ব্রাজিলের রাজনীতিতে প্রভাব ধরে রাখতে যুক্তরাষ্ট্রকে রাজনৈতিক ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট জাইর বলসোনারোর পরিবারের সদস্য ও ঘনিষ্ঠ মিত্ররা। নিজ দেশে আইনি জটিলতার মুখে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করে মার্কিন রক্ষণশীল রাজনীতিক, গণমাধ্যম ও প্রবাসী ব্রাজিলীয়দের মাধ্যমে নিজেদের বক্তব্য ছড়িয়ে দিচ্ছেন তারা। এ কৌশল ব্রাজিলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বিদেশী চাপ বাড়ানোর পাশাপাশি বলসোনারো পরিবারের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি করছে।
ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভার কাছে পরাজয়ের তিন দিন পর গত বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের মায়ামিতে পৌঁছান সিনেটর ফ্লাভিও বলসোনারো। এর আগে মঙ্গলবার স্ত্রী ও দুই মেয়েকে নিয়ে আর্জেন্টিনায় যান তিনি। সেখান থেকে ইকুয়েডরে যাত্রাবিরতি দিয়ে প্রাইভেট জেটে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় পৌঁছান। নির্বাচনের পরদিন ব্রাজিলের সুপ্রিম কোর্ট তার পাসপোর্ট জমা দেয়ার এবং দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞার নির্দেশ দিয়েছিল। বিচারপতি আলেক্সান্দ্রে দে মোরায়েসের ভাষ্য ছিল, ফ্লাভিওর পালিয়ে যাওয়ার ‘সুনির্দিষ্ট ঝুঁকি’ রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার আগে ফ্লাভিও আদালতের নির্দেশ মেনে চলার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। রাজনৈতিক নিপীড়নের শিকার হওয়ার অভিযোগও তুলেছিলেন তিনি। তবে আদালতের নিষেধাজ্ঞার পরপরই তার দেশত্যাগের ঘটনায় বিচার এড়ানোর সন্দেহ তৈরি হয়েছে। ফ্লাভিও বর্তমানে ব্রাজিলের সর্বোচ্চ আদালতে দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের অভিযোগে তদন্তের মুখে রয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছে গত বুধবার প্রকাশিত তিন পৃষ্ঠার বিবৃতিতে নিজেকে ‘ব্রাজিলের নেতা’ ঘোষণা করেন ফ্লাভিও। নির্বাচনে পরাজয়ের পরও তিনি ভোট কারচুপির অভিযোগ পুনর্ব্যক্ত করেন, যদিও এর পক্ষে কোনো প্রমাণ দেননি। যুক্তরাষ্ট্র থেকেই ব্রাজিলের বিরোধী দলগুলোর নেতৃত্ব দেয়ার অঙ্গীকার করেন তিনি। দেশত্যাগের পরিকল্পনায় সমর্থনের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেইকে ধন্যবাদও জানান।
নির্বাচনে জয়ী লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা। ছবি: রয়টার্স
যুক্তরাষ্ট্র কেন বলসোনারো-ঘনিষ্ঠদের ঘাঁটি
ফ্লাভিওর ভাই এদুয়ার্দো বলসোনারো ২০২৫ সালের শুরু থেকে যুক্তরাষ্ট্রে রয়েছেন। রাজনৈতিক নিপীড়নের অভিযোগ তুলে সেখানে যাওয়ার পর জুলাইয়ে স্থায়ী বসবাসের অনুমতি পান তিনি। ব্রাজিলের সুপ্রিম কোর্ট তাকে চার বছর দুই মাসের কারাদণ্ড দিয়েছেন। বাবার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের মামলার বিচারকদের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে মার্কিন কর্মকর্তাদের প্রভাবিত করার দায়ে তাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। চলতি মাসে তার গ্রেফতারের নির্দেশও দেয়া হয়েছে।
ব্রাজিলের সাবেক গোয়েন্দাপ্রধান ও কংগ্রেস সদস্য আলেক্সান্দ্রে রামাজেমও যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছেন। ২০২২ সালের নির্বাচন পাল্টে দেয়ার ষড়যন্ত্রে ভূমিকার অভিযোগে বিচার চলার সময় গত বছরের সেপ্টেম্বরে গায়ানা হয়ে ব্রাজিল ছাড়েন তিনি। দোষী সাব্যস্ত হওয়ার দিন যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছান রামাজেম। ব্রাজিলের রক্ষণশীল ভাষ্যকার অ্যালান দোস সান্তোস ও পাওলো ফিগেইরেদোও যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক ও গণমাধ্যমভিত্তিক অবস্থান তৈরি করেছেন।
যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ২০ লাখ ব্রাজিলীয় বসবাস করেন, যা ব্রাজিলের বাইরে দেশটির সবচেয়ে বড় জনগোষ্ঠী। দেশটির নির্বাচনী তথ্যানুযায়ী, ২০১০, ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২২ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দ্বিতীয় দফায় যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত ব্রাজিলীয় ভোটাররা ডানপন্থী প্রার্থীদের সমর্থন করেছিলেন। এবারের নির্বাচনে ফ্লাভিও সেখানে বৈধ ভোটের প্রায় ৬৩ শতাংশ পেয়েছেন।
জাইর বলসোনারো ও ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট থাকার সময় দুই দেশের রক্ষণশীল রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলোর সম্পর্কও ঘনিষ্ঠ হয়। জাতীয়তাবাদী ও সামাজিকভাবে রক্ষণশীল অবস্থানের কারণে তাদের রাজনৈতিক আন্দোলনের মধ্যে আদর্শিক মিল রয়েছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করে বলসোনারো-ঘনিষ্ঠরা প্রভাবশালী মার্কিন রাজনীতিকদের কাছে পৌঁছানো, রক্ষণশীল গণমাধ্যমে নিজেদের বক্তব্য প্রচার এবং প্রবাসী ব্রাজিলীয়দের সংগঠিত করার সুযোগ পাচ্ছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক তেরেসা ক্রিস্তিনা স্নাইডার মার্কেসের মতে, নির্বাসন এখন আর রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতার সমার্থক নয়; সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও গণমাধ্যমের সাহায্যে এটি আন্তর্জাতিক পরিসরে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের কৌশল হয়ে উঠেছে।
জাইর বলসোনারো। ছবি: রয়টার্স
ব্রাজিলের রাজনীতিতে বিদেশী চাপের আশঙ্কা
বলসোনারো-ঘনিষ্ঠদের কৌশলের একটি লক্ষ্য হলো ওয়াশিংটনে ব্রাজিলের বিষয়ে মার্কিন নীতিকে প্রভাবিত করা। পাশাপাশি মার্কিন রক্ষণশীল গণমাধ্যম ও পডকাস্টে ব্রাজিলের বিচারব্যবস্থার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক নিপীড়নের অভিযোগ তুলে ধরা এবং প্রবাসী ব্রাজিলীয়দের মাধ্যমে সেই বক্তব্য ছড়িয়ে দেয়া। ফ্লোরিডার ইয়েস ব্রাজিল ও ম্যাসাচুসেটসের কনগ্রেসো কনজারভাদর ব্রাজিলেইরোর মতো সংগঠন এ ক্ষেত্রে সমর্থক, রাজনীতিক ও অভিবাসীদের মধ্যে সংযোগ তৈরি করছে।
গবেষকদের ভাষায়, বিদেশী মিত্রদের সহায়তায় দেশের অভ্যন্তরীণ প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টির এ কৌশলকে বলা হয় ‘বুমেরাং প্রভাব’। অর্থাৎ, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিরোধের সমাধান বা সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে আন্দোলনকারীরা আন্তর্জাতিক সমর্থন কাজে লাগান।
ট্রাম্প একাধিকবার ব্রাজিলের বিচারব্যবস্থার সমালোচনা করেছেন। অভ্যুত্থান ষড়যন্ত্রের মামলায় জাইর বলসোনারোকে গত বছর কারাদণ্ড দেয়া হয়। ওই সময় ব্রাজিলের পণ্যে সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপের বিষয়ে বিচারকে কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন ট্রাম্প। তার প্রশাসন ব্রাজিলের বিচার বিভাগের কর্মকর্তাদের ওপর নিষেধাজ্ঞাও দেয়। রয়টার্সের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্রাজিলে বলসোনারো পরিবারকে আবার ক্ষমতায় ফেরাতে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের দুই জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা উদ্যোগ নিয়েছিলেন।
ট্রাম্প গত বুধবার নিশ্চিত করেন, তার প্রশাসন ফ্লাভিওকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের অনুমতি দিয়েছে। তবে তিনি ও তার পরিবারের সদস্যরা কী ধরনের ভিসা পেয়েছেন, ফ্লাভিও রাজনৈতিক আশ্রয় চাইবেন কিনা, তা স্পষ্ট নয়। যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের অনুমতির অর্থ রাজনৈতিক আশ্রয় পাওয়ার যোগ্যতা অর্জন করা নয়; এতে প্রত্যর্পণ থেকেও সুরক্ষা নিশ্চিত হয় না।
বিশ্লেষকদের মতে, বলসোনারো-ঘনিষ্ঠদের রাজনৈতিক নিপীড়নের অভিযোগ ট্রাম্পের প্রশাসনের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পেলে ব্রাজিলের প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর চাপ বাড়তে পারে। তবে লুলাকে কর্তৃত্ববাদী হিসেবে তুলে ধরা ডানপন্থীদের জন্য সহজ নয়। তিনি বিদেশে গ্রহণযোগ্য এবং ২০১৮ সালে কারাবন্দি হওয়ার সময় আদালতের সিদ্ধান্ত মেনে নিয়েছিলেন।
বলসোনারো পরিবারের কৌশল কতটা কার্যকর হবে
নির্বাচনে প্রায় ৬ কোটি ভোট পেলেও ফ্লাভিওর আকস্মিক দেশত্যাগ তার নিজের দলের নেতাদেরও বিস্মিত করেছে। প্রচারাভিযানের সমন্বয়ক সিনেটর রোজেরিও মারিনো জানিয়েছেন, ফ্লাভিওর বিদেশযাত্রার পরিকল্পনা সম্পর্কে দলীয় নেতাদের জানানো হয়নি।
জাইর বলসোনারো গৃহবন্দি অবস্থায় কারাদণ্ড ভোগ করছেন, আর তার দুই ছেলে যুক্তরাষ্ট্রে। এতে ব্রাজিলের ডানপন্থী রাজনীতিতে বিকল্প নেতৃত্বের সুযোগ তৈরি হতে পারে। বিশ্লেষক মার্কেসের মতে, ফ্লাভিও যেভাবে আদালতের নির্দেশের পর দেশ ছেড়েছেন, তাতে বিচার এড়ানোর ধারণা জোরালো হয়েছে। এতে তার রাজনৈতিক কৌশলের গ্রহণযোগ্যতা কমতে পারে এবং অন্য রক্ষণশীল নেতারা বলসোনারো পরিবার থেকে দূরত্ব তৈরির সুযোগ পেতে পারেন।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান ফ্লাভিও ও এদুয়ার্দোর আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক প্রভাব বাড়াতে পারে। তবে তাদের দেশে ফেরার ক্ষেত্রে আইনি ঝুঁকি রয়েছে। ব্রাজিল ফ্লাভিওর প্রত্যর্পণ চাইলে এ বিরোধ দীর্ঘ আন্তর্জাতিক আইনি লড়াইয়ে গড়াতে পারে।
ফলে বলসোনারো পরিবারের সামনে দ্বিমুখী পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক ঘাঁটি গড়ে তারা ব্রাজিলের রাজনীতিতে প্রভাব ধরে রাখার চেষ্টা করছেন। একইসঙ্গে বিদেশী সমর্থনের ওপর নির্ভরতা, বিচার এড়ানোর অভিযোগ এবং নিজেদের দলের ভেতরে বিকল্প নেতৃত্বের উত্থান তাদের রাজনৈতিক অবস্থানকে দুর্বলও করে দিতে পারে।
সিএনএন অবলম্বনে