রাশিয়ার সম্ভাব্য হামলার শঙ্কায় প্রস্তুতি নিচ্ছে ইউরোপের বৃহত্তম বন্দর

গত জুনে ন্যাটোর মহাসচিব মার্ক রুট্টে সতর্ক করেন, ২০৩০ সালের মধ্যে রাশিয়া ন্যাটোর কোনো সদস্যদেশে হামলা চালাতে পারে।

নেদারল্যান্ডস ও ন্যাটো মিত্ররা জিডিপির ৫% পর্যন্ত প্রতিরক্ষা ব্যয় বৃদ্ধির অঙ্গীকার করেছে। গত মে মাসে ডাচ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ঘোষণা দেয়, ন্যাটোর অনুরোধে রটারড্যামকে বারবার সামরিক কার্গো বহনকারী একাধিক জাহাজ সামলানোর জায়গা রাখতে হবে।

রাশিয়ার সঙ্গে সম্ভাব্য সংঘাতের আশঙ্কায় ইউরোপের বৃহত্তম বন্দর রটারড্যাম বড় আকারের সামরিক রসদ পরিবহনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। এরই অংশ হিসেবে বিশেষভাবে সামরিক মালবাহী জাহাজের জন্য জায়গা সংরক্ষণ এবং যুদ্ধ শুরু হলে বাণিজ্যিক কার্গো কোথায় সরিয়ে নেয়া হবে, তার পরিকল্পনা করছে কর্তৃপক্ষ। খবর ফিন্যানশিয়াল টাইমস।

রটারড্যাম পোর্ট অথরিটির প্রধান নির্বাহী বোদেউইন সিমন্স ফিন্যানশিয়াল টাইমসকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে জানান, ব্রিটিশ, মার্কিন ও কানাডীয় বাহিনীর যানবাহন এবং রসদ এলে তা কীভাবে সামলানো হবে, সে বিষয়ে প্রতিবেশী অ্যান্টওয়ার্প বন্দরের সঙ্গে সমন্বয় করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, ‘সব টার্মিনাল সামরিক কার্গো পরিচালনার জন্য উপযুক্ত নয়। যদি বিপুল পরিমাণ সামরিক সরঞ্জাম পরিবহন করতে হয়, সেক্ষেত্রে আমরা অ্যান্টওয়ার্প বা অন্যান্য বন্দরে কিছু সক্ষমতা হস্তান্তর করব। একে অপরকে এখন আগের চেয়ে কম প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখি। অবশ্য যেখানে দরকার সেখানেই প্রতিযোগিতা করি। কিন্তু যেখানে পারি সেখানে একসঙ্গে কাজ করি।‘

রটারড্যামের এই উদ্যোগ ইউরোপজুড়ে যুদ্ধ প্রস্তুতির অংশ। ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) রাশিয়ার আগ্রাসন ঠেকাতে এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দাবি মেনে আত্মনির্ভরতা বাড়াতে ৮০০ বিলিয়ন ইউরোর পুনঃসশস্ত্রকরণ পরিকল্পনা প্রণয়ন করছে।

নেদারল্যান্ডস ও ন্যাটো মিত্ররা জিডিপির ৫% পর্যন্ত প্রতিরক্ষা ব্যয় বৃদ্ধির অঙ্গীকার করেছে। গত মে মাসে ডাচ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ঘোষণা দেয়, ন্যাটোর অনুরোধে রটারড্যামকে বারবার সামরিক কার্গো বহনকারী একাধিক জাহাজ সামলানোর জায়গা রাখতে হবে।

সিমন্স বলেন, বছরে চার-পাঁচবার কয়েক সপ্তাহ ধরে এক বা একাধিক জাহাজ নোঙর করা হবে। এই স্থান পরিবর্তনও হতে পারে। বন্দরের কন্টেইনার টার্মিনালই একমাত্র জায়গা যেখানে নিরাপদে জাহাজ থেকে জাহাজে গোলাবারুদ সরানো সম্ভব। বছরে কয়েকবার স্থল ও জলপথে যৌথ সামরিক মহড়াও হবে।

গালফ যুদ্ধে (২০০৩) রটারড্যাম বন্দরে বড় আকারের অস্ত্র সরবরাহ হয়েছিল। তবে শীতল যুদ্ধের সময়ও এখানে কোনো স্থায়ী সামরিক জেটি ছিল না। অন্যদিকে, অ্যান্টওয়ার্প বন্দর দিয়ে নিয়মিতভাবে ইউরোপে অবস্থানরত মার্কিন বাহিনীর রসদ রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়।

গত জুনে ন্যাটোর মহাসচিব মার্ক রুট্টে সতর্ক করেন, ২০৩০ সালের মধ্যে রাশিয়া ন্যাটোর কোনো সদস্যদেশে হামলা চালাতে পারে।

নেদারল্যান্ডসে ৪২ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে অবস্থিত রটারড্যাম বন্দর বছরে প্রায় ৪৩৬ মিলিয়ন টন মালামাল সামলায়। এখানে সমুদ্রপথে ২৮ হাজার এবং জার্মানি ও ইউরোপের অভ্যন্তর থেকে নদীপথে ৯১ হাজার জাহাজ আসে।

রাশিয়ার ওপর ইইউর আরোপিত নিষেধাজ্ঞার ফলে বন্দরের প্রায় ৮ শতাংশ বাণিজ্য কমে গেছে, যা মূলত তেল পরিবহনের ক্ষেত্রে ঘটেছে। অ্যান্টওয়ার্প বন্দরে বছরে ২৪০ মিলিয়ন টন পণ্য ওঠা-নামা করা হয়। এটি ইইউর দ্বিতীয় বৃহত্তম বন্দর। সিমন্স জানান, শুধু সামরিক রসদ নয়, ইউরোপের স্বনির্ভরতা বাড়াতে অ্যান্টওয়ার্পের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করছে রটারড্যাম।

কভিড-১৯ মহামারিতে ইউরোপীয় দেশগুলো চিকিৎসা সরঞ্জাম এবং ওষুধের জন্য চীন ও ভারতের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিল। সেই অভিজ্ঞতা আত্মনির্ভরতার প্রয়োজনীয়তাকে স্পষ্ট করেছে। সিমন্স বলেন, ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের পর হঠাৎ তেল সরবরাহ কমে যাওয়াও আরেকটি শিক্ষা। তিনি পরামর্শ দেন, ইউরোপীয় দেশগুলো যেন তেলের মতো অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামালও মজুত করে।

তিনি আরো বলেন, ‘তেলের জন্য আমাদের ৯০ দিনের মজুতের বাধ্যবাধকতা আছে। কিন্তু গ্যাসের জন্য তেমন কিছু নেই। আর কিছু গ্যাসক্ষেত্র থাকলেও কপার, লিথিয়াম, গ্রাফাইটের মতো কাঁচামাল এবং ওষুধ মজুত রাখার জন্য আমাদের আরো বিস্তৃত কৌশল প্রয়োজন। বন্দরের আশপাশের এলাকাগুলোতে ভালো সরবরাহ ব্যবস্থা রয়েছে। তাই সেসব এলাকায় এই ধরনের মজুত গড়ে তোলা সম্ভব।‘

আরও