রয়টার্স এক্সক্লুসিভ

দ. আফ্রিকায় ট্রাম্পের শরণার্থী কর্মসূচি কি শুধু শ্বেতাঙ্গদের জন্য, প্রশ্ন কূটনীতিকদের

দীর্ঘদিন ধরেই ডানপন্থী মহলে ছড়িয়ে পড়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার শ্বেতাঙ্গরা কৃষ্ণাঙ্গ সংখ্যাগরিষ্ঠের হাতে নিপীড়নের শিকার।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে হোয়াইট হাউসে ফিরে এসে অভিবাসন নিয়ন্ত্রণকে অগ্রাধিকার দিয়ে বিশ্বব্যাপী শরণার্থী গ্রহণ প্রক্রিয়ায় অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিতাদেশ দেন। পরে তিনি ঘোষণা দেন, শুধুমাত্র তারাই যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয় পাবে, যারা দেশটির সংস্কৃতিতে পুরোপুরি আত্মস্থ হতে পারবে।

জুলাই মাসের শুরুতে দক্ষিণ আফ্রিকায় নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ কূটনীতিক একটি বিতর্কিত প্রশ্ন নিয়ে ওয়াশিংটনে যোগাযোগ করেন— ট্রাম্প প্রশাসনের শরণার্থী কর্মসূচিতে কি অশ্বেতাঙ্গ দক্ষিণ আফ্রিকানরাও আবেদন করতে পারবেন, যদি তারা অন্য যোগ্যতা পূরণ করে থাকেন?

২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জারি করা নির্বাহী আদেশে বলা হয়, এই শরণার্থী কর্মসূচিটি দক্ষিণ আফ্রিকার ‘আফ্রিকানা জনগোষ্ঠীর জন্য, যারা অন্যায় জাতিগত বৈষম্যের শিকার’। আফ্রিকানাররা মূলত ডাচ বংশোদ্ভূত শ্বেতাঙ্গ জনগোষ্ঠী, যারা আফ্রিকান ভাষায় কথা বলেন।

৮ জুলাই পাঠানো এক কূটনৈতিক তারবার্তায় দক্ষিণ আফ্রিকায় নিযুক্ত চার্জ দ্য’অ্যাফেয়ার্স ডেভিড গ্রিন জানতে চান, আফ্রিকান ভাষাভাষী ‘রঙিন’ বা অশ্বেতাঙ্গ দক্ষিণ আফ্রিকানদের আবেদন গ্রহণযোগ্য হবে কিনা, যাদের অনেকেই জাতিগত বৈষম্যের শিকার বলে দাবি করছেন। দক্ষিণ আফ্রিকায় রঙিন বা মিশ্র বর্ণ ধরনের শব্দটি ঐতিহাসিকভাবে বর্ণবাদী শাসনব্যবস্থার যুগ থেকেই ব্যবহৃত হয়ে আসছে। বিশেষ জাতিগত শ্রেণিকে এই শব্দ দিয়ে প্রকাশ করা হয় যা এখনো সরকারিভাবে বিদ্যমান।

দু'দিন পর যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের শরণার্থী ও অভিবাসন ব্যুরোর প্রধান কর্মকর্তা স্পেনসার ক্রেতিয়াঁ এক ইমেইলে জানান, এই কর্মসূচিটি শ্বেতাঙ্গদের জন্য নির্দিষ্ট। ইমেইলের ভাষা স্বাধীনভাবে যাচাই করা না গেলেও বিষয়টির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তিনটি সূত্র রয়টার্সকে বিষয়বস্তুর কথা নিশ্চিত করেছে।

এর জবাবে ১৮ জুলাই মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানায়, এই নীতির আওতা ক্রেতিয়াঁর বক্তব্যের চেয়ে বিস্তৃত, এবং তাদের অফিসিয়াল নীতিতে বলা আছে— 'আবেদনকারীরা আফ্রিকানা জাতিগোষ্ঠীর সদস্য অথবা দক্ষিণ আফ্রিকার অন্য কোনো জাতিগত সংখ্যালঘু হতে হবে।‘

এই অভ্যন্তরীণ আলোচনা আগে প্রকাশ না পেলেও এখন উঠে আসছে এক জটিল বাস্তবতা—কীভাবে একটি শ্বেতাঙ্গভিত্তিক শরণার্থী নীতি জাতিগতভাবে বৈচিত্র্যপূর্ণ একটি দেশের প্রেক্ষাপটে বাস্তবায়ন করা যায়।

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত ৮৮ জন দক্ষিণ আফ্রিকানকে এই কর্মসূচির আওতায় যুক্তরাষ্ট্রে পুনর্বাসন করা হয়েছে। তাদের মধ্যে প্রথম দফায় মে মাসে ৫৯ জন যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছায়। আগস্টের মধ্যে আরো ১৫ জন আসবেন বলে জানানো হয়েছে।

ভার্জিনিয়ার ডালেস আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রথম দফা যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছানো শ্বেতাঙ্গ দক্ষিণ আফ্রিকান শরণার্থীরা। ছবি- রয়টার্স

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে হোয়াইট হাউসে ফিরে এসে অভিবাসন নিয়ন্ত্রণকে অগ্রাধিকার দিয়ে বিশ্বব্যাপী শরণার্থী গ্রহণ প্রক্রিয়ায় অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিতাদেশ দেন। পরে তিনি ঘোষণা দেন, শুধুমাত্র তারাই যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয় পাবে, যারা দেশটির সংস্কৃতিতে পুরোপুরি আত্মস্থ হতে পারবে।

তিন সপ্তাহ পর এক নির্বাহী আদেশে ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্র দক্ষিণ আফ্রিকান আফ্রিকানারদের পুনর্বাসন করবে। কারণ তারা জাতিগতভাবে বৈষম্যপূর্ণ ভূমি মালিকদের বিরুদ্ধে সহিংসতার শিকার। দক্ষিণ আফ্রিকা সরকার এই বক্তব্যের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছে দাবি করেছে, এসব বক্তব্য অনেক ক্ষেত্রে দক্ষিণপন্থী চক্রের প্রচারণার অংশ।

ডেভিড গ্রিন তার তারবার্তায় দক্ষিণ আফ্রিকার বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর বর্ণনা দিয়ে আফ্রিকানার, রঙিন, খোইসান ও ইহুদি সম্প্রদায়ের বিষয় তুলে ধরেন। তবে ইহুদিদের দক্ষিণ আফ্রিকায় ধর্মীয় সংখ্যালঘু হিসেবে বিবেচনা করা হয়, জাতিগত সংখ্যালঘু হিসেবে নয়।

তিনি লেখেন, ‘পরবর্তী নির্দেশনা না পাওয়া পর্যন্ত আমরা জাতিগত নিপীড়নের নির্ভরযোগ্য অভিযোগ থাকলে অন্যান্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের আবেদনগুলোও বিবেচনা করব।‘

রয়টার্সের সূত্র মতে, কমপক্ষে একটি ‘রঙিন’ পরিবার এরইমধ্যে শরণার্থী হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করেছে।

এই বিতর্ক ট্রাম্প প্রশাসনকে তাদের নীতির ব্যাখ্যা স্পষ্ট করতে বাধ্য করেছে— কেবল শ্বেতাঙ্গদের জন্যই এই কর্মসূচি, নাকি নিপীড়নের শিকার অন্য জাতিগত সংখ্যালঘুরাও এর আওতায় আসবে।

দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবাদী শাসনব্যবস্থা ১৯৯৪ সালে গণতান্ত্রিক নির্বাচনের মাধ্যমে শেষ হয়। ২০২২ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, দেশটির ৮১% মানুষ কৃষ্ণাঙ্গ, ৮% রঙিন, ৩% ভারতীয় ও ৭% শ্বেতাঙ্গ। তবে এই ৭% শ্বেতাঙ্গ জনগোষ্ঠীর দখলে রয়েছে দেশের প্রায় ৭৫% বেসরকারি জমি।

মে মাসে এক প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, ‘আমি আফ্রিকানারদের বিশেষ সুবিধা দিচ্ছি না। তারা সাদা হলেও সেটি কোনো বিষয় না। সাদা বা কালো হওয়া আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয়।‘

হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা বলেন, এই নীতির ভিত্তি ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশ, যেখানে বলা হয়েছে— ‘আমরা দক্ষিণ আফ্রিকার নাগরিকদের—আফ্রিকানার এবং অন্যান্য জাতিগত সংখ্যালঘুদের অগ্রাধিকার দেব, যাদের দক্ষিণ আফ্রিকার বৈষম্যমূলক আইনের কারণে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।‘

দীর্ঘদিন ধরেই ডানপন্থী মহলে ছড়িয়ে পড়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার শ্বেতাঙ্গরা কৃষ্ণাঙ্গ সংখ্যাগরিষ্ঠের হাতে নিপীড়নের শিকার। ইলন মাস্কের মতো প্রভাবশালী দক্ষিণ আফ্রিকান বংশোদ্ভূতরাও এমন অভিযোগ তুলে ধরেছেন।

তবে দক্ষিণ আফ্রিকা সরকার এসব অভিযোগ এবং তথাকথিত ‘শ্বেতাঙ্গ গণহত্যার’ দাবি সরাসরি অস্বীকার করেছে। তাছাড়া দেশটিতে জাতিগত সহিংসতা ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়ারও কোনো প্রমাণ নেই।

গত মে’তে দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসার সঙ্গে এক উত্তপ্ত বৈঠকে ট্রাম্প ডেমোক্র্যাটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোর একটি ভিডিও দেখিয়ে সেটিকে দক্ষিণ আফ্রিকায় শ্বেতাঙ্গ গণহত্যার প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করেন।

আরও