হংকংয়ের শেয়ারবাজারে তালিকাচ্যুত চীনা রিয়েল এস্টেট জায়ান্ট এভারগ্র্যান্ড

এভারগ্র্যান্ড বিশ্বের সবচেয়ে সম্পদশালী রিয়েল এস্টেট কোম্পানি হিসেবে স্বীকৃতি পায় ২০১৮ সালে। কিন্তু এর তিন বছরের মাথায়ই ব্যাপক সংকটে পড়ে যায় কোম্পানিটি। একই সঙ্গে চীনের প্রপার্টি বাজারেও দেখা দেয় মারাত্মক অস্থিতিশীলতা। এক পর্যায়ে ২০২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে নিজেকে দেউলিয়া ঘোষণার আবেদন জানায় এভারগ্র্যান্ড। এর পর ২০২৪ সালে হংকংয়ের আদালতে কোম্পানিটির লিকুইডেশনের (বিদ্যমান সম্পদ বিক্রি করে ঋণদাতাদের ঋণ পরিশোধ ও অবশিষ্ট অর্থ শেয়ারহোল্ডারদের মধ্যে বণ্টনের মাধ্যমে কোম্পানির অবসায়ন ঘটানো) আদেশ দেয়া হয়।

হংকংয়ের শেয়ারবাজারে তালিকাচ্যুত (ডিলিস্টেড) হলো চীনা রিয়েল এস্টেট জায়ান্ট এভারগ্র্যান্ড। দেড় দশকের বেশি সময় ধরে লেনদেনের পর রোববার (২৪ আগস্ট) হংকংয়ের পুঁজিবাজার থেকে আনুষ্ঠানিক প্রস্থান ঘটল কোম্পানিটির। এক সময় ৫০ বিলিয়ন (৫ হাজার কোটি) ডলার বাজারমূল্য অতিক্রম করে যাওয়া চীনের প্রপার্টি খাতের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় কোম্পানিটি সাম্প্রতিক সময় ঋণভারে জর্জরিত হয়ে পড়েছিল।

কয়েক বছর আগে কোম্পানিটির বিপর্যয় বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ চীনের আর্থিক খাতকেও ব্যাপক বিপত্তির মুখে ঠেলে দিয়েছিল। কোম্পানিটির সাম্প্রতিক ব্যবসায়িক ও আর্থিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণের ভিত্তিতে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এভারগ্র্যান্ডের তালিকাচ্যুতি অনিবার্য হয়ে উঠেছিল।

বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান ইউরেশিয়া গ্রুপের চীন বিষয়ক পরিচালক ড্যান ওয়াংয়ের ভাষ্যমতে, ‘এভাবে একবার তালিকাচ্যুত হলে আর ফিরে আসা সম্ভব হয় না’।

এভারগ্র্যান্ড বিশ্বের সবচেয়ে সম্পদশালী রিয়েল এস্টেট কোম্পানি হিসেবে স্বীকৃতি পায় ২০১৮ সালে। কিন্তু এর তিন বছরের মাথায়ই ব্যাপক সংকটে পড়ে যায় কোম্পানিটি। একই সঙ্গে চীনের প্রপার্টি বাজারেও দেখা দেয় মারাত্মক অস্থিতিশীলতা। এক পর্যায়ে ২০২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে নিজেকে দেউলিয়া ঘোষণার আবেদন জানায় এভারগ্র্যান্ড। এর পর ২০২৪ সালে হংকংয়ের আদালতে কোম্পানিটির লিকুইডেশনের (বিদ্যমান সম্পদ বিক্রি করে ঋণদাতাদের ঋণ পরিশোধ ও অবশিষ্ট অর্থ শেয়ারহোল্ডারদের মধ্যে বণ্টনের মাধ্যমে কোম্পানির অবসায়ন ঘটানো) আদেশ দেয়া হয়।

অথচ কয়েক বছর আগেও এভারগ্র্যান্ডকে দেখা হচ্ছিল চীনের অর্থনৈতিক মিরাকলের উজ্জ্বল উদাহরণ হিসেবে। এভারগ্র্যান্ডের প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান হুই কা ইয়ান উঠে এসেছিলেন চীনের গ্রামীণ এলাকা থেকে। কোম্পানিটির সাফল্য তাকে ২০১৭ সালে ফোর্বসের এশিয়ার শীর্ষ ধনীর তালিকার একেবারে চূড়ায় নিয়ে আসে। সে সময় তার সম্পদ মূল্যায়ন হয়েছিল প্রায় ৪৫ বিলিয়ন (সাড়ে ৪ হাজার কোটি) ডলার। সেখান থেকে কমে এখন তা নেমে এসেছে এক বিলিয়ন (১০০ কোটি) ডলারেরও নিচে।

২০২৪ সালের মার্চে সাড়ে ৬ মিলিয়ন (৬৫ লাখ) ডলার জরিমানার মুখে পড়েছিলেন তিনি। কোম্পানির আয় প্রকৃতের চেয়ে ৭৮ বিলিয়ন (৭ হাজার ৮০০ কোটি) ডলার বেশি দেখানোর কারণে চীনের পুঁজিবাজার থেকে আজীবনের জন্য নিষিদ্ধও হয়েছেন তিনি। বর্তমানে তার ব্যক্তিগত সম্পত্তি থেকে ঋণদাতাদের অর্থ পরিশোধ করা সম্ভব কিনা, তা খতিয়ে দেখছেন লিকুইডেটররা।

এভারগ্র্যান্ডের রিয়েল এস্টেট সাম্রাজ্যে যখন ধস শুরু হয়, তখনো বিশ্বের ২৮০টি শহরে কোম্পানিটির অধীনে প্রকল্প চলমান ছিল ১ হাজার ৩০০টি। মালিকানায় ছিল একটি বৈদ্যুতিক গাড়ি (ইভি) নির্মাতা প্রতিষ্ঠান। চীনের ইতিহাসে সবচেয়ে সফল ফুটবল ক্লাব গুয়াংজু এফসির বর্তমান দুর্ভাগ্যের সঙ্গেও জড়িয়ে আছে এভারগ্র্যান্ডের নাম। ঋণ পরিশোধ করতে না পারায় রিয়েল এস্টেট কোম্পানিটির মালিকানাধীন গুয়াংজু এফসিকে চলতি বছরের জানুয়ারিতেই চীনের পেশাদার ফুটবল প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ থেকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এর পর ক্লাবটিও বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।

বর্তমানে এভারগ্র্যান্ডের মোট দায় (লায়াবিলিটি) নিরূপিত হয়েছে ৩০০ বিলিয়ন (৩০ হাজার কোটি) ডলার। এটিই এখন বিশ্বের সবচেয়ে বেশি দায়গ্রস্ত রিয়েল এস্টেট কোম্পানি। বেইজিং ২০২০ সালে বড় ডেভেলপারদের ঋণদান সীমিত করে দেয়ার পর থেকে বিপত্তিতে পড়ে যায় কোম্পানিটি। এ সময় টিকে থাকতে হাউজিং প্রকল্পগুলোয় বড় মাত্রায় ছাড় দিতে হয় কোম্পানিটিকে। কিছুদিনের মধ্যেই বিদেশি ঋণের কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থ হয় এভারগ্র্যান্ড।

২০২৪ সালের জানুয়ারিতে হংকং হাইকোর্ট কোম্পানিটির অবসায়নের আদেশ দিলে এর শেয়ারমূল্যে ৯৯ শতাংশ পতন দেখা যায়। সে সময় ঋণদায় কমানোয় কার্যকর কোনো পরিকল্পনা তুলে ধরতে ব্যর্থ হওয়ায় এ আদেশ দিয়েছিলেন আদালত। ওই আদেশের পর থেকে হংকংয়ে কোম্পানিটির শেয়ার লেনদেন স্থগিত ছিল।

চলতি মাসেই লিকুইডেটররা জানিয়েছিলেন, তাদের কাছে এভারগ্র্যান্ডের পাওনাদারদের ঋণ দাবি জমা পড়েছে ৪৫ বিলিয়ন (সাড়ে ৪ হাজার কোটি) ডলারের। বিপরীতে এখন পর্যন্ত কোম্পানিটির সম্পদ বিক্রি করা গেছে মাত্র ২৫৫ মিলিয়ন (সাড়ে ২৫ কোটি) ডলারের। এভাবে এভারগ্র্যান্ডের ব্যবসার পুনর্গঠন অসম্ভব বলে মনে করছেন লিকুইডেটররা।

আগামী মাসেই কোম্পানিটির অবসায়ন সংক্রান্ত পরবর্তী শুনানি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।

এভারগ্র্যান্ডের পতনের ‘ডোমিনো ইফেক্টে’ চীনের প্রপার্টি খাতে ধস দেশটির অর্থনীতিতে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক সংকটের কারণ হয়ে উঠেছে বলে মনে করা হচ্ছে। চীনের অর্থনীতির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ জুড়ে রয়েছে দেশটির প্রপার্টি খাত। একই সঙ্গে এটি সেখানকার স্থানীয় সরকারের আয়ের বড় উৎস হিসেবেও বিবেচিত।

ইউরেশিয়া গ্রুপের চীন বিষয়ক পরিচালক ড্যান ওয়াং বলেন, ‘প্রপার্টি খাতের ধসই এখানকার অর্থনীতিকে সবচেয়ে বেশি চাপে ফেলেছে। আর এটিই ভোগব্যয় কমে যাওয়ার মূল কারণ।’

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোয় চীনের প্রপার্টি খাতের ঋণগ্রস্ত কোম্পানিগুলোয় বড় আকারে ছাঁটাই হয়েছে। যারা চাকরিতে টিকে আছেন, তাদেরও বেতন কমেছে অনেকে। খানা পর্যায়েও সঞ্চয়ের ওপর চাপ পড়েছে।

ফরাসি ব্যাংক ন্যাটিক্সিসের এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের প্রধান অর্থনীতিবিদ অ্যালিসিয়া গার্সিয়া-হেরেরোর ভাষ্যমতে, চীনে বাড়ির দাম কমেছে অন্তত ৩০ শতাংশ। এতে অনেক পরিবারের সঞ্চয়ের মূল্যমান কমে গেছে। ফলে ভোক্তাব্যয় ও বিনিয়োগ দুটোই কমেছে, যা শ্লথ করে দিয়েছে চীনের অর্থনীতিকে।

চীনের আবাসন খাতে মূল্যধসের এ ধারা আগামী ২০২৭ সাল পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে বলে সতর্ক করেছে গোল্ডম্যান স্যাকস।

আরও