এক শতকের মধ্যে সবচেয়ে দীর্ঘ নৌ অবরোধের শিকার গাজার মানুষ

২০২৩ সালের অক্টোবরে যুদ্ধ শুরুর আগেও গাজার জেলেদের সমুদ্রে যাওয়ার পরিসর সীমিত ছিল ৬-১৫ নটিক্যাল মাইলের মধ্যে, যা অসলো চুক্তি অনুযায়ী নির্ধারিত ২০ নটিক্যাল মাইলের চেয়ে অনেক কম। যুদ্ধের পর পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ রূপ নেয়

বিশ্ব রাজনীতিতে নৌ অবরোধ নতুন কিছু নয়। যুদ্ধক্ষেত্রে স্থলবাহিনী নামানো ছাড়াই প্রতিপক্ষকে দুর্বল করার এক প্রাচীন কৌশল এটি। এর লক্ষ্য হলো, খাদ্য, জ্বালানি ও প্রয়োজনীয় সরবরাহ বন্ধ করে দিয়ে একটি সমাজকে ধীরে ধীরে চাপে ফেলা। আধুনিক সময়ে এ কৌশলের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী ও বিতর্কিত উদাহরণগুলোর একটি হলো গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলের আরোপিত অবরোধ।

২০০৭ সালে শুরু হওয়া এ স্থল, সমুদ্র ও আকাশপথের অবরোধ গাজাকে কার্যত একটি বিচ্ছিন্ন ভূখণ্ডে পরিণত করেছে। প্রায় ২৩ লাখ বাসিন্দার অঞ্চলটিতে পণ্য ও প্রয়োজনীয় সরবরাহ প্রবেশ কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত, আর মানুষের অবাধ চলাচল প্রায় অসম্ভব। এর ফলে দীর্ঘমেয়াদি মানবিক ও অর্থনৈতিক সংকট সৃষ্টি হয়েছে, যা সময়ের সঙ্গে আরো গভীর হয়েছে।

২০২৩ সালের অক্টোবরে যুদ্ধ শুরুর আগেও গাজার জেলেদের সমুদ্রে যাওয়ার পরিসর সীমিত ছিল ৬-১৫ নটিক্যাল মাইলের মধ্যে, যা অসলো চুক্তি অনুযায়ী নির্ধারিত ২০ নটিক্যাল মাইলের চেয়ে অনেক কম। যুদ্ধের পর পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ রূপ নেয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় গাজার জনগণকে অনাহারে রাখার নীতি প্রয়োগ করছে ইসরায়েল। এর ফলে স্থানীয় জেলেরা পরিবারের জন্য খাবার জোগাড় করতে চরম ঝুঁকিপূর্ণ পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হয়েছেন; এতে অনেকেই ইসরায়েলি বাহিনীর গুলিতে নিহত হয়েছেন।

মাছ ধরতে গিয়ে ইসরায়েলি বাহিনীর হাতে নির্যাতন, এমনকি মৃত্যুও স্বাভাবিক ঘটনায় গাজা। ছবি: রয়টার্স

২০০৮ সাল থেকে ফ্রিডম ফ্লোটিলার একাধিক জাহাজ ইসরায়েলের অবরোধ ভাঙার চেষ্টা করেছে। ২০১০ সাল থেকে গাজা অবরোধ ভাঙার উদ্দেশ্যে যেসব ফ্লোটিলা অভিযান চালানো হয়েছে, সেগুলোর সবই আন্তর্জাতিক জলসীমায় ইসরায়েল দ্বারা আটক বা হামলার শিকার হয়েছে। গত ৩০ এপ্রিল গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা অভিযানের সর্বশেষ প্রচেষ্টায় গাজা থেকে এক হাজার কিলোমিটারেরও বেশি দূরের আন্তর্জাতিক জলসীমায় থাকা ৫৮টি জাহাজের মধ্যে ২২টিতে ইসরায়েলি বাহিনী অভিযান চালায়।

গাজার এই দীর্ঘ অবরোধকে বুঝতে হলে গত এক শতকের অন্যান্য বড় নৌ অবরোধগুলোর দিকে তাকানো প্রয়োজন। উদাহরণ হিসেবে ধরা যায় বিয়াফ্রা অবরোধ (১৯৬৭-৭০)। নাইজেরিয়ার গৃহযুদ্ধের সময় প্রায় তিন বছর ধরে চলা এ অবরোধ ব্যাপক দুর্ভিক্ষ সৃষ্টি করে, যেখানে প্রায় ১০-২০ লাখ মানুষ মারা যায়—বেশিরভাগই অনাহার ও রোগে। এটিও দেখিয়েছে, অবরোধ শুধু সামরিক নয়, মানবিক বিপর্যয়ও ডেকে আনতে পারে।

একইভাবে বেইরা প্যাট্রোল (১৯৬৬-৭৫) ছিল প্রায় নয় বছরব্যাপী একটি নৌ অবরোধ, যার লক্ষ্য ছিল রোডেশিয়ায় জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ করা। কিন্তু বিকল্প পথ দিয়ে সরবরাহ চলতে থাকায় এ অবরোধ কৌশলগতভাবে ব্যর্থ হয়, যদিও এর খরচ ছিল বিপুল।

শীতল যুদ্ধের সময় কিউবান ক্ষেপণাস্ত্র সংকট-এ (১৯৬২) যুক্তরাষ্ট্র ‘কোয়ারেন্টাইন’ নামে এক ধরনের নৌ অবরোধ চালায়, যা মাত্র ১৩ দিন স্থায়ী হলেও বিশ্বকে পারমাণবিক যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গিয়েছিল। কূটনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমে সংকটের অবসান হয়।

গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলার কিছু নৌযান। ছবি: এপি

কোরীয় যুদ্ধে ওনসান অবরোধ (১৯৫১-৫৩) প্রায় আড়াই বছর ধরে চলে, যেখানে একটি বন্দরকে বিচ্ছিন্ন করে শত্রুপক্ষকে দুর্বল করা হয়। একইভাবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানের বিরুদ্ধে মার্কিন সাবমেরিন অবরোধ (১৯৪২-৪৫) দেশটির অর্থনীতি ও যুদ্ধক্ষমতা ভেঙে দেয়, কারণ সমুদ্রপথেই তাদের প্রায় সব জ্বালানি ও কাঁচামাল আসত।

আরো পেছনে গেলে দেখা যায় প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মানির ওপর মিত্রশক্তির অবরোধ (১৯১৪-১৯) এবং পূর্ব ভূমধ্যসাগর অবরোধ (১৯১৫-১৮) ব্যাপক দুর্ভিক্ষ ও জনসংখ্যা হ্রাসের কারণ হয়।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে হরমুজ প্রণালীকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিদ্বন্দ্বী অবরোধ বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে চাপ তৈরি করেছে। একসময় বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও গ্যাস এই পথ দিয়ে যেত, ফলে এর অচলাবস্থা বিশ্ব অর্থনীতিতে তাৎক্ষণিক প্রভাব ফেলছে।

তবে এসব উদাহরণের মধ্যে গাজা আলাদা। কারণ এটি শুধু সামরিক কৌশল নয়, বরং দীর্ঘস্থায়ী মানবিক বাস্তবতা। অধিকার কর্মীরা বরাবরই গাজার সঙ্গে ইসরায়েলির আচরণকে ‘গণহত্যা’ হিসেবে অভিহিত করে আসছেন। অন্যান্য অবরোধ হয়তো যুদ্ধের সঙ্গে শেষ হয়েছে বা কৌশলগতভাবে বদলেছে, কিন্তু গাজার অবরোধ বছরের পর বছর ধরে একটি পুরো জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রাকে সীমাবদ্ধ করে রেখেছে।

আল জাজিরা এক্সপ্লেইনার অবলম্বনে

আরও