যুক্তরাষ্ট্রের ‘অর্থনৈতিক ডি-ডে’

উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে সব জ্বালানি তেল রফতানি বন্ধের হুমকি ইরানের

মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট আজ বাংলাদেশ সময় রাত ১১টায় সংবাদ সম্মেলন করবেন। সেখানে ইরানের ওপর আরো কঠোর পদক্ষেপের ঘোষণা দেয়ার কথা রয়েছে। ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর থেকে প্রায় ধারাবাহিকভাবে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার মধ্যে রয়েছে তেহরান। এর মাঝেই দেশটির ওপর এবার আরো কঠোর চাপ প্রয়োগের প্রস্তুতি নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র

‘এ যাবৎকালের সবচেয়ে বড় আর্থিক অভিযান’— যুক্তরাষ্ট্রের এমন পদক্ষেপের বিপরীতে ইরানও হুমকি দিয়েছে। দেশটি বলছে, ‘অর্থনৈতিক যুদ্ধ’ চলতে থাকলে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে সব ধরনের জ্বালানি তেল রফতানি বন্ধ করে দেবে তারা। খবর রয়টার্স।

মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট আজ বাংলাদেশ সময় রাত ১১টায় সংবাদ সম্মেলন করবেন। সেখানে ইরানের ওপর আরো কঠোর পদক্ষেপের ঘোষণা দেয়ার কথা রয়েছে। ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর থেকে প্রায় ধারাবাহিকভাবে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার মধ্যে রয়েছে তেহরান। এর মাঝেই দেশটির ওপর এবার আরো কঠোর চাপ প্রয়োগের প্রস্তুতি নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র।

গতকাল ফিন্যান্সিয়াল টাইমসে প্রকাশিত এক মতামত নিবন্ধে বেসেন্ট লিখেছেন, ‘ভোরের সঙ্গে শুরু হচ্ছে অর্থনৈতিক ডি-ডে, কোনো প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে এযাবৎকালের সবচেয়ে বড় আর্থিক অভিযান।’

দুই দেশের মধ্যে কয়েক সপ্তাহ ধরে সরাসরি সামরিক হামলা হয়নি। তবে ছয় মাস ধরে চলা সংঘাতের অবসানে অর্থবহ কোনো আলোচনাও হয়নি।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর থেকে হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন। নিহতদের বেশির ভাগই ইরান ও লেবাননের। এসব হামলায় ইরানের প্রচলিত সামরিক সক্ষমতার বড় অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং দেশটির অর্থনীতিতে ব্যাপক চাপ তৈরি হয়েছে। হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিও নিহত হয়েছেন।

তবে ইরানের হাতে এখনো পর্যাপ্ত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা রয়েছে। এর মাধ্যমে দেশটি উপসাগরীয় প্রতিবেশী দেশগুলোয় হামলা এবং হরমুজ প্রণালিতে তেলবাহী জাহাজকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে। ফলে গুরুত্বপূর্ণ এ জলপথে জাহাজ চলাচল প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে এবং বিশ্ববাজারে জ্বালানির দামের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে।

ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির বর্তমান অবস্থা নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল এ কর্মসূচি ধ্বংস করার লক্ষ্য নিয়েছে।

নতুন নিষেধাজ্ঞার বিস্তারিত না জানিয়ে বেসেন্ট ইঙ্গিত দিয়েছেন, ইরানের অর্থনীতি ও আর্থিক ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা দেশগুলোকেও নিশানা করা হবে।

ফিন্যান্সিয়াল টাইমসে তিনি লিখেছেন, ইরানের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখার পরিণতি সম্পর্কে এসব দেশের ‘ভেবে দেখা উচিত’।

ইরান কয়েক দিন ধরেই নতুন নিষেধাজ্ঞার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিল। দেশটির কর্মকর্তারা একের পর এক কঠোর বিবৃতি দিয়ে বড় ধরনের সামরিক জবাবের ইঙ্গিত দিচ্ছিলেন।

গতকাল ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব মোহসেন রেজায়ী অর্থনৈতিক পাল্টা ব্যবস্থা নেয়ার হুমকি দেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, ‘অর্থনৈতিক যুদ্ধ চলতে থাকলে এক ফোঁটা তেলও রফতানি হবে না—হরমুজ প্রণালি দিয়ে কিংবা পারস্য উপসাগরের অন্য কোনো পথ দিয়েও নয়।’

তিনি আরো বলেন, ইরানের জনগণের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক যুদ্ধে কোনো দেশের অংশগ্রহণ বা সমর্থনকে ইরান ‘যুদ্ধ’ হিসেবে বিবেচনা করবে।

এর আগে বেসেন্ট চীনকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সহযোগিতা করার আহ্বান জানিয়েছিলেন। তিনি উল্লেখ করেন, ঐতিহাসিকভাবে চীন তার আমদানি করা জ্বালানি তেলের প্রায় অর্ধেক উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে সংগ্রহ করে।

তবে ওয়াশিংটনে চীনা দূতাবাসের এক মুখপাত্র বলেন, ‘নিষেধাজ্ঞা ও চাপ সমস্যা সমাধানে সহায়তা করে না।’ একই সঙ্গে তিনি কূটনৈতিক সমাধানের আহ্বান জানান।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ইরানের অবকাঠামোর কিছু অংশ ধ্বংস হওয়ার আগেই আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে দেশটির অর্থনীতি চাপে ছিল।

তেহরান প্রকাশ্যে কঠোর অবস্থান বজায় রাখলেও ইরানের কর্মকর্তারা সতর্ক করেছেন, আরো অর্থনৈতিক কঠোরটা সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ বাড়াতে, নতুন করে বিক্ষোভ উসকে দিতে এবং ইসলামী প্রজাতন্ত্রের বৈধতা আরো দুর্বল করতে পারে।

যুদ্ধ শুরুর সময়ই ইরানের অর্থনীতি উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দুর্বল মুদ্রা, জ্বালানি সংকট, নিষেধাজ্ঞা ও গভীর কাঠামোগত দুর্বলতায় ভুগছিল। এখন এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো, বাণিজ্যে বিঘ্ন, উৎপাদন কমে যাওয়া এবং পুনর্গঠনের বিপুল ব্যয়।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সর্বশেষ গত জুনে সুইজারল্যান্ডে সরাসরি আলোচনা হয়েছিল। তবে কাতার, পাকিস্তান ও তুরস্কসহ কয়েকটি দেশ কূটনৈতিক উদ্যোগ চালিয়ে যাচ্ছে।

ইরান জানিয়েছে, পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনির সোমবার তেহরান সফর করবেন। অঞ্চলটিতে শান্তি ও নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে এ সফর হবে। তবে সফর সম্পর্কে বিস্তারিত জানায়নি তেহরান।

সংঘাতের মধ্যস্থতায় ভূমিকা রাখা পাকিস্তানের এক সরকারি কর্মকর্তা জানিয়েছেন, মুনির সাম্প্রতিক পরিস্থিতি এবং যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নিষেধাজ্ঞার হুমকিসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করবেন।

যুদ্ধ চলাকালে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলা এবং লেবাননে ইসরায়েলি হামলায় হাজার হাজার মানুষ নিহত ও কয়েক লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, তাদের ১৮ জন সামরিক সদস্য নিহত এবং ৭৫০ জনের বেশি আহত হয়েছেন।

আরও