লাংটাং উপত্যকায় ট্রেকিং এবং কৈলাস–মানস সরোবর যাত্রার প্রবেশপথ হিসেবে বছরজুড়ে মুখর থাকত এসব জনপদ। হিমবাহের কারণে সৃষ্ট মাত্র কয়েক মিনিটের বন্যা ও ভূমিধসে সে চিত্র পুরোপুরি বদলে দিয়েছে। নদী তীরের ব্যস্ত বাজার ও বসতিগুলো এখন কাদা, পাথর ও ভাঙা ভবনের ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। কোথাও কাদার ভেতর থেকে শুধু ভবনের ওপরের অংশ দেখা যাচ্ছে, কোথাও বাড়িঘর ও গাড়ির চিহ্ন পর্যন্ত নেই। ভবনের ভেতরে মরদেহ থাকার কথা জানলেও ঝুঁকির কারণে উদ্ধারকারীরা সেখানে পৌঁছতে পারছেন না। কাদামাখা সড়কে নিখোঁজ স্বজনদের নাম ধরে ডাকছেন কেউ, আবার কেউ ধ্বংসস্তূপ খুঁড়ে শেষ সম্বলটুকু খুঁজছেন। হিমবাহ ধসের ফলে সৃষ্ট হ্রদ থেকে গতকাল পানি উপচে পড়তে শুরু করে। এতে আতঙ্ক বিরাজ করছে স্থানীয় বাসিন্দাদের মাঝে। দুইদিন আগের আকস্মিক ভয়াবহ বন্যায় তছনছ হয়ে যাওয়া এলাকাগুলো আবার বিপর্যয়ের ঝুঁকিতে পড়েছে।
নেপালি পুলিশের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, শুক্রবার পর্যন্ত দেশটিতে ৫৭৯ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। আহত হয়েছেন অন্তত ১ হাজার ৪৭৩ জন। নেপালের জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ অবশ্য মৃতের সংখ্যা ৫৩৮ বলে জানিয়েছে। অন্যদিকে চীনের তিব্বতে সাতজনের মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। নেপালে এখনো অন্তত ১ হাজার ৪০০ ও তিব্বতে ছয় শতাধিক মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। সব মিলিয়ে নিখোঁজ মানুষের সংখ্যা দুই হাজারের বেশি। তাদের মধ্যে পাঁচ শতাধিক বিদেশী পর্যটক, পর্বতারোহী, শ্রমিক ও তীর্থযাত্রী রয়েছেন।
নিখোঁজদের সন্ধান ও আটকে পড়া মানুষকে উদ্ধারে নেপালে নতুন করে আরো ১ হাজার ২০০ সেনা সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। গতকাল পর্যন্ত দেশটিতে ৩ হাজার ৭০০ জনের বেশি মানুষকে উদ্ধার করা হয়েছে। দুর্গম ও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন এলাকা থেকে হেলিকপ্টারে সরিয়ে নেয়া হয়েছে অন্তত ৩ হাজার ২৫৩ জনকে। উদ্ধার হওয়া আহত ব্যক্তিদের কাঠমান্ডু ও আশপাশের হাসপাতাল এবং অস্থায়ী চিকিৎসা কেন্দ্রে পাঠানো হচ্ছে। তবে পুরু কাদা, ভেঙে যাওয়া সড়ক-সেতু এবং ভূমিধসের ঝুঁকির কারণে অনেক এলাকায় উদ্ধারকারী দল এখনো পৌঁছতে পারেনি।
উদ্ধারকাজের মধ্যেই নতুন করে বন্যার সতর্কতা জারি করেছে নেপালি পুলিশ। তিব্বতের দিকে একটি প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে যাওয়ার খবর পাওয়ার পর উদ্ধার ও ত্রাণকর্মীদের সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় থাকতে বলা হয়েছে। হিমবাহ ধসের পর পাথর, বরফ ও মাটি জমে গিরং সীমান্তবন্দর থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে নতুন একটি হ্রদ তৈরি হয়েছে। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ২ হাজার ৯৫০ মিটার ওপরে থাকা হ্রদটি শুক্রবার উপচে পড়তে শুরু করে। আরো এক দফা পানি ও ধ্বংসাবশেষ নেমে আসতে পারে—এ আশঙ্কায় সকালে দুর্গত এলাকার দিকে যাওয়া উদ্ধারকারী দলগুলোকে সাময়িকভাবে থামিয়ে দেয়া হয়। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদেরও দ্রুত উঁচু স্থানে চলে যেতে বলা হয়। পরে পরিস্থিতি কিছুটা স্থিতিশীল হলে উদ্ধার অভিযান আবার শুরু হয়।
তিব্বতের সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত গিরং এলাকায় পৌঁছতেই উদ্ধারকারীদের প্রচণ্ড বেগ পেতে হচ্ছে। সড়ক ও সেতু নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ায় প্রায় ৬৮০ উদ্ধারকর্মীকে পায়ে হেঁটে ও ভেলায় করে সেখানে পৌঁছতে হয়েছে। নেপালি পুলিশের মুখপাত্র অভি নারায়ণ কাফলে জানিয়েছেন, নতুন বন্যার ঝুঁকির মধ্যেও উদ্ধার অভিযান চলছে। তবে পরিস্থিতির পরিবর্তন হলে দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার প্রস্তুতি রাখা হয়েছে।
নেপালের রসুয়া জেলার আপার ত্রিশূলী-১ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের একটি সুড়ঙ্গে এখনো শতাধিক মানুষ আটকে আছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। এরই মধ্যে সুড়ঙ্গ থেকে শ্রমিক ও স্থানীয় বাসিন্দাসহ প্রায় ৩৫০ জনকে উদ্ধার করেছে সেনাবাহিনী। পুরু কাদা ও ধ্বংসাবশেষে সুড়ঙ্গের প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ ঢেকে যাওয়ায় ভেতরে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে। ভিডিওতে কাদায় পুরোপুরি ঢেকে যাওয়া এক ব্যক্তিকে টেনে ও ধাক্কা দিয়ে সুড়ঙ্গ থেকে বের করতে দেখা গেছে। নেপালি সেনাবাহিনীর মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল রাজা রাম বাসনেত বলেন, ‘সবকিছু কাদায় ঢাকা পড়ায় সুড়ঙ্গের প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ খুঁজে পাওয়া কঠিন। আমাদের প্রথম অগ্রাধিকার আটকে পড়া মানুষকে জীবিত উদ্ধার করা।’
ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব রেড ক্রস অ্যান্ড রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটিজের (আইএফআরসি) হিসাবে, এ দুর্যোগে অন্তত ৯৩ হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তাদের জন্য জরুরি খাবার, বিশুদ্ধ পানি, আশ্রয় ও চিকিৎসা সহায়তা প্রয়োজন। সংস্থাটি তাৎক্ষণিক জীবনরক্ষাকারী কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রায় ৩ কোটি ডলারের জরুরি সহায়তার আবেদন জানিয়েছে। নতুন করে বন্যা দেখা দিলে ক্ষয়ক্ষতি ও বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা আরো বাড়তে পারে বলে সতর্ক করেছেন নেপালে আইএফআরসির প্রতিনিধি দলের প্রধান ডেভিড ফিশার।
হিমালয়ের উঁচু এলাকায় হিমবাহের নিচের শিলাস্তর ধসে পড়ার পর বিপুল পরিমাণ পাথর ও বরফ নদীতে আছড়ে পড়েছিল বলে স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণ করে জানিয়েছেন বিজ্ঞানীরা। ধসটি এতটাই শক্তিশালী ছিল যে তা ৫ দশমিক ২ মাত্রার ভূকম্পনের সমতুল্য কম্পন সৃষ্টি করে। পাথর, বরফগলা পানি ও কাদা একসঙ্গে নিচের উপত্যকায় নেমে এসে ভবন, সেতু, সড়ক ও জনপদ ভাসিয়ে নিয়ে যায়।