বাকিংহাম প্যালেসের দেয়ালে কি তবে ফাটল ধরতে শুরু করেছে? গত বৃহস্পতিবার যখন লন্ডন ফ্যাশন উইকের জমকালো মঞ্চে রাজা তৃতীয় চার্লস ডিজাইনারদের সঙ্গে সৌজন্য বিনিময় করছিলেন, তখন তার চেহারায় আভিজাত্যের হাসির আড়ালে হয়তো লুকিয়ে ছিল এক গভীর দুশ্চিন্তা। যে সময় রাজার মনোযোগ থাকার কথা ছিল রেশমি পোশাক আর আধুনিক ছাঁটের দিকে, ঠিক সেই মুহূর্তেই ১০০ মাইল দূরে স্যান্ড্রিংহামের শান্ত সকালে রচিত হচ্ছিল রাজপরিবারের এক কলঙ্কিত ইতিহাস।
সকাল ৮টা। সাধারণ পোশাকে পুলিশ কর্মকর্তারা হাজির হলেন উড ফার্মে। প্রিন্স অ্যান্ড্রু তখন হয়তো প্রাতঃরাশের টেবিলেই ছিলেন। কিন্তু নিয়তির পরিহাস, ৬৬তম জন্মদিনের ঠিক পরপরই তাকে আটক করা হয়। অভিযোগ— সরকারি পদের অপব্যবহার করে ব্যবসায়িক গোপন তথ্য পাচার। এক সময়ের দোর্দণ্ড প্রতাপশালী ‘এয়ারমাইলস অ্যান্ডি’ এখন পুলিশের জেরা আর ক্যামেরার ফ্ল্যাশের সামনে বিধ্বস্ত এক ছায়া মাত্র। সারা দিন কাটান পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে; সন্ধ্যায় বাইরে বেরোতে দেখা যায় এক ক্লান্ত, ভীত মানুষের মুখ।
দৃশ্যটি মুহূর্তে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। আরো এক অস্বস্তিকর ছবি যোগ হয় অ্যান্ড্রু–কেন্দ্রিক বিতর্কের গ্যালারিতে। বিশেষ করে ভার্জিনিয়া জিউফ্রিকে ঘিরে পুরনো যৌন নিপীড়নের অভিযোগের সঙ্গে অবধারিতভাবে আসে কুখ্যাত জেফ্রি এপস্টাইনের ছায়া।
কিং চার্লস জানেন, এ শুধু ব্যক্তিগত কেলেঙ্কারি নয়; এটি রাজতন্ত্রের স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও জনপ্রিয়তার প্রশ্নকে সরাসরি আঘাত করছে। গত এক দশকের সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে, রাজতন্ত্র বিলুপ্ত হওয়া ভাল—এমন মত বেড়ে দাঁড়িয়েছে এক-চতুর্থাংশের কাছাকাছি। অর্ধেকের বেশি মানুষ মনে করেন, আগামী ৫০ বছরে ব্রিটিশ রাজমুকুটের কোনো অস্তিত্ব থাকবে না। রাজকীয় আভিজাত্যের সেই মোহ বা 'ম্যাজিক' এখন জনসমক্ষে বিচার্য বিষয়। এমন সময়ে রাজপরিবারের আরেকটি বড় স্ক্যান্ডাল নিঃসন্দেহে বিপজ্জনক।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ১৬৪৭ সালে রাজা প্রথম চার্লসের বন্দিত্ব বা ১৯৩৬ সালের সিংহাসন ত্যাগের সংকটের চেয়েও এবারের পরিস্থিতি অনেক বেশি ভয়াবহ। কারণ, এটি সরাসরি রাজতন্ত্রের ‘পবিত্রতা’ এবং ‘স্বচ্ছতা’ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। এপস্টাইন ফাইল থেকে বেরিয়ে আসা একের পর এক তথ্য প্রমাণ করছে যে, ২০১৯ সালের বিবিসি সাক্ষাৎকারে অ্যান্ড্রু যা বলেছিলেন, তার অনেক কিছুই ছিল অসত্য।
কিং চার্লস বরাবরই চেয়েছিলেন রাজপরিবারকে ছোট এবং কার্যকর করতে। কিন্তু ভাই অ্যান্ড্রুর কেলেঙ্কারি সেই পরিকল্পনাকে তছনছ করে দিয়েছে। রানি এলিজাবেথ বেঁচে থাকতে প্রিয় ছেলেকে আগলে রেখেছিলেন, হয়তো রাজকোষের অর্থে মিটিয়েছিলেন তার দেনা। কিন্তু আজ চার্লস নিরুপায়। তিনি যখন ফ্যাশন শোতে ব্যস্ত, রাজকুমারী অ্যান তখন নির্লিপ্তভাবে লিডস কারাগার পরিদর্শনে। পরিবারের এক সদস্য যখন ডিউটি করছেন, অন্যজন তখন পুলিশি হেফাজতে—এ এক অদ্ভুত বৈপরীত্য।
অ্যান্ড্রু এখনো উত্তরাধিকারের তালিকায় অষ্টম স্থানে। কিন্তু যে কলঙ্কের কালি তিনি রাজপরিবারের গায়ে লেপে দিয়েছেন, তা থেকে মুক্তির পথ খুব একটা সহজ নয়। রাজতন্ত্র এখনও ভাঙছে না; তবে চাপে রয়েছে। ভবিষ্যত অনেকটাই নির্ভর করছে প্রিন্স উইলিয়ামের জনপ্রিয়তা ও জনবিশ্বাস ধরে রাখার ক্ষমতার ওপর। একের পর এক বিতর্কের যুগে, ব্রিটিশ রাজপরিবারকে নিজের জাদুর খোলস খুলে আরো অনিচ্ছাকৃত আলো সহ্য করতে হবে। যেমনটা বলেছিলেন ভিক্টোরীয় চিন্তাবিদ ওয়াল্টার বেইগহট— প্রতিষ্ঠানকে টিকে থাকতে হলে স্বচ্ছতার আলোকে ভয় পাওয়া চলবে না।
গল্পটা তাই দুই ভাইয়ের, কিন্তু এর পরিণতির ওপর নির্ভর করছে ব্রিটিশ রাজতন্ত্রের হাজার বছরের ইতিহাস।
দ্য গার্ডিয়ান অবলম্বনে