সমাহিত হলেন আলী খামেনি, আড়ালেই থাকলেন তার উত্তরসূরি

উত্তর-পূর্ব ইরানের মাশহাদে ইমাম রেজার মাজারে আলী খামেনিকে দাফন করা হয়। গত এক সপ্তাহ ধরে দেশজুড়ে বিশাল শোকযাত্রা, সমাবেশ ও শোকানুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়েছে। একই সময়ে চার মাসব্যাপী যুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে হওয়া যুদ্ধবিরতির কয়েক সপ্তাহ পর ফের দুই দেশের মধ্যে নতুন করে সংঘাত শুরু হয়েছে

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় নিহত ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে দেশটির সবচেয়ে পবিত্র ধর্মীয় স্থাপনাগুলোর একটিতে সমাহিত করা হয়েছে। আজ ভোরে রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম এ তথ্য জানিয়েছে। লাখো মানুষের উপস্থিতিতে শেষকৃত্য সম্পন্ন হলেও তার ছেলে ও উত্তরসূরি মোজতবা খামেনি এখনো জনসমক্ষে আসেননি। খবর রয়টার্স।

উত্তর-পূর্ব ইরানের মাশহাদে ইমাম রেজার মাজারে আলী খামেনিকে দাফন করা হয়। গত এক সপ্তাহ ধরে দেশজুড়ে বিশাল শোকযাত্রা, সমাবেশ ও শোকানুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়েছে। একই সময়ে চার মাসব্যাপী যুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে হওয়া যুদ্ধবিরতির কয়েক সপ্তাহ পর ফের দুই দেশের মধ্যে নতুন করে সংঘাত শুরু হয়েছে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যে হামলা শুরু করেছিল, তার প্রথম দফার আঘাতেই খামেনি নিহত হন। গত মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়।

গতকাল খামেনির মরদেহ একটি ট্রাকে করে মাশহাদের জনাকীর্ণ সড়ক অতিক্রম করে সোনালি গম্বুজ ও মিনারবিশিষ্ট ইমাম রেজার মাজারের দিকে নেয়া হয়। ট্রাকের দুই পাশে সাদা পাগড়ি পরা ধর্মীয় ব্যক্তিত্বরা হাঁটছিলেন। তাদের পেছনে কালো পোশাক পরা শোকাহত মানুষ ইরানের পতাকা, প্রয়াত খামেনির ছবি এবং বিপ্লবী স্লোগানসংবলিত লাল প্ল্যাকার্ড হাতে মিছিল করেন।

ইরান ও ইরাকে এক সপ্তাহ ধরে চলা শোকানুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে এ দাফন সম্পন্ন হয়। ইসলামী প্রজাতন্ত্রের ধর্মীয় নেতৃত্ব বিপুল জনসমাগমের আহ্বান জানিয়েছিল, যাতে তাদের ধর্মতান্ত্রিক রাষ্ট্রের শক্তি ও আদর্শিক দৃঢ়তা প্রদর্শন করা যায়।

তবে কয়েক মাস ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ধারাবাহিক হামলা মোকাবেলা করেও ইরান এখন বড় ধরনের অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। খামেনির ৩৭ বছরের শাসনের উত্তরাধিকারও দেশটির ভেতরে তীব্র বিতর্কের বিষয়।

মাশহাদে ইমাম রেজার মাজার। ছবি: রয়টার্স

দাফন অনুষ্ঠানে ‘ট্রাম্পকে হত্যা করো’ লেখা প্ল্যাকার্ড

খামেনির মৃত্যুর এক সপ্তাহ পর, মার্চের শুরুতে ধর্মীয় পরিষদ মোজতবা খামেনিকে সর্বোচ্চ নেতা ঘোষণা করে। কিন্তু এরপর থেকে তার অবস্থান সাধারণ মানুষের কাছে রহস্যই রয়ে গেছে।

যুদ্ধ শুরুর পর থেকে তিনি একবারও জনসমক্ষে আসেননি। লিখিত বিবৃতি দিলেও তার কোনো ছবি, ভিডিও বা কণ্ঠস্বর প্রকাশ করা হয়নি।

বাবা আলী খামেনি নিহত হওয়া হামলায় তিনিও গুরুতর আহত হন। ওই হামলায় তার মুখ বিকৃত হয়ে যায় এবং হাত-পায়েও গুরুতর আঘাত লাগে।

তেহরানের সূত্রগুলো জানিয়েছে, তিনি ধীরে ধীরে সুস্থ হচ্ছেন। তবে এখনো জনসমক্ষে আসার মতো শারীরিকভাবে সক্ষম নন। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য নতুন হামলার আশঙ্কায় নিরাপত্তা সংস্থাগুলোও তাকে আড়ালে রাখছে।

মাশহাদে শেষকৃত্যের শোভাযাত্রার অপেক্ষায় থাকা জনতা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে প্রতিশোধের স্লোগান দেয়।

তারা স্লোগান দেয়, ‘সর্বোচ্চ নেতার রক্তের শপথ, ট্রাম্প, আমরা তোমাকে হত্যা করব!’ অনেক নারী ‘ট্রাম্পকে হত্যা করো’ লেখা প্ল্যাকার্ডও প্রদর্শন করেন।

যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী স্লোগানে মুখর ছিল মাজার প্রাঙ্গণ

বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে ইমাম রেজার মাজারের প্রাঙ্গণ শোকার্ত মানুষের ভিড়ে পূর্ণ হয়ে যায়। লাউডস্পিকারে শোকসংগীত ও বাদ্যের সুর বাজছিল। এর মাঝেই জনতা উচ্চস্বরে ‘আমেরিকার ধ্বংস হোক’ স্লোগান দিচ্ছিল।

অত্যধিক ভিড়ের কারণে খামেনির কফিনটি ট্রাক থেকে হেলিকপ্টারে তুলে মাজারের নীল টাইলস-সজ্জিত খিলানঘেরা অংশে নেয়া হয়।

খামেনির বড় ছেলে মোস্তফা খামেনি জানাজার নামাজে ইমামতি করেন। এরপর ইরানের লাল-সাদা-সবুজ পতাকায় মোড়ানো কফিনটি অসংখ্য শোকাহত ব্যক্তি কাঁধে করে মাজারের ভেতরে নিয়ে যান।

ভিডিওতে দেখা যায়, ভেতরে উপস্থিত অনেকেই হাতে মোমবাতি ধরে কফিনের দিকে হাত বাড়িয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন।

রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ইরনা আজ ভোরে জানায়, খামেনি এবং তার সঙ্গে নিহত পরিবারের আরো চার সদস্যের দাফন সম্পন্ন হয়েছে।

শিয়া ইসলামের অন্যতম ব্যক্তিত্ব ইমাম রেজার মাজার কমপ্লেক্স মাশহাদে অবস্থিত। এটি শিয়াদের অন্যতম প্রধান তীর্থস্থান। মাশহাদ খামেনির জন্মস্থানও।

এর আগে খামেনির মরদেহ তেহরান, শিয়াদের ধর্মীয় কেন্দ্র কোম এবং ইরাকের পবিত্র শহর নাজাফ ও কারবালায় শোকযাত্রার মাধ্যমে প্রদর্শন করা হয়। প্রতিটি স্থানেই বিপুল জনসমাগম হয়। শিয়া শোকসংগীত ও বিপ্লবী স্লোগানের মধ্য দিয়ে মানুষ তাকে শেষ শ্রদ্ধা জানান।

শিয়া ধর্মতত্ত্বে শাহাদাত বা শহীদ হওয়ার বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। বিদেশী শত্রুর হাতে খামেনির মৃত্যু ইসলামী প্রজাতন্ত্রের গভীর ধর্মীয় ও রাজনৈতিক ঐতিহ্যের সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হয়েছে।

ইমাম রেজার মাজারের প্রাঙ্গণ শোকার্ত মানুষের ভিড়ে পূর্ণ হয়ে যায়। ছবি: রয়টার্স

৩৭ বছরের শাসনের অবসান, রেখে গেল বিতর্কিত উত্তরাধিকার

খামেনির দাফন এমন এক সময়ে সম্পন্ন হলো, যখন ইরান একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। প্রায় চার দশকের তার শাসনের সমাপ্তি ঘটল, আর এর কয়েক মাস আগেই ইসলামি প্রজাতন্ত্রবিরোধী নতুন দফার দেশব্যাপী বিক্ষোভ হয়েছিল।

নিষেধাজ্ঞায় ক্ষতিগ্রস্ত অর্থনীতি নিয়ে ক্ষোভ থেকে শুরু হওয়া সেই বিক্ষোভ কঠোরভাবে দমন করে নিরাপত্তা বাহিনী। দমন-পীড়নের সময় কয়েক হাজার বিক্ষোভকারী নিহত হন, যা সাম্প্রতিক বছরগুলোর অন্যান্য সহিংস দমন অভিযানেরই পুনরাবৃত্তি হিসেবে দেখা হয়।

বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধের পর কৌশলগতভাবে ইরানের অবস্থান আরো শক্তিশালী হয়েছে এবং গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালির ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ অটুট রয়েছে। তবে যুদ্ধের কারণে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, যা দেশের অর্থনৈতিক সংকট আরো গভীর করেছে।

ইসলামী বিপ্লবের এক দশক পর ১৯৮৯ সালে আলী খামেনি সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব নেন। এরপর কয়েক দশকে তিনি রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক ক্ষমতা ক্রমে নিজের কার্যালয়ের অধীনে কেন্দ্রীভূত করেন।

এই প্রক্রিয়ায় নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ও পার্লামেন্টের ভূমিকা ক্রমশ সীমিত হয়ে পড়ে। একই সময়ে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি)-এর প্রভাবও ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পায়।

আইআরজিসির সমর্থনেই মোজতবা খামেনি সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচিত হন। বর্তমানে ইরানের রাজনীতি ও কৌশলগত সিদ্ধান্ত গ্রহণে আইআরজিসিকেই সবচেয়ে প্রভাবশালী শক্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে।

আরও