ব্যাবিলন: প্রাচীন বিস্ময়ের ভগ্নচিত্র

১৯৮০-এর দশকে সাদ্দাম হোসেন এ ঐতিহাসিক নগরীকে নিজের ক্ষমতার প্রতীকে পরিণত করার চেষ্টা করেছিলেন। নতুন ইট দিয়ে প্রাচীর পুনর্নির্মাণ করান, এমনকি নিজের নাম খোদাই করান প্রাচীন দেয়ালে। পাশেই গড়ে তোলেন বিশাল প্রাসাদ, যা ধ্বংসাবশেষ রক্ষণাবক্ষেণ প্রচেষ্টার চেয়ে তার ক্ষমতার প্রদর্শনেই বেশি গুরুত্ব পায়।

ইরাকের মধ্যাঞ্চলে যখন বিকালের শেষ আলো নেমে আসে তখন ব্যাবিলনের ধ্বংসাবশেষ আগুনে পোড়া সোনার মতো ঝলমল করে ওঠে। চারপাশে উড়তে থাকা ধুলোর মধ্যে বাতাসে ভেসে আসে এক অদ্ভুত গন্ধ— যে বাতাসে মিশে আছে সহস্রাব্দের পুরোনো স্মৃতি। একসময় যেখানে ছিল রাজাদের দৌর্দণ্ড প্রতাপ, সেখানেই আজ নীরবতা। কেবল মাঝে মাঝে শোনা যায় কিছু পর্যটকের পায়ের শব্দ, মৃদু গুঞ্জন।

প্রাচীন মেসোপটেমিয়ার এই নগরী এক সময় ছিল সভ্যতার রত্ন। এখানেই শাসন করেছিলেন মহাশক্তিশালী রাজা নেবুচাদনেজ্জার দ্বিতীয়। নির্মিত হয়েছিল বিশাল প্রাসাদ, মন্দির আর সুউচ্চ জিগুরাত। ইতিহাসবিদেরা বিশ্বাস করেন, এখানেই দাঁড়িয়ে ছিল বিশ্বের সাত আশ্চর্যের একটি—বিখ্যাত ‘হ্যাংগিং গার্ডেনস অব ব্যাবিলন’। যদিও ব্যাবিলনের ঝুলন্ত উদ্যানের বাস্তবতা নিয়ে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে তর্ক-বিতর্ক চলছে।

ইরাকি প্রত্নতত্ত্ববিদ আমের আবদুলরাজ্জাকের দৃঢ় বিশ্বাস—বাগানটি বাস্তবেই ছিল। তিনি বলেন, ‘এটি ছিল ব্যাবিলনীয় প্রকৌশলী ও শিল্পীর সৌন্দর্য আর দক্ষতার প্রতীক, নেবুচাদনেজ্জারের মহিমার প্রতিফলন।’ পর্যটকের চোখে বিষয়টি আরো আবেগঘন। মিলানের বাসিন্দা জিয়ানমারিয়া ভারগানি ছোটবেলা থেকে ব্যাবিলনের ঝুলন্ত উদ্যানের গল্প শুনে বড় হয়েছেন। অবশেষে যখন তিনি ইরাক ভ্রমণে এসে ইশতার গেটের সামনে দাঁড়ালেন, তার কণ্ঠ কেঁপে উঠল—‘বিশ্বাসই করতে পারছি না, হাজার বছর আগে মানুষ এই পথেই হেঁটেছে। মনে হচ্ছে আজ আমার জীবনের স্বপ্ন পূর্ণ হলো।’

কিন্তু ব্যাবিলনের বর্তমান ছবি একেবারেই অন্য রকম। ধ্বংসস্তূপের ভেতর দিয়ে হাঁটলে চোখে পড়ে আগাছা, ময়লা আর ভাঙাচোরা পথ। রাজপ্রাসাদের উঠোনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে সিগারেটের খোসা আর প্লাস্টিকের বোতল। পর্যটকদের জন্য সুবিধা অল্পই—সঠিক সাইনবোর্ড নেই, হোটেল নেই, টয়লেটও অর্পযাপ্ত।

১৯৮০-এর দশকে সাদ্দাম হোসেন এ ঐতিহাসিক নগরীকে নিজের ক্ষমতার প্রতীকে পরিণত করার চেষ্টা করেছিলেন। নতুন ইট দিয়ে প্রাচীর পুনর্নির্মাণ করান, এমনকি নিজের নাম খোদাই করান প্রাচীন দেয়ালে। পাশেই গড়ে তোলেন বিশাল প্রাসাদ। ধ্বংসাবশেষের রক্ষণাবেক্ষণের প্রচেষ্টার চেয়ে তার ক্ষমতার প্রদর্শনই বেশি গুরুত্ব পায়। ২০০৩ সালের মার্কিন আগ্রাসনের পর অবস্থা হয় আরো করুণ। সেনারা সাদ্দামের প্রাসাদে ঘাঁটি বানায়, হেলিকপ্টার নামে প্রত্নস্থলের ওপর, ট্যাঙ্কের চাপে ক্ষতিগ্রস্ত হয় নরম মাটি। দেয়ালে লেখা হয় গ্রাফিতি, ভেঙে পড়ে ভেতরের স্থাপনা।

২০১৯ সালে ইউনেসকো ব্যাবিলনকে বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছে। কিন্তু তালিকাভুক্ত হওয়া সত্ত্বেও সংরক্ষণের কাজ খুব বেশি এগোয়নি। চারজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী, কয়েকজন স্থানীয় গাইড আর প্রত্নতত্ত্ববিদদের প্রাণপণ চেষ্টা—এই দিয়েই টিকে আছে স্থাপনাটি। ২২ বছর বয়সী স্থানীয় গাইড হুসেইন হাসান বলেন, ‘আমি চেষ্টা করি পর্যটকদের সামনে ইরাকের ইতিবাচক ছবি তুলে ধরতে। টেলিভিশনে যা দেখায়, বাস্তবে ইরাক তার চেয়ে অনেক সুন্দর।’ তবে তিনি দুশ্চিন্তা না লুকিয়েই বলেন, ‘সরকারি সহায়তা আর বিনিয়োগ ছাড়া এই শহর টিকবে না।’

আজকের ব্যাবিলনে হাঁটতে হাঁটতে চোখে পড়ে একই দেয়ালে নেবুচাদনেজ্জারের খোদাই আর সাদ্দামের লেখা। ব্যাবিলনের সিংহ এখনও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু তার পাদদেশ ঘিরে জন্মেছে আগাছা। আর যে আসল ইশতার গেট একসময় ব্যাবিলনের গৌরব ছিল, সেটি আজ জার্মানির বার্লিনে প্রদর্শিত হচ্ছে।

আরও