ভ্লাদিভস্তকের একটি স্কেটিং মাঠে ৩০ বছর বয়সী দিমিত্রি আফানাসেভ তার প্যারা আইস হকি দলের সতীর্থদের সঙ্গে অনুশীলনে মগ্ন। খেলোয়াড়রা তাদের কৃত্রিম পা খুলে বিশেষ ধরনের স্লেজে বসে হকি স্টিক দিয়ে নিজেদের চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। দিমিত্রির স্বপ্ন, একদিন তিনি প্যারা অলিম্পিক আইস হকি চ্যাম্পিয়ন হবেন।
তবে এই স্বপ্ন পূরণ সহজ নয়। ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে রাশিয়ার দলগুলোকে শেষ প্যারা অলিম্পিক গেমসে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। আর দিমিত্রির মতো তার দলের প্রায় সব খেলোয়াড়ই একসময় ছিলেন রণক্ষেত্রে। 'একটি মাইন আমার দিকে উড়ে আসল', ইউক্রেনে যুদ্ধ করতে গিয়ে আহত হওয়া দিমিত্রি স্মরণ করেন। 'আমি মাটিতে পড়ে গেলাম, পায়ে জ্বালা অনুভব করলাম। নিচে তাকিয়ে দেখি সবকিছু ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে। আমি নিজেই টর্নিকেট লাগিয়ে আমার সতীর্থদের বললাম আমাকে ওখান থেকে টেনে নিয়ে যেতে।'
'আমার স্ত্রী একজন সার্জন। তাকে আমার পায়ের একটি ছবি পাঠালাম। সে উত্তর দিল, 'তারা সম্ভবত এটি কেটে ফেলবে।' আমি বললাম, 'ঠিক আছে। আমার একটি পা থাকুক বা দুটি। যা হয় হবে।' দিমিত্রির কথার পিঠে গভীর বিষণ্ণতার ক্ষত।
ইউক্রেন থেকে প্রায় ৪,০০০ মাইল দূরে, রাশিয়ার সুদূর পূর্বে অবস্থিত বন্দর শহর ভ্লাদিভস্তক। ভৌগোলিকভাবে এশিয়ায় হলেও, শহরটির আকাশে এখন ইউক্রেন যুদ্ধের ছায়া স্পষ্ট। দূরত্বের এই বিশাল ব্যবধান এখানে অর্থহীন হয়ে গেছে। যুদ্ধের প্রভাব এসে পড়েছে প্রতিটি মানুষের জীবনে, প্রতিটি রাস্তায়।
৪,০০০ মাইল দূরে থেকেও যুদ্ধ এসে পৌঁছেছে ভ্লাদিভস্তকে। ছবি- বিবিসি
শহরের একটি পাহাড়ের ওপর অবস্থিত কবরস্থানে সারি সারি নতুন কবর—এগুলো ইউক্রেনে নিহত রুশ সৈন্যদের। কবরস্থানের আরেক অংশে 'বিশেষ সামরিক অভিযানের নায়কদের' জন্য একটি স্মৃতিস্তম্ভ তৈরি করা হয়েছে। রাশিয়ায় সরকারিভাবে ইউক্রেন যুদ্ধের যে নাম, সেটিই এখানে লেখা। এখানে আছে আরো বহু রুশ সৈন্যের কবর এবং রয়েছে এক সশস্ত্র রুশ সৈন্যের মূর্তি। 'সৈনিকরা চিরকাল বেঁচে থাকে,' লেখাটিও চোখে পড়বে।
ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে রাশিয়ার সাধারণ মানুষ কী ভাবছে—এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করা কঠিন। রাশিয়া এতটাই বিশাল এবং বৈচিত্র্যপূর্ণ যে এর একপ্রান্তের মানুষের ভাবনা অন্য প্রান্তের মানুষের সঙ্গে নাও মিলতে পারে। ইউক্রেন সীমান্তবর্তী অঞ্চল কুরস্ক বা বেলগোরোদের মানুষের সঙ্গে সুদূর প্রাচ্যের ভ্লাদিভস্তকের মানুষের চিন্তাভাবনায় বৈসাদৃশ্য পাওয়া অস্বাভাবিক নয়। পার্কে বসা সেতলানার কণ্ঠে ক্লান্তি—'এ যুদ্ধ আর কত দিন চলবে?'
অন্যদিকে ইলিয়া বলেন—'জীবন খুব একটা পাল্টায়নি। আয় হয়, খরচ হয়। শুধু আমরা চাই বিশ্ব আমাদের আবার গ্রহণ করুক।'
শহরের রাস্তায় বাস্কিং করছে এক তরুণ, নিজের নাম রেখেছে 'জনি লন্ডন'। যুদ্ধ নিয়ে সে ভাবে না। বলে—'আমরা কিছু বদলাতে পারি না। একদিন সব স্বাভাবিক হবে।' আর স্বাভাবিক মানে? 'যুদ্ধহীন দিন।'
পেনশনভোগী ভিক্টরের মতো অনেকে এখনো পুতিনের ভক্ত। পশ্চিমকে দোষ দেন, নতুন বিশ্ব ব্যবস্থার স্বপ্ন দেখেন। এরই মধ্যে শহর সেজে উঠছে ইস্টার্ন ইকোনমিক ফোরামের জন্য।
রাস্তার ধারে শিল্পী ফিলিপ আঁকেন এক বিশাল মুরাল—পুতিন সামরিক পোশাকে আলিঙ্গন করছেন একটি সাইবেরিয়ান টাইগারকে। ফিলিপ বলেন, 'আমুর বাঘ বরাবরই বন্যপ্রাণীর প্রতীক, এবং ভ্লাদিমির পুতিন রাশিয়ার।'
এই চিত্রকর্মের পাশে স্প্রে করে রাশিয়ার সুদূর পূর্বে সূর্যোদয় নিয়ে ছোট্ট একটি বাক্য লিখেছেন ফিলিপ—'তবুও ভোর এখান থেকেই শুরু হয়।'
যুদ্ধ ও শান্তির অনিশ্চয়তা ছায়া ফেলেছে সুদূর বন্দরনগরীর দেয়ালেও।
বিবিসি অবলম্বনে