বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কারগুলোর একটি নোবেল। প্রতি বছর পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, চিকিৎসা, সাহিত্য ও শান্তিতে অসামান্য অবদানের জন্য ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে এ পুরস্কার দেয়া হয়। নোবেল বিজয়ীদের নিয়ে খবর প্রকাশের সময় একটি শব্দ প্রায়ই চোখে পড়ে—‘লরিয়েট’। সাধারণভাবে ‘বিজয়ী’ বোঝাতে ‘উইনার’ বলা হলেও নোবেল পুরস্কারের ক্ষেত্রে ‘লরিয়েট’ শব্দটিই বেশি ব্যবহৃত হয়। এর পেছনে রয়েছে হাজার বছরের পুরনো এক ইতিহাস।
‘লরিয়েট’ শব্দটির শিকড় প্রাচীন গ্রিসে। শব্দটি এসেছে ‘লরেল’ নামের একটি উদ্ভিদ থেকে। প্রাচীন গ্রিক সংস্কৃতিতে লরেল গাছ ও এর পাতা ছিল বিশেষ মর্যাদার প্রতীক। সেই যুগে অলিম্পিকের মতো ক্রীড়া প্রতিযোগিতা কিংবা কবিতা বা জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রতিযোগিতায় যারা সেরা হতেন, তাদের মাথায় পরিয়ে দেয়া হতো লরেল পাতার মুকুট। এটি ছিল সাফল্য, মেধা ও সম্মানের প্রতীক।
লরেল পাতার সঙ্গে সম্মানের এই সম্পর্ক আরো শক্তিশালী হয় গ্রিক পুরাণের দেবতা অ্যাপোলোর কারণে। কাব্য, সংগীত, শিল্প ও ভবিষ্যদ্বাণীর দেবতা অ্যাপোলোকে মাথায় লরেল পাতার মুকুট পরা অবস্থায় চিত্রিত করা হতো। পরে শিল্প, সাহিত্য ও জ্ঞানচর্চায় অসাধারণ অবদান রাখা ব্যক্তিদের সম্মান জানাতেও লরেল মুকুট ব্যবহারের প্রচলন হয়।
সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে ‘লরিয়েট’ শব্দটি বিশেষ মর্যাদার একটি উপাধিতে পরিণত হয়। কোনো ব্যক্তি কোনো নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে অসাধারণ সাফল্য অর্জন করলে তাকে ‘লরিয়েট’ বলা হতে থাকে। সেই ঐতিহ্যই পরে নোবেল পুরস্কারের ক্ষেত্রেও জায়গা করে নেয়।
নোবেল কমিটির অফিসিয়াল ব্যাখ্যা অনুযায়ী, নোবেল পুরস্কার কোনো সাধারণ খেলাধুলা বা প্রতিযোগিতায় প্রথম হওয়া কিংবা ট্রফি জেতার বিষয় নয়। এটি মূলত মানবজাতির সার্বিক কল্যাণে নিঃস্বার্থ ও অসামান্য অবদান রাখার এক সর্বোচ্চ স্বীকৃতি। তাই সাধারণ ‘বিজয়ী’ শব্দের চেয়ে ঐতিহ্য ও মর্যাদার সঙ্গে যুক্ত ‘লরিয়েট’ শব্দটিই বেশি উপযুক্ত বলে বিবেচিত হয়েছে।
‘নোবেল লরিয়েট’ বলতে শুধু একজন ব্যক্তিকে বোঝায় না। ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান—উভয়ের ক্ষেত্রেই শব্দটি ব্যবহার করা হয়। নোবেল ফাউন্ডেশনের ১৯০১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন ক্ষেত্রে মোট ৬৩৩ বার নোবেল পুরস্কার দেয়া হয়েছে। এসব পুরস্কার পেয়েছেন মোট ১ হাজার ২৬ জন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান।
লরিয়েটদের জন্য সম্মাননা শুধু একটি উপাধিতেই সীমাবদ্ধ নয়। প্রতি বছর ১০ ডিসেম্বর, আলফ্রেড নোবেলের মৃত্যুবার্ষিকীতে সুইডেনের স্টকহোম ও নরওয়ের অসলোতে আনুষ্ঠানিকভাবে নোবেল পুরস্কার দেয়া হয়। এ সময় বিজয়ীদের হাতে তুলে দেয়া হয় ১৮ ক্যারেট সোনার মেডেল, বিশেষভাবে তৈরি সনদপত্র এবং পুরস্কারের অর্থ পাওয়ার নথি।
অর্থাৎ, হাজার বছর আগে গ্রিসের বিজয়ীদের মাথায় পরানো লরেল পাতার মুকুট থেকে যে শব্দের যাত্রা শুরু, আজও সেই ‘লরিয়েট’ নামেই বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কারের বিজয়ীদের পরিচয় দেয়া হয়।