দুর্যোগের পর বড় সংকটের মুখে নেপাল, বাড়ছে ওষুধ আর পানির জন্য হাহাকার

সংকট কেবল ওষুধের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। বন্যার কারণে হাসপাতাল ও আশেপাশের এলাকার খাবার পানি সরবরাহের প্রধান উৎসগুলো নষ্ট হয়ে গেছে। স্থানীয় বাসিন্দা এবং হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আগে ত্রিশূলী জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের একটি খাল থেকে পানি সংগ্রহ করত। কিন্তু বন্যায় সেটিও ধ্বংস হয়ে গেছে। এছাড়া তুপচে হয়ে আসা পানির মূল পাইপলাইনটিও বন্যায় ভেসে গেছে। ফলে বাধ্য হয়ে দুর্গত মানুষ নোংরা ও অনিরাপদ পানি ব্যবহারে বাধ্য হচ্ছেন।

নেপাল-তিব্বত সীমান্তে গত বুধবার হিমবাহ ধস থেকে সৃষ্ট আকস্মিক বন্যায় বদলে গেছে অসংখ্য মানুষের জীবন। পাহাড় থেকে হঠাৎ নেমে আসা কাঁদার ঢল যেন এক নিমিষেই পাল্টে দিয়েছে চিরচেনা গ্রামের চেহারা, মানুষের জীবন আর বেঁচে থাকার লড়াইয়ের ধরণ।

ত্রিশূলী বাজারের বাসিন্দা রেখা দেবী গোসাঁইয়ের জন্য সেদিনের বন্যার তাণ্ডব থেকে বেঁচে ফেরা ছিল প্রথম পরীক্ষা। সে যাত্রায় বেঁচে গেলেও সংকট দূর হয়নি এখনও। ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ এবং থাইরয়েডজনিত সমস্যায় ভুগছেন তিনি। প্রতিদিন নিয়ম করে খেতে হয় ওষুধ। বন্যা যখন তার ঘরবাড়ি এবং চারটি দোকান ভাসিয়ে নিয়ে যায়, তখন অতি প্রয়োজনীয় সেই ওষুধ রক্ষা করার কোনো সুযোগ পাননি তিনি। তার গাড়ি, মোটরসাইকেল এবং অন্য জিনিসপত্রও ভেসে গেছে সেই বন্যায়। বাধ্য হয়ে এখন পরিবার নিয়ে ত্রিশূলী হাসপাতালের কাছে একটি শিবিরে আশ্রয় নিয়েছেন তিনি। জীবন বাঁচলেও এখন বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় ওষুধ পাচ্ছেন না হাসপাতালে।

রেখা দেবীর ছেলে রঘুবীর বলেন, মায়ের নিয়মিত ওষুধ খেতে হয়, কিন্তু হাসপাতালে তা নেই। তিনদিন ধরে ওষুধ খেতে পারছেন না তিনি।

এখানেই শেষ নয়। শিবিরে অবস্থানকালেই রঘুবীরের ভাবির প্রসববেদনা ওঠে। কিন্তু প্রসূতি সেবা দেয়ার সক্ষমতা নেই ত্রিশূলী হাসপাতালের। এমন পরিস্থিতিতে কাঠমান্ডু যাওয়ার মতো অবস্থাও ছিল না। রঘুবীর জানান, বারবার আকুতির পর শনিবার সকালে তাকে বিমানে করে কাঠমান্ডুর থাপাতলিতে পরোপকার প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হয়।

এ বাস্তবতা শুধু রেখা দেবী কিংবা রঘুবীরের নয়, আরো অনেক বাস্তুচ্যুত মানুষকে সম্মুখীন হতে হচ্ছে এমন পরিস্থিতির। দুর্যোগে ঘরবাড়ি ও জিনিসপত্র হারানোর পর জটিল রোগে আক্রান্ত রোগীরা এখনো ওষুধ পাচ্ছেন না।

কোলানি আশ্রয়শিবিরে ৬২ বছর বয়সী মায়ের সেবা করছেন কপিলা পরিয়ার। বুধবারের বন্যায় তার ১৬ বছরের ভাই অবিনাশ ও ৪৩ বছরের ননদ শান্তি ভেসে গেছেন। তারা এখনো নিখোঁজ।

কপিলা বলেন, আমার মায়ের হাঁপানি রয়েছে এবং তার দুই-তিনটি ওষুধ দরকার, কিন্তু আমরা তার সবগুলো জোগাড় করতে পারছি না। মৌলিক চাহিদা মেটাতে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছি উল্লেখ করে তিনি বললেন, আশ্রয় শিবিরে কোনো খাবার পানি নেই। আমরা বোতলজাত পানিও কিনতে পারছি না। আমাদের কাছে টাকা নেই, কাপড় নেই এবং কোলানি বাজারে কেনার মতো তেমন কিছুই নেই।

চিকিৎসকরা সতর্ক করে বলেছেন, দীর্ঘস্থায়ী রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের প্রয়োজনীয় ওষুধ খাওয়া বন্ধ করতে বাধ্য করা উচিত নয়। অথচ ত্রিশূলী হাসপাতালেই ওষুধের সংকট দেখা দিয়েছে। হাসপাতালের ফার্মাসিস্ট মহেশ্বর যাদব জানান, অ্যাটেনোলল এবং লসার্টানসহ উচ্চ রক্তচাপের জন্য সচরাচর ব্যবহৃত ওষুধগুলো পাওয়া যাচ্ছে না। ইন্টারনেট না থাকায় হাসপাতালের বীমা কার্যক্রমও চালু নেই। আমাদের ওষুধও শেষ হয়ে আসছে।

ত্রিশূলী হাসপাতালের তথ্য কর্মকর্তা রিকেশ রানা জানান, কাছাকাছি আশ্রয় নেয়া অনেক বাস্তুচ্যুত মানুষের ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ এবং হাঁপানি থাকলেও তারা সাধারণত যে ওষুধগুলো খান, তা পাচ্ছেন না।

এই সংকট কেবল ওষুধের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। বন্যার কারণে হাসপাতাল ও আশেপাশের এলাকার খাবার পানি সরবরাহের প্রধান উৎসগুলো নষ্ট হয়ে গেছে। স্থানীয় বাসিন্দা এবং হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আগে ত্রিশূলী জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের একটি খাল থেকে পানি সংগ্রহ করত। কিন্তু বন্যায় সেটিও ধ্বংস হয়ে গেছে। এছাড়া তুপচে হয়ে আসা পানির মূল পাইপলাইনটিও বন্যায় ভেসে গেছে। ফলে বাধ্য হয়ে দুর্গত মানুষ নোংরা ও অনিরাপদ পানি ব্যবহারে বাধ্য হচ্ছেন।

চিকিৎসকরা আশঙ্কা, সুপেয় পানির তীব্র সংকট ও অপরিচ্ছন্ন পরিবেশের কারণে আশ্রয়শিবিরগুলোতে দ্রুত রোগব্যাধি ছড়িয়ে পড়তে পারে, যা আরেকটি বিপর্যয় ডেকে আনবে।

ত্রিশূলী হাসপাতালের পাশে ভাগতার এলাকায় তিনটি বড় আশ্রয়শিবির। ভৈরুং সেকেন্ডারি স্কুল, স্পোর্টস হল ও বেথান একাডেমিতে আশ্রয় নিয়েছেন হাজার খানেক মানুষ। তাদের মধ্যে অন্তঃসত্ত্বা নারী ও প্রসূতি রয়েছেন। কিন্তু আশ্রয়শিবিরে পর্যাপ্ত পানি ও টয়লেট না থাকায় তারা মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়েছেন।

হাসপাতালের মেডিকেল সুপারিনটেনডেন্ট ডা. রাজেন্দ্র লামা বলেন, এত মানুষ একসঙ্গে গাদাগাদি করে থাকার কারণে পানিবাহিত রোগ ছড়ানোর ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। নিরাপদ পানি ও সঠিক স্যানিটেশনের অভাবে যেকোনো সময় মহামারি দেখা দিতে পারে।

শিবিরে আশ্রয় নেয়াদের অভিযোগ, যেটুকু খাবার দেয়া হচ্ছে তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল ও পুষ্টিহীন। বিশেষ করে গর্ভবতী নারী, প্রসূতি ও অসুস্থদের জন্য এই খাবার একেবারেই উপযোগী নয়।

এদিকে এলাকার সবকটি সেতু ভেঙে যাওয়ায় জেলা সদরের সঙ্গে হাসপাতালের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। ফলে রোগী পরিবহন দুঃসাধ্য হয়ে উঠেছে। ডা. রাজেন্দ্র লামা জানান, জরুরি মুহূর্তে হেলিকপ্টার পাওয়া যাচ্ছে না। কোনো রোগীকে উন্নত চিকিৎসার জন্য অন্য হাসপাতালে পাঠাতে হলে হেলিকপ্টার ছাড়া কোনো পথ খোলাও নেই।

এর ওপর যোগ হয়েছে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি। ড. লামা জানান, হাসপাতাল ও আশপাশে মাত্র সাত থেকে আটজন পুলিশ মোতায়েন রয়েছে, যা খুবই অপ্রতুল। 'দিনের আলোতেই শুরু হয়েছে লুটপাট। দ্রুতই অতিরিক্ত পুলিশ প্রয়োজন', বলেন তিনি।

দুর্যোগের সুযোগ নিয়ে কালোবাজারি সিন্ডিকেটও সক্রিয়। ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম এখন আকাশচুম্বী বলে উল্লেখ করেন ডা. রাজেন্দ্র লামা।

সূত্র- কাঠমান্ডু পোস্ট

আরও