লন্ডনের বাইরে মনোরম ম্যানর হাউসে জাপানি আইনপ্রণেতা রুই মাৎসুকাওয়ার মনে আমেরিকার প্রতিরক্ষা প্রতিশ্রুতি নিয়ে গুরুতর সন্দেহ দানা বাঁধতে শুরু করে। প্রাক্তন উপ-প্রতিরক্ষা মন্ত্রী মাৎসুকাওয়া গত মার্চে ঐতিহাসিক ফোর্ডহ্যাম অ্যাবেতে একটি উচ্চ পর্যায়ের দ্বিপক্ষীয় সম্মেলনে অংশ নেন। সেখানে ব্রিটিশ আইনপ্রণেতা, কূটনীতিক এবং ব্যবসায়িক নেতাদের কাছ থেকে তিনি জানতে পারেন, তাদের চিন্তাভাবনায় এক বিশাল পরিবর্তন এসেছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার ইউরোপীয় মিত্রদের প্রকাশ্যে তিরস্কার করছেন এবং রাশিয়ার দিকে ঝুঁকে পড়ছেন। মাৎসুকাওয়া বলেন, ইউরোপ জেগে উঠেছে এই উপলব্ধি নিয়ে যে, তারা আর আমেরিকার ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল থাকতে পারে না। বরং নিজেদের নিরাপত্তার জন্য তাদের আরো বেশি দায়িত্ব নিতে হবে। তিনি বুঝতে পারেন, বিষয়টি জাপানের ক্ষেত্রেও সত্যি। জাপান বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে অবস্থিত মার্কিন সামরিক বাহিনীর সবচেয়ে বড় ঘাঁটির একটি। মাৎসুকাওয়া বলেন, ‘আপনি সত্যিই আর এখন মার্কিন উপস্থিতিকে নিশ্চিত ধরে নিতে পারেন না।‘
মাৎসুকাওয়া হলেন সেই সব জাপানি আইনপ্রণেতাদের একজন, যারা পারমাণবিক অস্ত্রের আক্রমণের শিকার হওয়া একমাত্র জাতি হিসেবে এক 'অচিন্তনীয়' বিষয় নিয়ে ভাবতে শুরু করেছেন। তাদের চারপাশে পারমাণবিক ক্ষমতাধর প্রতিবেশী চীন, উত্তর কোরিয়া এবং রাশিয়া। তাই, জাপানকেও হয়তো নিজেদের পারমাণবিক অস্ত্রাগার গড়ে তুলতে হতে পারে।
টোকিওতে নিজের অফিসে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে মাৎসুকাওয়া বলেন, ‘ট্রাম্প খুবই অপ্রত্যাশিত, হয়তো সেটাই তার শক্তি। কিন্তু আমি মনে করি আমাদের সবসময় একটি প্ল্যান বি নিয়ে ভাবতে হবে।‘ তিনি আরো বলেন, ‘প্ল্যান বি-এর মানে হয়তো স্বাধীন হওয়া, এবং তারপর পারমাণবিক অস্ত্রের দিকে যাওয়া।‘ এর মাধ্যমে তিনি আমেরিকান নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতির ওপর জাপানের নির্ভরতা কমানোর সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেন।
বারবার ট্রাম্পের নীতি পরিবর্তন জাপানের প্রতিবেশী দক্ষিণ কোরিয়াতেও অনুভূত হচ্ছে। দেশটিও জাপানের মতো মার্কিন পারমাণবিক ‘আমব্রেলার’ নিচে সুরক্ষিত। জরিপ অনুযায়ী, দক্ষিণ কোরিয়ার প্রায় ৭৫% মানুষ চায় দেশটি নিজস্ব পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করুক। দক্ষিণ কোরিয়ার নতুন প্রেসিডেন্ট লি জে মিয়ং প্রকাশ্যে এই প্রসঙ্গকে চাপা দিলেও তার দলে অনেকে পরমাণু সক্ষমতার সম্ভাবনা তৈরির দাবি তুলছেন।
ঐতিহাসিক প্রতিজ্ঞা থেকে সরে আসার ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে জাপানে। হিরোশিমা-নাগাসাকির ধ্বংসযজ্ঞের পর জাপান ১৯৬৭ সালে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল—নিজেরা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি, অধিকার বা মজুদ করবে না। কিন্তু চীন, উত্তর কোরিয়া ও রাশিয়ার মতো পরমাণু শক্তিধর প্রতিবেশীদের মাঝে অবস্থান করে ক্রমে এই প্রতিশ্রুতির বাস্তবতা প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। এক জরিপে দেখা গেছে, এখন ৪১ শতাংশ জাপানি এই নীতির পরিবর্তনের পক্ষে। তিন বছর আগে একই সমর্থন ছিল মাত্র ২০ শতাংশ।
হিরোশিমার তরুণ বাসিন্দা তাতসুয়াকি তাকাহাশি বলেন, ‘আগে ভাবতাম কূটনীতি আর আলোচনাই সমাধান। কিন্তু এখন মনে হয় প্রতিরোধ দেখাতে পারমাণবিক সক্ষমতা দরকার। ব্যক্তিগতভাবে আমি চাই না অস্ত্র ব্যবহার হোক, তবে এ অস্ত্র শুধু রাখলেই একটি কৌশলগত মূল্য তৈরি হয়।‘
ট্রাম্প প্রশাসনের একজন সিনিয়র কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেছেন যে, জাপান এবং দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতি মার্কিন নীতিতে কোনো পরিবর্তন আসেনি। অন্যদিকে, চীনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বলেছে যে, তারা তথাকথিত চীনা পারমাণবিক হুমকি প্রচারের যেকোনো প্রচেষ্টার বিরোধিতা করে।
তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, জাপান একটি 'থ্রেসহোল্ড পারমাণবিক-অস্ত্রধারী রাষ্ট্র' অর্থাৎ তাদের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা আছে এবং প্রয়োজনে পারমাণবিক বোমা তৈরি করার জন্য প্রয়োজনীয় উপাদানও তারা সংগ্রহ করতে পারে। জাপানের একজন সিনিয়র আইনপ্রণেতা রয়টার্সকে বলেছেন, জাপান ছয় মাসের মধ্যে একটি পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে সক্ষম এবং মার্কিন পারমাণবিক আশ্রয়ের ওপর বিশ্বাস ভেঙে গেলে তাদের এটি বিবেচনা করা উচিত।
১৯৪৫ সালের পারমাণবিক হামলার ৮০তম বার্ষিকীর প্রাক্কালে দাঁড়িয়ে হিরোশিমার কিছু মানুষ অতীত নিয়ে আর ভাবতে চান না। এনএইচকের একটি জরিপে দেখা গেছে, ১৮ থেকে ২৪ বছর বয়সী ৩০% এরও বেশি মানুষ পারমাণবিক বোমা থেকে বেঁচে যাওয়া মানুষের অভিজ্ঞতা শুনতে আগ্রহী নন। এর প্রধান কারণ হিসেবে তারা উল্লেখ করেছেন যে, সেই সব ঘটনা খুবই ভয়ঙ্কর।
১৯৪৫ সালের পারমাণবিক বোমায় বেঁচে যাওয়া ৮০ বছর বয়সী কুনিহিকো সাকুমা হতাশা প্রকাশ করে বলেন, ‘কেবলমাত্র আমরা মার্কিন পারমাণবিক আশ্রয়ের নিচে আছি বলে আমরা নিরাপদ, এমনটা নয়। যদি পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করা হয়, তবে সব শেষ হয়ে যাবে। প্রকৃত নিরাপত্তা তখনই আসে যখন দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বাস থাকে।‘