নেপালে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত জলবিদ্যুৎকেন্দ্রের সুড়ঙ্গে কেউ জীবিত আটকে আছেন কিনা, তা খুঁজে দেখতে উদ্ধারকারীদের সহায়তা করছেন একদল প্রকৌশলী। ঘটনাস্থলে অভিযান চালানো উদ্ধারকারী দলকে সুড়ঙ্গের নকশা, অবস্থান ও প্রবেশপথ সম্পর্কে তাৎক্ষণিক পরামর্শ দিচ্ছেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম হোয়াটসঅ্যাপের একটি গ্রুপে যুক্ত বিশেষজ্ঞরা।
গত ২৬ আগস্ট নেপালের ত্রিশুলি উপত্যকায় হিমবাহ ধস থেকে সৃষ্ট ভয়াবহ বন্যা আঘাত হানার আগেই গ্রুপটি তৈরি করেছিলেন প্রকৌশলীরা। পরে উদ্ধার অভিযানে সহায়তার জন্য এতে আরো বিশেষজ্ঞকে যুক্ত করা হয়। হেলিকপ্টার ও ভারী যন্ত্রপাতির পাশাপাশি নিখোঁজদের উদ্ধারে এখন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে গ্রুপটি।
দুর্যোগের পর নেপালের এ অঞ্চলের ছয়টি জলবিদ্যুৎকেন্দ্রের সঙ্গে যুক্ত প্রায় ৯০০ মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানিয়েছিল কর্তৃপক্ষ। এর মধ্যে অন্তত তিনটি প্রকল্প নির্মাণাধীন ছিল। কর্তৃপক্ষের ধারণা, বন্যার পানি থেকে বাঁচতে শ্রমিকদের কেউ কেউ সুড়ঙ্গে আশ্রয় নিয়ে থাকতে পারেন। এসব সুড়ঙ্গে কাজ করা প্রায় ৩০০ জনকে এখন পর্যন্ত উদ্ধার করা হয়েছে এবং প্রায় ৫০০ শ্রমিক নিখোঁজ রয়েছেন।
সবশেষ দুর্যোগের নয় দিন পর আজ শুক্রবার আপার ত্রিশুলি-৩এ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত একটি সুড়ঙ্গ থেকে দুই শ্রমিককে জীবিত উদ্ধারের ঘটনা এ অভিযানে প্রথম বড় সাফল্য এনে দিয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় এক আইনপ্রণেতা।
উদ্ধারকারীরা জানিয়েছেন, বন্যার স্রোতে উপত্যকাজুড়ে প্রায় ২২ লাখ টন কাদা ও ধ্বংসাবশেষ জমে গেছে। ফলে পানি চলাচলের জন্য নির্মিত কিংবা জলবিদ্যুৎকেন্দ্রে প্রবেশের কাজে ব্যবহৃত সুড়ঙ্গগুলোও চাপা পড়ে গেছে। তাই অনেক সুড়ঙ্গের প্রবেশপথ শনাক্ত করাই কঠিন হয়ে পড়েছে।
‘লেআউটের নকশা পাঠান’
রয়টার্স জানিয়েছে, গত শনিবার হিমালয় উপত্যকার চীনা সীমান্তসংলগ্ন এলাকায় ক্ষতিগ্রস্ত চিলিমে জলবিদ্যুৎকেন্দ্রের ধ্বংসাবশেষে তল্লাশি চালাচ্ছিলেন উদ্ধারকারীরা। এ সময় প্রকৌশলীদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে এক সরকারি কর্মকর্তা লেখেন, চিলিমের লেআউটের নকশা কি পাঠাতে পারবেন?
কয়েক মিনিটের মধ্যেই গ্রুপের এক সদস্য প্রকল্পটির পাওয়ারহাউজের নকশা এবং সুড়ঙ্গগুলোর প্রবেশপথ-সংক্রান্ত তথ্য পাঠান। ৫০০-এর বেশি সদস্যের এ গ্রুপে এমন আরো বেশ কয়েকটি বার্তা আদান-প্রদান হয়েছে।
নেপালের ইন্ডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসার্স অ্যাসোসিয়েশন গত সোমবার জানিয়েছে, চিলিমে অন্তত আটজন আটকা পড়ে থাকতে পারেন। অন্যদিকে নেপাল ইলেকট্রিসিটি অথরিটির (এনইএ) এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আরো দক্ষিণে অবস্থিত রাসুওয়াগাধি জলবিদ্যুৎকেন্দ্রে ৪৬ জন আটকা পড়ে থাকতে পারেন।
দেশটির সরকারি ও সামরিক কর্মকর্তা, প্রকৌশলী, জীবিত উদ্ধার হওয়া ব্যক্তি এবং নিখোঁজ শ্রমিকদের স্বজনসহ বেশ কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলেছে রয়টার্স। তারা জানিয়েছেন, ধ্বংস হয়ে যাওয়া জলবিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বিস্তৃত সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্কে তল্লাশি চালানোর পাশাপাশি হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে তাৎক্ষণিক পরামর্শ নেয়া হচ্ছে।
নেপাল সেনাবাহিনীর মুখপাত্র রাজা রাম বাসনেট বলেন, বন্যার কারণে সুড়ঙ্গগুলোর আশপাশের ভূপ্রকৃতি বদলে গেছে এবং সুড়ঙ্গের কাঠামোও পরিবর্তিত হয়েছে। কাদা, পাথর, মাটি ও অন্য ধ্বংসাবশেষ ভেতরে জমেছে। এটি সুড়ঙ্গের স্বাভাবিকভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনা নয়।
সোমবার চিলিমে তোলা রয়টার্সের ছবিতে দেখা গেছে, একটি বড় সুড়ঙ্গের প্রবেশপথের কিছুটা ভেতর পর্যন্ত বন্যার ধ্বংসাবশেষ জমে রয়েছে। সেগুলোর উচ্চতা গিয়ে পৌঁছেছে প্রবেশপথের ছাদ পর্যন্ত।
চিলিমের পাশাপাশি এ উপত্যকার আরো পাঁচটি জলবিদ্যুৎকেন্দ্রে উদ্ধার অভিযান চলছে। এসব প্রকল্প নেপালের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ রফতানির ক্রমবর্ধমান অবকাঠামোর অংশ ছিল। বন্যায় দেশটির মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার প্রায় ১০ শতাংশ নষ্ট হয়েছে।
সুড়ঙ্গের নেটওয়ার্ক নিয়ে হোয়াটসঅ্যাপে পরামর্শ
রাসুওয়াগাধি জলবিদ্যুৎকেন্দ্রে উদ্ধারকারীরা একটি সুড়ঙ্গের ভেতরে ২৫০ মিটার পর্যন্ত এগিয়ে যাওয়ার পর পথ বন্ধ দেখতে পান। তবে তল্লাশি বন্ধ করেননি তারা। এনইএর বোর্ড সদস্য আমশু কিরণ শাহি বলেন, আমরা আবার সেখানে ঢোকার চেষ্টা করছি, যাতে ভেতরে কেউ আছে কিনা খুঁজে দেখা যায়। তার ধারণা, একটি কক্ষে ৪৬ জন আটকা পড়ে থাকতে পারেন। সেখানে তাদের খাবার ও পানি মজুদ ছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে।
পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে এনইএর এক কর্মকর্তা জানান, উদ্ধারকারীরা হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের মাধ্যমে জলবিদ্যুৎকেন্দ্রের সাবেক কর্মীদের কাছ থেকেও সুড়ঙ্গের নেটওয়ার্ক সম্পর্কে পরামর্শ নিয়েছেন। গ্রুপে দেয়া নকশাগুলো এ কাজে বেশ উপকারী হয়েছে বলে জানান তিনি।
এর মধ্যে আপার ত্রিশুলি-৩এ জলবিদ্যুৎকেন্দ্রে সুড়ঙ্গের প্রবেশপথ মাটির নিচে চাপা পড়ায় উদ্ধারকারীদের সেখানে পৌঁছাতে প্রায় ছয় দিন সময় লাগে বলে জানান শাহি। শুক্রবার দুই জীবিত ব্যক্তিকে উদ্ধারের আগে সম্ভাব্যভাবে কেউ আটকা পড়ে থাকলে তাদের জীবন বাঁচাতে সুড়ঙ্গের ভেতরের বিভিন্ন ফাঁকা জায়গায় পাইপের মাধ্যমে অক্সিজেন সরবরাহের চেষ্টা করা হচ্ছিল।
আপার ত্রিশুলি-১ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সিভিল ইঞ্জিনিয়ার জন জীবন ঠাকুর জানান, বন্যার পানি নেমে আসার কয়েক মুহূর্ত আগে এক সহকর্মী তাকে সতর্ক করেছিলেন। এতে প্রকল্পের আরো প্রায় ১০০ কর্মীর সঙ্গে তিনি উঁচু এলাকায় উঠে যাওয়ার সুযোগ পান। তিনি বলেন, আমরা পাহাড়ের দিকে দৌড়ে চলে যাই। দুই-তিন মিনিট পর নিচের দিকে তাকিয়ে দেখি, সবকিছু শেষ। বন্যার ধ্বংসাবশেষ আমাদের অফিস এলাকা পুরোপুরি ঢেকে ফেলেছিল।
একই প্রকল্পে কর্মরত ধন বাহাদুর তামাং বন্যার সময় একটি সুড়ঙ্গ দিয়ে বের হয়ে আসার অভিজ্ঞতা জানিয়েছেন। তার ভাষ্যে, বন্যার পানির স্রোতে পাইপ ও অন্য সরঞ্জাম সুড়ঙ্গের ভেতরে ভেসে যাচ্ছিল। সুড়ঙ্গের কাঠামো সম্পর্কে তার জ্ঞান থাকায় কয়েকজনের সঙ্গে তিনি বের হওয়ার পথ খুঁজে পান। তবে বের হওয়ার পথে মৃতদেহও দেখতে পান তিনি।
এদিকে প্রকৌশলীদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে নিখোঁজ শ্রমিকদের নাম ও মোবাইল নম্বরও শেয়ার করা হচ্ছে। সর্বশেষ অবস্থান শনাক্তের চেষ্টা হিসেবে এসব তথ্য টেলিযোগাযোগ কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছে দিতে সরকারি কর্মকর্তাদের অনুরোধ করা হচ্ছে।
অন্যদিকে নিখোঁজ স্বজনদের ফিরে আসার অপেক্ষায় রয়েছেন পরিবারের সদস্যরা। আপার ত্রিশুলি-১-এর পরিবেশ প্রকৌশলী রাজিশ শ্রেষ্ঠার ৩০ বছর বয়সী ছেলে রাজিশ এখনো নিখোঁজ। তার বাবা রাজেশ শ্রেষ্ঠা জানালেন, তিনি জানালার গ্রিল তৈরির একটি ওয়ার্কশপ পরিচালনা করেন। তিনি বলেন, যখনই বাইরে তাকাই, মনে হয় ওকে ব্যাগ নিয়ে বাড়ি ফিরতে দেখব, যেমনটা সে সবসময় করত। ও ফিরে আসবে—এই আশাতেই আমি টিকে আছি।