতিষ্ঠায় বামপন্থী এ নেতার ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ হবে। তার ভাষায়, ‘লুলা নিজেই সেই ভারসাম্য।’

১৯৮০-এর দশকে ব্রাজিলে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার পর প্রথমবারের মতো এমন একজন প্রার্থী নির্বাচিত হলেন, যিনি প্রথম দফার ভোটে দ্বিতীয় স্থানে ছিলেন।

২০০৩ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত দুই মেয়াদে প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করেছিলেন লুলা। এবারও জাতীয় রাজনীতিতে তার পাঁচ দশকের অভিজ্ঞতায় গড়ে ওঠা বাস্তববাদী ও জনতুষ্টিবাদী কৌশলের সমন্বয়ে প্রচার চালান তিনি। শ্রমজীবী মানুষ ও দরিদ্র ব্রাজিলীয়দের জীবনমান উন্নয়নে একের পর এক সংস্কার প্রস্তাব সামনে আনেন।

নির্বাচনী প্রচারের শেষ পর্যায়ে এসব প্রতিশ্রুতির গতি বাড়ে। এর মধ্যে ছিল সারা দেশে সপ্তাহান্তে বিনা মূল্যে গণপরিবহন ব্যবহারের সুযোগ, যা বাস্তবায়নের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে কংগ্রেসে প্রস্তাব উত্থাপন করতে হবে। এছাড়া লুলার সরকারের বহুল পরিচিত সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির ভাতা ১৫ শতাংশ বাড়ানোর প্রতিশ্রুতিও ছিল। এ কর্মসূচির আওতায় ভাতা বাড়ানোর কাজ এরই মধ্যে শুরু হয়েছে।

ব্রাজিলের কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় শ্রম সংস্কার হিসেবেও বিবেচিত একটি সাংবিধানিক সংশোধনীর পক্ষে অবস্থান নেন লুলা। কংগ্রেসে ব্যাপক সমর্থন নিয়ে সংশোধনীটি পাস হয়।

তবে লুলার চতুর্থ মেয়াদই তার জন্য সবচেয়ে কঠিন হতে পারে। কারণ গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার পর এবারই সবচেয়ে বেশি রক্ষণশীল ও ডানপন্থী সদস্য পেয়েছে ব্রাজিলের সংসদ।

বলসোনারোর লিবারেল পার্টি (পিএল) এবং তাদের মিত্র দলগুলো মিলে নিম্নকক্ষে ২৮০টির বেশি আসন এবং সিনেটে সর্বোচ্চ ৫০টি আসন নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। এতে কংগ্রেসের উভয় কক্ষেই বিরোধীদের শক্তিশালী সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোয় ব্রাজিলে প্রেসিডেন্টদের কাছ থেকে কংগ্রেসের হাতে বাজেট, গুরুত্বপূর্ণ আইন প্রণয়ন এবং গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগের ক্ষমতা চলে যাওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। লুলার এ মেয়াদে তা আরো বাড়তে পারে।

অর্থনৈতিক দিক থেকেও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারেন লুলা। তার সরকারের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী বছর ব্রাজিলের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হবে মাত্র ২ দশমিক ৩ শতাংশ। উচ্চ সুদহার এবং জিডিপি ৮২ শতাংশ ছাড়িয়ে যাওয়া সরকারি ঋণও আর্থিক চাপ বাড়াচ্ছে। মহামারীর পর থেকে সরকারি ঋণের অনুপাত এখন সর্বোচ্চ পর্যায়ে।

গোল্ডম্যান স্যাকসের পূর্বাভাস, চতুর্থ মেয়াদে সরকারি ব্যয় নিয়ন্ত্রণে লুলা খুব বেশি অগ্রগতি অর্জন করতে পারবেন না। কারণ তিনি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে রাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন মডেলের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকবেন।

পরিবারিক ঋণ দ্রুত বেড়ে যাওয়াও অর্থনীতিবিদদের উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। এ সমস্যা মোকাবেলায় নির্বাচনী প্রচারের সময় অনলাইন বেটিং বা বাজি ধরার ওপর সাময়িক নিষেধাজ্ঞা জারি করেন লুলা। পাশাপাশি ঋণগ্রস্তদের স্বস্তি দিতে নতুন একটি ঋণ পুনর্বিন্যাস কর্মসূচিও ঘোষণা করেন তিনি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন ডানপন্থী কংগ্রেস ব্যবসাবান্ধব কাঠামোগত সংস্কার পাসের চেষ্টা করবে। এর ফলে সরকারি ব্যয় কমানোর উদ্যোগ আসতে পারে, যা জনমনে অসন্তোষ সৃষ্টি করতে পারে।

আরও