ইসরায়েলের অব্যাহত সামরিক হামলার মধ্যে গাজা ভূখণ্ডে চলছে সবচেয়ে কঠিন লড়াই—ক্ষুধার সঙ্গে বেঁচে থাকার লড়াই। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, এখন পর্যন্ত অন্তত ১৮০ জন মানুষ অনাহারে মারা গেছেন, যাদের অর্ধেকই শিশু। এপ্রিল থেকে জুলাইয়ের মাঝামাঝি পর্যন্ত ২০ হাজারের বেশি শিশু তীব্র অপুষ্টিতে ভুগে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে, এর মধ্যে ৩ হাজার শিশু মারাত্মক ঝুঁকিতে ছিল।
এদিকে পর্যাপ্ত সহায়তা থাকা সত্ত্বেও তা গাজায় পৌঁছাতে পারছে না। ২০২৩ সালের অক্টোবরের আগ পর্যন্ত গাজায় প্রতিদিন গড়ে ৫০০টি ট্রাক ঢুকত। এখন সেই সংখ্যার ধারে কাছেও যাওয়া হচ্ছে না। গত শনিবার মাত্র ৩৬টি ট্রাক ঢুকতে পেরেছে, অথচ ২২ হাজারের বেশি সহায়তা বোঝাই ট্রাক সীমান্তে দাঁড়িয়ে আছে।
খাদ্য ট্রাকগুলো সীমান্তে নামানোর পর জাতিসংঘ ও অন্যান্য সংস্থাকে আলাদাভাবে অনুমতির জন্য অপেক্ষা করতে হয়। জুলাই ১৯-২৫ সময়কালে ১৩৮টি কনভয়ের আবেদন জমা পড়লেও মাত্র ৭৬টি প্রবেশের অনুমোদন পেয়েছে। অনুমতি পেলেও ৪৬ ঘণ্টা পর্যন্ত দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। গন্তব্যে পৌঁছাতে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত সময় লাগে, কারণ পথে থাকে চেকপয়েন্ট, হামলার আশঙ্কা ও রুট পরিবর্তনের প্রয়োজন।
এতসব জটিলতার মধ্যে মাত্র ৬০ জন চালক গাজার ভেতরে ত্রাণবাহী গাড়ি চালানোর অনুমতি পেয়েছেন। ত্রাণ ট্রাক রাস্তায় বের হলে অনাহারে থাকা মানুষগুলো সেটি থামিয়ে খাদ্য নিতে ছুটে আসে। অনেক সময় চালকরা ইসরায়েলি স্নাইপার বা ড্রোন হামলারও শিকার হন।
ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনে গাজা হিউম্যানিটারিয়ান ফাউন্ডেশন (জিএইচএফ) চালু হয় ২৭ মে। এতে জাতিসংঘের ৪০০টি ত্রাণ বিতরণ কেন্দ্র বন্ধ করে মাত্র ৪টি "মেগা সাইট" চালু করা হয়, যেগুলোর অবস্থান যুদ্ধক্ষেত্রের। খাদ্যের জন্য মানুষকে অনেক দূর হাঁটতে হয়, খোলা আকাশের নিচে রাত কাটাতে হয়, এমনকি সহিংসতা ও গুলি বর্ষণের মুখে পড়তে হয়। ৫ আগস্ট পর্যন্ত জিএইচএফ কেন্দ্রগুলোতে খাবার সংগ্রহ করতে গিয়ে অন্তত ১ হাজার ৪৮৭ জন নিহত ও ১০ হাজার ৫৭৮ জন আহত হয়েছেন।
এই পরিস্থিতিতে ফ্রান্স, জর্ডান, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ কিছু দেশ এয়ারড্রপের মাধ্যমে ত্রাণ পাঠালেও তা অপ্রতুল ও ঝুঁকিপূর্ণ। অনেক সাহায্য সাগরে পড়ে নষ্ট হয়েছে, আবার কিছু খাদ্যে ছত্রাকের আক্রমণ দেখা গেছে।
ইসরায়েলের দাবি, তারা হামাস যেন ত্রাণ না পায় সেজন্য নিয়ন্ত্রণ করছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থা (ইউএসএআইডি) ও ইসরায়েলি সামরিক কর্মকর্তারাই জানিয়েছেন, হামাসের ত্রাণ আত্মসাতের কোনো প্রমাণ নেই।
অক্টোবর ২০২৩ থেকে আগস্ট ২০২৫ পর্যন্ত ইসরায়েলি হামলায় ৬১ হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ১৮ হাজার ৪৩০ শিশু। স্বাস্থ্যবিষয়ক জার্নাল দ্য ল্যানসেট বলছে, প্রকৃত মৃত্যু আরো অন্তত ৪০ শতাংশ বেশি, কারণ বহু মানুষ হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই মারা গেছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ক্ষুধা কেবলমাত্র মানবসৃষ্ট, পরিকল্পিত, দীর্ঘস্থায়ী ও নির্মম। এটা মানবসভ্যতার ইতিহাসে সবচেয়ে বর্বর হত্যাকাণ্ডের একটি।