যুক্তরাজ্যের ওয়েলসের বাসিন্দা লোরি ডেনম্যান ২০০৭ সালে ভারত সফরে এসেছিলেন। সেই সফরের তিন বছর পর, অর্থাৎ ২০১০-১১ সালের দিকে তার শরীরে ধরা পড়ে এক বিরল রোগ— ‘নিউরোসিস্টাইসারকোসিস’। এটি মূলত শুকরের ফিতাকৃমির লার্ভা থেকে সৃষ্ট একটি মস্তিষ্কের সংক্রমণ।
ভারত সফরের সময় এক রেস্তোরাঁর টয়লেট ব্যবহারের সময় লোরি প্রথম একটি এক মিটার লম্বা ফিতাকৃমি দেখতে পান, যদিও তখন এর গুরুত্ব বুঝতে পারেননি। কিন্তু এর পরবর্তী ১২ মাসের মধ্যে তার তীব্র মাথাব্যথা, খিঁচুনি ও মানসিক বিভ্রান্তির (সাইকোসিস) মতো গুরুতর সমস্যা শুরু হয়। পরবর্তীতে স্ক্যান রিপোর্টে চিকিৎসকরা তার মস্তিষ্কে একসঙ্গে ৩৮টি পরজীবীর উপস্থিতি শনাক্ত করেন।
২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে হাসপাতালে স্ক্যান রিপোর্টের অপেক্ষায় বোনের সঙ্গে লোরি
এ রোগের জন্য দায়ী টেনিয়া সোলিয়াম নামের ফিতাকৃমির লার্ভা। তবে শুধু শূকরের মাংস খেলেই যে রোগটি হবে এমন ধারণা ভুল। চিকিৎসকদের মতে, দূষিত খাবার বা পানি কিংবা অপরিষ্কার হাতের মাধ্যমে কৃমির ডিম শরীরে প্রবেশ করে। পরে সেগুলো লার্ভায় পরিণত হয়ে রক্তের মাধ্যমে মস্তিষ্কসহ বিভিন্ন অঙ্গে পৌঁছে সিস্ট তৈরি করে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এ সংক্রমণ বছরের পর বছর কোনো উপসর্গ ছাড়াই শরীরে থাকতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, পরজীবীগুলো যখন মরতে শুরু করে বা মস্তিষ্কে প্রদাহ সৃষ্টি করে, তখনই সাধারণত খিঁচুনি, তীব্র মাথাব্যথা কিংবা অন্য স্নায়বিক সমস্যা দেখা দেয়। এ কারণেই রোগটি শুরুতেই শনাক্ত করা কঠিন।
চিকিৎসকদের ভাষ্য, অনবরত মাথাব্যথা, অকারণ মাথা ঘোরা, বমি বমি ভাব, হঠাৎ বিভ্রান্তি, দৃষ্টিশক্তির পরিবর্তন বা প্রথমবারের মতো খিঁচুনি— এসব লক্ষণ কখনোই অবহেলা করা উচিত নয়। যদিও এসব উপসর্গের পেছনে অন্য কারণও থাকতে পারে, তবু দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়া জরুরি।
টেনিয়া সোলিয়াম নামের ফিতাকৃমির লার্ভা (এআই নির্মিত)
সংক্রামক রোগ ও মাইক্রোবায়োলজি বিশেষজ্ঞ ডা. ব্রেন্ডন হিলির মতে, লোরির ক্ষেত্রেও পরজীবীগুলো দীর্ঘদিন সুপ্ত অবস্থায় ছিল। পরে পরজীবী-বিরোধী ওষুধ, স্টেরয়েড এবং কয়েক বছরের পুনর্বাসনের মাধ্যমে তার মস্তিষ্কের পরজীবীগুলো ক্যালসিফাইড বা নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়। বর্তমানে তার শারীরিক অবস্থার উন্নতি হলেও এখনো তাকে মৃগীরোগের ওষুধ সেবন করতে হচ্ছে।
রোগটি নিশ্চিত করতে সাধারণত সিটি স্ক্যান বা এমআরআই করা হয়। প্রয়োজন হলে রক্ত পরীক্ষাও করা হয়। সময়মতো রোগ ধরা পড়লে পরজীবী ধ্বংসের ওষুধ, প্রদাহ কমানোর স্টেরয়েড এবং খিঁচুনি নিয়ন্ত্রণের ওষুধে ভালো ফল পাওয়া যায়। এতে দীর্ঘমেয়াদি স্নায়বিক জটিলতার ঝুঁকিও অনেক কমে।
চিকিৎসকদের মতে, এ রোগ প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো সাবান দিয়ে নিয়মিত হাত ধোয়া, নিরাপদ পানি পান করা, ফল ও সবজি ভালোভাবে ধোয়া এবং স্বাস্থ্যসম্মতভাবে খাবার প্রস্তুত করা। একই সঙ্গে ভ্রমণের পর দীর্ঘস্থায়ী বা অস্বাভাবিক স্নায়বিক উপসর্গ দেখা দিলে তা হালকাভাবে না নেয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
অনাকাঙ্ক্ষিত সেই অভিজ্ঞতার পরেও ভারতের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য আর আতিথেয়তার স্মৃতি আজীবন মনে রাখবেন বলে জানিয়েছেন লোরি ডেনম্যান
ভয়াবহ এ অভিজ্ঞতার পর লোরি নিজেও ভ্রমণ শেষে স্বাস্থ্য সচেতনতা, খাবারের পরিচ্ছন্নতা এবং দ্রুত রোগ শনাক্তের গুরুত্ব সম্পর্কে মানুষকে এখন সচেতন করে যাচ্ছেন।
—বিবিসি, টাইমস অব ইন্ডিয়া, এনডিটিভি ও ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস থেকে তথ্য ও ছবি নেয়া হয়েছে