মাসের পর মাস যুদ্ধ, সীমান্তে গোলাগুলি আর কূটনৈতিক টানাপোড়েনের পর অবশেষে একটি ‘ফ্রেমওয়ার্ক অ্যাগ্রিমেন্ট’ বা কাঠামোগত চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে ইসরায়েল ও লেবানন। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এ চুক্তিকে শান্তির পথে ‘শুরুর সূচনা’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তবে বাইরে থেকে একে একটি সাধারণ শান্তি চুক্তি মনে হলেও, এর ভেতরে লুকিয়ে আছে মধ্যপ্রাচ্য রাজনীতির নানা জটিল সমীকরণ ও অমীমাংসিত প্রশ্ন।
চুক্তি স্বাক্ষরের পরও প্রশ্ন থেকেই গেছে— এটি কি সত্যিই শান্তির পথ দেখাবে, নাকি নতুন সংকটের ভিত্তি তৈরি করবে?
এপ্রিল থেকে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় দুই দেশের মধ্যে সরাসরি আলোচনা চলছিল। সেই আলোচনার ফল হিসেবেই এ চুক্তি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রও এতে স্বাক্ষরকারী পক্ষ। রুবিও জানিয়েছেন, এ কাঠামো দীর্ঘমেয়াদি শান্তি ও নিরাপত্তার ভিত্তি তৈরি করবে।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, দক্ষিণ লেবাননের বড় একটি অংশে এখনো ইসরায়েলি বাহিনী অবস্থান করছে এবং চুক্তিতে তাদের তাৎক্ষণিক সরে যাওয়ার বাধ্যবাধকতা নেই।
চুক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো, মূলত হিজবুল্লাহর নিরস্ত্রীকরণ এবং লেবাননের সার্বভৌমত্ব ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া ধাপে ধাপে সাজানো। প্রথম ধাপে, দক্ষিণ লেবাননে দুটি ‘পাইলট জোন’ বা পরীক্ষামূলক এলাকা চিহ্নিত করা হয়েছে। সেখান থেকে ইসরায়েলি সেনা সরানোর শর্ত হিসেবে লেবাননের সেনাবাহিনী ওই অঞ্চলে হিজবুল্লাহর সামরিক অবকাঠামো ধ্বংস ও তাদের নিরস্ত্রীকরণ নিশ্চিত করতে হবে। এরপরই কেবল ইসরায়েল পর্যায়ক্রমে তাদের সেনা প্রত্যাহার করবে এবং সাধারণ নাগরিকেরা সেখানে ফিরতে পারবেন।
তবে এই কাগজের চুক্তি মাঠে বাস্তবায়ন করা বিরাট এক চ্যালেঞ্জ। লেবাননের প্রধানমন্ত্রী নওয়াফ সালাম এবং প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন একে সার্বভৌমত্ব পুনরুদ্ধারের প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে দেখলেও, মূল সংকটের সমাধান এখনো অনেক দূরে। কারণ, যাদের নিরস্ত্রীকরণ নিয়ে এই চুক্তি, সেই হিজবুল্লাহই আলোচনার টেবিলে অনুপস্থিত ছিল।
হিজবুল্লাহর প্রধান নাঈম কাসেম স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, ইসরায়েলকে নিঃশর্তে লেবানন ছাড়তে হবে। হিজবুল্লাহর এক সংসদ সদস্য হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, লেবাননের সেনাবাহিনী যদি জোর করে এ চুক্তি বাস্তবায়ন করতে চায়, তবে দেশে গৃহযুদ্ধ শুরু হতে পারে।
অন্যদিকে ইসরায়েলও কঠোর অবস্থানে রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, হিজবুল্লাহ নিরস্ত্র না হওয়া পর্যন্ত এবং ইসরায়েলের জন্য হুমকি থাকলে সেনা প্রত্যাহার করা হবে না। অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোত্রিচ আরো এক ধাপ এগিয়ে বলেছেন, নিরাপদ সীমান্ত নিশ্চিত করতে প্রয়োজন হলে দীর্ঘ সময় লেবাননে অবস্থান করবে ইসরায়েল।
এতকিছুর মধ্যেও যুদ্ধ পুরোপুরি থামেনি। ১৯৪৮ সাল থেকে শুরু হওয়া দুই প্রতিবেশীর শত্রুতা এই চুক্তির মাধ্যমে শেষ হবে, নাকি এটি কেবলই নতুন কোনো সংঘাতের রূপরেখা হবে তা সময়ই বলে দেবে। দক্ষিণ লেবাননের বিভিন্ন এলাকায় ইসরায়েলি বিমান হামলা অব্যাহত রয়েছে। চুক্তি স্বাক্ষরের দিনও মাইফাদুনে হামলায় দুজন নিহত হন, নাবাতিয়েহ আল-ফাওকায়ও বিমান হামলা হয়। একই সময়ে হিজবুল্লাহ ও ইসরায়েলি বাহিনীর মধ্যে বিচ্ছিন্ন সংঘর্ষও চলেছে। ফলে কাগজে-কলমে নতুন কাঠামো তৈরি হলেও স্থায়ী শান্তির পথ এখনো অনিশ্চিত।