যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের চলমান সংঘাত শুরু হওয়ার প্রায় দুই সপ্তাহ পর উপসাগরীয় দেশগুলোয় দৈনন্দিন জীবনের এক যুদ্ধ-প্রভাবিত নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। কাতারের রাজধানী দোহায় ইফতারের পরের একটি স্পিন ক্লাসে প্রশিক্ষকের ‘পজিটিভ এনার্জি’র আহ্বান এখন অনেক বেশি তাৎপর্যপূর্ণ মনে হচ্ছে। ক্লাস শেষে জিম থেকে বের হওয়ার সময় হঠাৎ মোবাইলে মিসাইল সতর্কতা বেজে ওঠে এবং অনেকে নিরাপত্তার জন্য পার্কিং গ্যারেজে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন।
সংযুক্ত আরব আমিরাতেও পরিস্থিতি একই রকম পরিবর্তিত হয়েছে। দুবাইয়ের সমুদ্রসৈকতে ঘুরতে আসা মানুষ আকাশে দেখতে পাচ্ছেন ড্রোন তাড়া করা যুদ্ধবিমান। এমনকি রমজানের ঐতিহ্যবাহী কামান নিক্ষেপও বাতিল করা হয়েছে, যাতে অতিরিক্ত বিস্ফোরণের শব্দে আতঙ্ক না বাড়ে। বিভিন্ন অফিসে কর্মরত অনেক মানুষ নিরাপত্তা আশঙ্কায় কাজ ছেড়ে বাড়ি ফিরে গেছেন, বিশেষ করে যখন ইরান যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে লক্ষ্যবস্তু করার হুমকি দেয়।
যুদ্ধের ধাক্কা সরাসরি অনুভব করলেও উপসাগরীয় দেশগুলোয় জনরোষ মূলত ইরানের দিকে, যুক্তরাষ্ট্রের দিকে নয়। যদিও এই সংঘাতের সূচনায় ওয়াশিংটনেরই ভূমিকা ছিল। তবুও অধিকাংশ উপসাগরীয় নেতা প্রকাশ্যে যুক্তরাষ্ট্রকে দোষারোপ করা থেকে বিরত থাকছেন।
বরং অনেক ক্ষেত্রে ‘বিশ্বাসঘাতকতা’ শব্দটি ব্যবহার করা হচ্ছে তেহরানের বিরুদ্ধে। উপসাগরীয় নেতাদের মতে, তারা আগে থেকেই ইরানকে আশ্বস্ত করেছিলেন যে তাদের ভূখণ্ড ইরানের বিরুদ্ধে হামলার জন্য ব্যবহার করা হবে না। তারপরও যুদ্ধের প্রথম দিনেই ইরান উপসাগরীয় অঞ্চল লক্ষ্য করে হামলা চালায়।
আঞ্চলিক নিরাপত্তার খাতিরে উপসাগরীয় দেশগুলো দীর্ঘদিন ধরে ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা চালিয়ে আসছিল। তারা ওয়াশিংটনকে বারবার সতর্ক করেছিল যেন ইরানে কোনো হামলা চালানো না হয়, কারণ এর ফলে পুরো অঞ্চল অস্থিতিশীল হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু যুদ্ধ শুরু হওয়ার প্রথম দিন থেকেই ইরান প্রতিবেশী দেশগুলোর ভূখণ্ডে আঘাত হেনেছে, যা উপসাগরীয় আরব দেশগুলোকে ক্ষুব্ধ করে তুলেছে।
কাতারের প্রধানমন্ত্রী এই পরিস্থিতিকে 'বিশ্বাসঘাতকতা' হিসেবে অভিহিত করেছেন। তার মতে, উপসাগরীয় দেশগুলো নিরপেক্ষ থাকার গ্যারান্টি দেয়া সত্ত্বেও ইরান পূর্বপরিকল্পিতভাবে এই অস্থিরতা ছড়িয়ে দিয়েছে, যা দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে ধূলিসাৎ করে দিয়েছে।
এই সংকটময় মুহূর্তেও উপসাগরীয় দেশগুলো ওয়াশিংটনের সঙ্গে তাদের প্রতিরক্ষা সম্পর্ক ছিন্ন করার কথা ভাবছে না। বরং তারা মনে করছে, বর্তমান পরিস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতা আরো জোরদার করার প্রয়োজনীয়তা বুঝিয়ে দিচ্ছে।
তবে একটি বড় পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে—এই দেশগুলো এখন নিরাপত্তার জন্য এককভাবে শুধু আমেরিকার ওপর নির্ভর না করে তাদের অংশীদারত্বের পরিধি বাড়াচ্ছে। ফ্রান্স ও ব্রিটেনের মতো ইউরোপীয় দেশগুলো বর্তমানে এই অঞ্চলের আকাশসীমা সুরক্ষায় সক্রিয় ভূমিকা রাখছে। কর্মকর্তারা বলছেন, তারা ওয়াশিংটন থেকে সরে আসছেন না, বরং ভবিষ্যৎ ঝুঁকি মোকাবেলায় চীন, ইউরোপ, তুরস্ক বা ভারতের মতো দেশগুলোর সঙ্গেও প্রতিরক্ষা সম্পর্ক বৈচিত্র্যময় করার চেষ্টা করছেন।
রয়টার্স অবলম্বনে