হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী সব পণ্যবাহী জাহাজের ওপর ২০ শতাংশ ফি আরোপের হুমকি থেকে সরে এসেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। একই সময়ে ইরানের বন্দরগুলোর ওপর ফের নৌ অবরোধ শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র। খবর বিবিসি।
ট্রাম্প জানান, ওই ফি আরোপের পরিবর্তে উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে ‘বিশাল’ বাণিজ্য ও বিনিয়োগ চুক্তি করা হবে। ইরানের বন্দর অবরোধ পুনরায় চালুর কয়েক ঘণ্টা আগে এ ঘোষণা আসে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে হামলা-পাল্টা হামলার পর হরমুজ প্রণালি দিয়ে ট্যাংকার চলাচল কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। এর ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দামও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) গতকাল দিবাগত রাতে জানায়, নতুন দফায় হামলা শুরু করেছে তাদের বাহিনী। বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে হামলার জন্য ব্যবহৃত ইরানের সক্ষমতা আরো দুর্বল করা এর লক্ষ্য।
এর আগে টানা তৃতীয় রাতেও একই উদ্দেশ্যে হামলা চালানোর কথা জানায় সেন্টকম। গতকাল ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম একাধিক শহরে বিস্ফোরণের খবর দেয়। এর মধ্যে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থাকা বুশেহর শহরও রয়েছে।
তেহরান দাবি করেছে, সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই)-এর দুটি ট্যাংকারে হামলার পর তারা বাহরাইন ও জর্ডানে অবস্থিত মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে।
চলমান এ হামলা-পাল্টা হামলা হরমুজ প্রণালির কৌশলগত গুরুত্বকে আরো স্পষ্ট করেছে। ইরানের অভিযোগ, হরমুজের ব্যবস্থাপনায় হস্তক্ষেপ করছে যুক্তরাষ্ট্র। অন্যদিকে এই প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারলে তেহরান বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপরও চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
গত সোমবার ট্রাম্প ঘোষণা দেন, হরমুজ প্রণালির ‘অভিভাবক’ এখন যুক্তরাষ্ট্র। এ জলপথে চলাচলকারী সব পণ্যবাহী জাহাজের ওপর ২০ শতাংশ ফি আরোপের মাধ্যমে নিরাপত্তা ব্যয় আদায় করা হবে।
তিনি আরো জানান, ইরানের দুর্বল অর্থনীতির ওপর চাপ বাড়াতে দেশটির বিরুদ্ধে ফের নৌ অবরোধ আরোপ করবে যুক্তরাষ্ট্র।
পরে নিজের মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প লেখেন, ‘২০ শতাংশ যুক্তরাষ্ট্র ক্ষতিপূরণ ফি-এর পরিবর্তে আমি বিভিন্ন উপসাগরীয় দেশের সঙ্গে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ চুক্তির সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’
তিনি আরোও বলেন, ‘এসব বিনিয়োগ হবে বিশাল আকারের। একই সঙ্গে তা ওই দেশগুলো এবং তাদের ভবিষ্যতের জন্যও অত্যন্ত উপকারী হবে।’ তবে এ বিষয়ে তিনি আর কোনো বিস্তারিত তথ্য দেননি।
ট্রাম্প আরো দাবি করেন, ‘ইরান ছাড়া সব জাহাজের জন্য হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত’ এবং ‘মার্কিন সামরিক বাহিনীর অসাধারণ শক্তির কারণে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি জ্বালানি তেল পরিবহন হচ্ছে।’
পরে ওয়াশিংটনে ইরাকের নতুন প্রধানমন্ত্রী আলি আল-জাইদির সঙ্গে বৈঠকের পর ট্রাম্প বলেন, ‘আমি ফি আরোপের ধারণা পছন্দ করি না। তবে একই সঙ্গে পুরো বিশ্বের জন্য আমরা এই প্রণালি রক্ষা করব, অথচ কিছুই পাব না—এটাও ন্যায্য নয়।’
তিনি জানান, উপসাগরীয় বিভিন্ন দেশের নেতাদের কাছ থেকে অসংখ্য ফোন পাওয়ার পর তিনি ফি আরোপের পরিকল্পনা পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেন।
ট্রাম্পের ঘোষণার জবাবে ইরান জানায়, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতেই থাকবে।
ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গরিবাবাদি বলেন, ট্রাম্পের নতুন অবরোধের সিদ্ধান্ত ‘এক অর্থে’ দুই দেশের মধ্যে আগে হওয়া যুদ্ধবিরতি চুক্তিকে ভেঙে দিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র প্রথম ইরানের সব বন্দরের ওপর নৌ অবরোধ আরোপ করে গত এপ্রিলে। প্রায় পাঁচ সপ্তাহ পর মার্কিন সামরিক বাহিনী জানায়, অবরোধের কারণে তারা ১০০টি বাণিজ্যিক জাহাজের গতিপথ পরিবর্তনে বাধ্য করেছে এবং চারটি জাহাজ অচল করে দিয়েছে।
গত মাসে দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত একটি সমঝোতা স্মারকের অংশ হিসেবে অবরোধ তুলে নেয়া হয়েছিল। ওই চুক্তির লক্ষ্য ছিল সংঘাতের অবসান ঘটানো। তবে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ এখন দুই দেশের প্রধান মতবিরোধের বিষয় হয়ে উঠেছে।
এদিকে জাহাজ চলাচলের তথ্যানুযায়ী, হরমুজ প্রণালি দিয়ে নৌযান চলাচল গত দুই মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। একই সঙ্গে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ব্রেন্টের দামও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।