পশ্চিম তীরে অবৈধ বসতি স্থাপন

যুক্তরাজ্যের নিষেধাজ্ঞাকে স্বাগত জানালেন ইসরায়েলের বিশিষ্টজনেরা

যুক্তরাজ্যের নিষেধাজ্ঞার সিদ্ধান্তকে সমর্থন জানিয়ে যৌথ বিবৃতি দিয়েছেন ইসরায়েলের সাবেক প্রধানমন্ত্রী এহুদ ওলমার্ট, সাবেক সেনাপ্রধান ডান হালুতজ, ইসরায়েল একাডেমি অব সায়েন্সেস অ্যান্ড হিউম্যানিটিসের সভাপতি প্রফেসর ডেভিড হারেলসহ বেশ কয়েকজন সাবেক মন্ত্রী ও কূটনীতিক

অধিকৃত পশ্চিম তীরে অবৈধ ইসরায়েলি বসতি স্থাপন ও সহিংসতার বিরুদ্ধে সম্প্রতি নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে যুক্তরাজ্য। এ সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে ইসরায়েলের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা। দেশটির সাবেক শীর্ষ রাজনীতিবিদ, সামরিক কর্মকর্তা, কূটনীতিক, শিক্ষাবিদ ও বুদ্ধিজীবীরা ব্রিটিশ সরকারের এ সিদ্ধান্তকে অনিবার্য পরিণতি হিসেবে বর্ণনা করেছেন। খবর দ্য গার্ডিয়ান।

যুক্তরাজ্যের নিষেধাজ্ঞার সিদ্ধান্তকে সমর্থন জানিয়ে যৌথ বিবৃতি দিয়েছেন ইসরায়েলের সাবেক প্রধানমন্ত্রী এহুদ ওলমার্ট, সাবেক সেনাপ্রধান ডান হালুতজ, ইসরায়েল একাডেমি অব সায়েন্সেস অ্যান্ড হিউম্যানিটিসের সভাপতি প্রফেসর ডেভিড হারেলসহ বেশ কয়েকজন সাবেক মন্ত্রী ও কূটনীতিক। যৌথ বিবৃতিতে তারা বলেন, ‘এ নিষেধাজ্ঞা ইহুদি সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে নেয়া হয়েছে, ইসরায়েল রাষ্ট্রের বৈধতার বিরুদ্ধে নয়। ইহুদি সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞার পদক্ষেপকে ইহুদিবিদ্বেষ হিসেবে আখ্যা দেয়ার যে চেষ্টা ইসরায়েলি সরকার করছে, তার কোনো ভিত্তি নেই।’

গত মঙ্গলবার যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এড মিলিব্যান্ড মিলিব্যান্ড নতুন নিষেধাজ্ঞার ঘোষণা দেন। দখলকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি স্থাপন ও বাণিজ্যিক কাঠামোর ওপর অর্থনৈতিক এ কঠোর বিধিনিষেধ ঘোষণা করা হয়। নতুন এ ব্যবস্থার অধীনে অবৈধ বসতি থেকে উৎপাদিত পণ্য আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা জারি করার পাশাপাশি বসতি সম্প্রসারণে সহায়তা বা অর্থায়নকারী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ওপর নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা হবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের (আইসিজে) উপদেষ্টা মতামতের সঙ্গে সংগতি রেখে পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি দখলদারত্বকে অন্যায্য ও অবৈধ হিসেবে পুনরুল্লেখ করেছে যুক্তরাজ্য।

যুক্তরাজ্যের এ পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছেন ইসরায়েল একাডেমি অব সায়েন্সেস অ্যান্ড হিউম্যানিটিসের প্রধান প্রফেসর ডেভিড হারেল। তিনি বলেন, ‘ইসরায়েল রাষ্ট্রের ওপর সার্বিক বয়কট বা নিষেধাজ্ঞার পক্ষে আমি নই। তবে পশ্চিম তীরে ইসরায়েল সরকার যা করছে, তার বিরুদ্ধে এ নির্দিষ্ট নিষেধাজ্ঞা পুরোপুরি যুক্তিসংগত। অবৈধ বসতি স্থাপন বন্ধ করা এবং দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের পথে হাঁটা কেবল ফিলিস্তিনিদের জন্য নয়, বরং ইসরায়েলের নিজেদের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা ও নৈতিক অবস্থান রক্ষার জন্যও জরুরি।’

পশ্চিম তীরে অবস্থিত তুলকারম শিবির। যেখানে ফিলিস্তিনিদের বাড়িঘর ভেঙে ফেলার পর ইসরায়েলিরা বুলডোজার দিয়ে নতুন রাস্তা তৈরি করেছে

একই ধরনের মত প্রকাশ করেছেন ইসরায়েলের সাবেক কূটনীতিক নাদাভ তামির। তিনি বলেন, ‘পশ্চিম তীর কিংবা গাজায় ফিলিস্তিনিদের ওপর উচ্ছেদ ও জাতিগত নিধন বন্ধের যেকোনো উদ্যোগ ইসরায়েলের গণতান্ত্রিক ও নৈতিক অস্তিত্ব রক্ষার জন্য সহায়ক হবে। ইসরায়েলি পার্লামেন্ট নেসেটের সাবেক স্পিকার আব্রাহাম বার্গও ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এমন সাহসী ও নৈতিক পদক্ষেপের জন্য ধন্যবাদ জানাই।’

ইসরায়েলি পার্লামেন্ট নেসেটের সাবেক স্পিকার আব্রাহাম বার্গও যুক্তরাজ্যের পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছেন। তিনি ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী এড মিলিব্যান্ডকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, ‘এটি একটি সাহসী ও নৈতিক পদক্ষেপ।’

ইসরায়েলি সমাজে অবশ্য এ বিষয়ে বড় ধরনের মতপার্থক্য রয়েছে। জিউইশ পিপল পলিসি ইনস্টিটিউটের সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, ইসরায়েলের প্রায় ৭৫ শতাংশ ইহুদি নাগরিক অধিকৃত পশ্চিম তীরের আংশিক বা পুরোপুরি ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্ত করার পক্ষে। আসন্ন নির্বাচনে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর প্রার্থীরাও ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করছেন।

তবে দেশটির রাজনৈতিক, নিরাপত্তা ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের একটি অংশ বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা ও বসতি সম্প্রসারণের বিরোধিতা করছে। চলতি গ্রীষ্মে কয়েকজন বিশিষ্ট ইসরায়েলি তাদের সরকারের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়ার হুমকি দিয়েছিলেন। তাদের অভিযোগ ছিল, সরকার পশ্চিম তীরে ইহুদি সন্ত্রাস এবং ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদের একটি মতাদর্শকে সমর্থন করছে।

বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইসরায়েলের কোনো ঘনিষ্ঠ পশ্চিমা মিত্রের পক্ষ থেকে বসতি স্থাপনের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক ক্ষমতা প্রয়োগের এটিই সবচেয়ে বড় পদক্ষেপ। যুক্তরাজ্যের এ ঘোষণার পরপরই ফ্রান্স ও কানাডা অনুরূপ বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞার পরিকল্পনা প্রকাশ করে এবং ইউরোপের আরো ১০টি দেশ এ ধরনের পদক্ষেপে সমর্থন জানায়। এ আকস্মিক কূটনৈতিক সিদ্ধান্তকে ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমগুলোতে একটি বড় ধরনের ধাক্কা হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।

অধিকৃত পশ্চিম তীরে অবস্থিত ইসরায়েলি বসতি মালে আদুমিমের একাংশ

অবশ্য যুক্তরাজ্যের নিষেধাজ্ঞার সরাসরি অর্থনৈতিক প্রভাব শুরুতে সীমিত হতে পারে। ইসরায়েলের বৈদেশিক বাণিজ্য প্রশাসনের প্রধান রোয়ি ফিশার জানান, গত বছর অধিকৃত অঞ্চল থেকে যুক্তরাজ্যে রফতানি হওয়া পণ্যের মূল্য ছিল মাত্র ৪ কোটি ৫০ লাখ ডলার। অন্যদিকে দুই দেশের পণ্য ও সেবার মোট বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল প্রায় ৪৪০ কোটি ডলার। কিন্তু বসতি সম্প্রসারণে অর্থায়ন বা সহায়তা করা প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হলে এর প্রভাব বড় হতে পারে। এতে ইসরায়েলের বড় ব্যাংক ও বিমা প্রতিষ্ঠানগুলো যুক্তরাজ্যে নিজেদের ব্যবসায়িক স্বার্থ এবং অধিকৃত অঞ্চলের বসতি কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পর্ক—দুইয়ের মধ্যে কঠিন সিদ্ধান্তের মুখে পড়তে পারে।

অন্যদিকে এ বিধিনিষেধের কঠোর সমালোচনা করেছে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন ইসরায়েলি সরকার। দেশের আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের ঠিক আগে যুক্তরাজ্যের এ পদক্ষেপকে অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ‘সরাসরি হস্তক্ষেপ’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিডন সার।

তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ডালিয়া শেইনডলিন মনে করেন, যুক্তরাজ্যের নিষেধাজ্ঞা আসন্ন নির্বাচনে বড় প্রভাব ফেলবে না। তার মতে, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর ইসরায়েলি সমাজ আরো বেশি অভ্যন্তরীণ বিষয়ে মনোযোগী হয়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক সমালোচনার চেয়ে দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ই ভোটারদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

অন্যদিকে, বি’তসেলেম ও ব্রেকিং দ্য সাইলেন্সসহ ইসরায়েলের ১৪টি মানবাধিকার সংস্থা যৌথ বিবৃতি দিয়ে যুক্তরাজ্যের নিষেধাজ্ঞাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও প্রয়োজনীয় প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে স্বাগত জানিয়েছে। ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে মানবাধিকার লঙ্ঘন, বসতি সম্প্রসারণ ও উচ্ছেদ অভিযান স্থায়ীভাবে বন্ধ করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আরো কঠোর ও কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনগুলো।

এ ঘটনার পর ইসরায়েলে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম ইয়েদিওথ আহরোনোথের সাংবাদিক ইতামার আইখনার লিখেছেন, ইসরায়েল সমালোচনার জন্য প্রস্তুত ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত যা ঘটেছে, তা ছিল আরো বড় ধাক্কা। দেশটির জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের কেউ কেউ পরিস্থিতিকে ‘গোয়েন্দা ও কূটনৈতিক ব্যর্থতা’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

হারেৎজ পত্রিকার লেখক এসথার সলোমন বলেন, ‘ইসরায়েল সরকারের নীতির কারণে দেশটির দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক অবস্থানেও বড় পরিবর্তন এসেছে। এত দিন ইসরায়েলের মিত্ররা বসতি সম্প্রসারণ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করলেও কার্যকর অর্থনৈতিক ব্যবস্থা নেয়া থেকে বিরত ছিল।’

আরও