এক দশকের বেশি সময় ধরে চলা যুদ্ধের মধ্যে নতুন করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ায় ইয়েমেনে শিশুদের খাদ্যসংকট আরো তীব্র হয়েছে। অনেক পরিবারকে দিনে তিন বেলার পরিবর্তে দুই বেলা, কখনো এক বেলা খেয়ে থাকতে হচ্ছে। যুদ্ধ ও বাস্তুচ্যুতির কারণে খাবারের পাশাপাশি পানি, চিকিৎসা ও আশ্রয় সংকটে পড়েছে হাজারো শিশু। সেপ্টেম্বরের শুরুতে নতুন করে সংঘাত শুরুর পর প্রায় ১ লাখ ৩৪ হাজার মানুষ ঘর ছেড়ে পালিয়েছে। তাদের মধ্যে আনুমানিক ৭৩ হাজার শিশু।
তায়েজ শহরের একটি কক্ষে স্ত্রী ও পাঁচ সন্তানকে নিয়ে বসবাস করেন ৪৬ বছর বয়সী শিক্ষক মোহাম্মদ সাঈদ। কয়েক বছর ধরে তিনি বেতন পাননি। ইয়েমেনের যুদ্ধ শুরুর পর তিন থেকে চারবার বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। এক বছরের বেশি সময় ধরে বাড়িভাড়াও দিতে পারেননি। আল জাজিরাকে সাঈদ বলেন, ‘আমরা এখন আর তিন বেলা খাই না। হয়তো দুই বেলা, কখনো এক বেলা।’
সন্তানেরা এখনো খাবারের সময় বাবাকে ডাকতে আসে। কিন্তু অনেক সময় ক্ষুধার্ত থাকা সত্ত্বেও সাঈদ সন্তানদের বলেন, তিনি এরই মধ্যে খেয়ে নিয়েছেন বা তার পেট ভরা। সাঈদের পরিবারের খাদ্যসংকট সর্বশেষ সংঘাতের অনেক আগেই শুরু হয়েছিল। তবে সেপ্টেম্বরের শুরুতে নতুন করে লড়াই শুরু হওয়ার পর পরিস্থিতি আরো খারাপ হয়েছে।
২০১৪ সালে ইরান-সমর্থিত হুথিরা রাজধানী সানা দখল করার পর থেকে কার্যত বিভক্ত ইয়েমেন। দেশটির উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলের বেশির ভাগ এলাকা হুথিদের নিয়ন্ত্রণে। এসব অঞ্চলে দেশটির অধিকাংশ মানুষ বসবাস করে। আর দেশের দক্ষিণ ও পূর্বাঞ্চলের বেশির ভাগ এলাকা নিয়ন্ত্রণ করে সৌদি আরব সমর্থিত আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার।
৩ সেপ্টেম্বর হুথিরা তায়েজের পশ্চিমে বড় ধরনের অভিযান শুরু করলে সরকারি বাহিনীর সঙ্গে তাদের নতুন করে লড়াই শুরু হয়। কয়েক দিনের মধ্যে মোখায় প্রবেশ করে হুথি যোদ্ধারা। এরপর বাব আল-মান্দাব প্রণালি পর্যন্ত ইয়েমেনের প্রায় পুরো লোহিত সাগর উপকূলের নিয়ন্ত্রণ নেয় তারা। আন্তর্জাতিক নৌবাণিজ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রণালিটি একটি নৌপথের সংকীর্ণ প্রবেশদ্বার। এর জবাবে সৌদি আরব শত শত বিমান হামলা চালিয়েছে। হুথিরাও সৌদি ভূখণ্ডে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) জানিয়েছে, সর্বশেষ হামলায় আগস্টের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত ৮৩৮ জন নিহত এবং ৩ হাজার ৬০০ জনের বেশি মানুষ আহত হয়েছেন। অধিকাংশ হতাহত হয়েছে ৩ সেপ্টেম্বর স্থল অভিযান শুরুর পর। এ সময়ে অন্তত ১৫ শিশু নিহত ও ১৪ শিশু আহত হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে ইউনিসেফ।
২৫ বছর বয়সী রুক্কায়া সাঈদ আট সন্তানের মা। তায়েজের পশ্চিমে মাকবানাহ এলাকার জাঘার থেকে পালিয়ে তিনি এখন তায়েজ শহরের কাছে আল-শাকাদিফ শিবিরে আশ্রয় নিয়েছেন। হুথিদের অভিযান শুরুর ওই এলাকায় রকেট ও গোলাবর্ষণের পাশাপাশি স্থলমাইনের আতঙ্কও ছিল। আশ্রয়ের জন্য একটি ত্রিপল কিনতে ঋণ নিয়েছিলেন তিনি। শিবিরে কোনো ত্রাণ সংস্থা তার পরিবারকে খাবার দেয়নি।
রুক্কায়ার সন্তানরাও অসুস্থ। শিশুদের ডায়রিয়া, সর্দি ও আমাশয় হয়েছে। তাদের জন্য সুপেয় পানি নেই। দূষিত পানি ও অপর্যাপ্ত স্যানিটেশনের মাধ্যমে ছড়ানো আমাশয় শিশুদের জন্য প্রাণঘাতী হতে পারে, বিশেষ করে পানিশূন্যতা দেখা দিলে। কিন্তু শিবিরে কোনো শৌচাগারও নেই।
জাতিসংঘের হিসাবে, প্রায় ৪ কোটি ৩০ লাখ মানুষের দেশ ইয়েমেনে ২০২৬ সালে ১ কোটি ৮৩ লাখের বেশি মানুষ তীব্র খাদ্যসংকটে রয়েছে। এর বড় একটি অংশ শিশু। সর্বশেষ সংঘাত শুরুর আগেই চলতি বছর পাঁচ বছরের কম বয়সী ২২ লাখের বেশি শিশুর তীব্র অপুষ্টিতে আক্রান্ত হতে পারে বলে সতর্ক করে ইউনিসেফ। এর মধ্যে পাঁচ লাখের বেশি শিশুর তীব্র অপুষ্টিতে আক্রান্ত হতে পারে, যা অপুষ্টির সবচেয়ে প্রাণঘাতী ধরন।