জেন জি বিদ্রোহে ক্ষমতার পালাবদলের পর নেপালের রাজনৈতিক মহলে ঘুস-দুর্নীতিবিরোধী প্রচারণা এখন তুঙ্গে। আর বিষয়টিকে গান গানে তুলে ধরেছেন এক র্যাপার, যিনি কি-না সমর্থকদের আনন্দ দিতে বিয়ের অনুষ্ঠানেও হঠাৎ হাজির হয়ে যান। জেন জি ভক্তদের সঙ্গে সেলফি তোলা এমনই একজন এখন নেপালের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দৌড়ে এগিয়ে রয়েছেন।
৩৫ বছর বয়সী বালেন্দ্র শাহ। ‘বালেন’ নামে পরিচিত এ গায়ক-রাজনীতিবিদ আগামীকালের ভোটে জয় পেলে এশিয়ার অন্যতম দরিদ্র দেশ নেপালের নেতৃত্বে আসতে পারেন। রাজধানী কাঠমান্ডুর মেয়রের দায়িত্ব পালন করে এরই মধ্যে তিনি ক্ষমতার দীক্ষা নিয়েছেন। তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী গত বছর জেন জি-নেতৃত্বাধীন এক অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হওয়া ৭৪ বছর বয়সী সাবেক প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা অলি। ওই ঘটনায় ৭৭ জন নিহত হন।
দুর্নীতির বিরুদ্ধে আন্দোলনকারীদের দাবির প্রতিদান এবং প্রবীণনিয়ন্ত্রিত রাজনীতিতে পরিবর্তন আনতে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন বালেন। নেপালের মধ্যম বয়স ২৫ বছর। এ কারণে জেন জির আকাঙ্ক্ষা দেশটির রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ চালক হয়ে উঠেছে। আর বালেন নিজেকে ‘সমগ্র নেপালের প্রার্থী’ হিসেবে দাবি করছেন।
২৩ বছর বয়সী অভিনেত্রী ও রাজনৈতিক কর্মী রশ্মি উপ্রেতি বলেন, ‘বালেন আমাদের প্রতিনিধিত্ব করেন। গত বছর যারা লড়েছিল এবং প্রাণ হারিয়েছে সেই জেন জি ও পুরো নেপালি তরুণ সমাজের প্রতিনিধি তিনি।’
বালেনের প্রতিদ্বন্দ্বী ওলি এর আগে চারবার প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন। সেদিক থেকে পুরনোপন্থী ও প্রচলিত ধারার রাজনীতির কিছুটা সুযোগও পেতে পারেন তিনি।
পূর্ব নেপালে সমর্থকদের মাঝে বালেন। ছবি: বালেন শাহ সেক্রেটারিয়েট
বিশ্লেষকরা বলছেন, বালেনের জয় হিমালয় কোলের ছোট দেশটির রাজনীতিতে বড় পরিবর্তন আনতে পারে। আটলান্টিক কাউন্সিলের সাউথ এশায়া সেন্টারের সিনিয়র ফেলো রুদাবে শহীদের মতে, দীর্ঘদিন ভারত ও চীনের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করে অর্থনৈতিক সুবিধা নিয়েছে নেপাল। কিন্তু এখন সেই অভিজাত ঐকমত্য ক্ষয়ে যাচ্ছে।
গত সেপ্টেম্বরে ওলি জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধ করার পদক্ষেপ নিলে নেপালে বিক্ষোভ শুরু হয়। যা পরে দেশব্যাপী বৈষম্য ও ‘নেপো বেবি’ সংস্কৃতির বিরুদ্ধে বড় আন্দোলনে রূপ নেয়। বিক্ষোভকারীরা প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন, সংসদ ও সুপ্রিম কোর্টে আগুন ধরিয়ে দেয়। বালেন তখন ফেসবুকে লেখেন, ‘প্রিয় জেন জি, তোমাদের হত্যাকারীর পদত্যাগের খবর এসেছে। এখন দেশকে নেতৃত্ব দিতে হবে তোমাদের প্রজন্মকে।’ এরপর থেকে দেশটি অন্তর্বর্তী প্রধানমন্ত্রীর অধীনে চলছে।
প্রকৌশলী হিসেবে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বালেন সংগীতে রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের সমালোচনা করে পরিচিত হন। ২০২২ সালে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ‘সময় পরিবর্তনের’ স্লোগান নিয়ে কাঠমান্ডুর মেয়র নির্বাচিত হন।
গত মাসে তিনি রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টিতে (আরএসপি) যোগ দেন। দলটি চীন ও ভারতের মাঝের ‘বাফার স্টেট’ থেকে নেপালকে ‘ব্রিজে’ রূপান্তরের কথা বলেছে, যাতে ত্রিপক্ষীয় অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব ও সংযোগ বাড়ে।
নেপালের প্রায় ১ কোটি ৯০ লাখ ভোটারের অর্ধেকের বয়স ৪৫ বছরের নিচে। বিক্ষোভের পর প্রায় ১০ লাখ নতুন ভোটার নিবন্ধিত হয়েছেন।
নেপালে ২০০৮ সালে ২৩৯ বছরের রাজতন্ত্র বিলুপ্তির পর এক ডজনের বেশি সরকার বদল হয়েছে। বেকারত্ব ২১ শতাংশ; লাখ লাখ নেপালি এখন মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোয় শ্রমিক হিসেবে কাজ করছেন।
নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতে ১২ লাখ কর্মসংস্থান তৈরি, মাথাপিছু আয় দেড় হাজার থেকে ৩ হাজার ডলারে উন্নীত এবং পাঁচ বছরে জিডিপি ১০০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে আরএসপি। তবে অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতিনির্ভর নেপালের জন্য এটি বড় চ্যালেঞ্জ বলে মত বিশ্লেষকদের।
বালেন কাঠমান্ডুতে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও স্বাস্থ্য-শিক্ষা উন্নতিতে কাজ করলেও, রাস্তার হকার ও বস্তিবাসীদের বিরুদ্ধে পুলিশ ব্যবহার নিয়ে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর সমালোচনার মুখে পড়েন।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, বিকল্প রাজনৈতিক শক্তির অভাবে নির্বাচনে সুবিধা পেতে পারেন বালেন। তবে এক কর্মী বলেছেন, ‘বালেন জিতলে আমরা তার ওপর নজর রাখব।’
এফটি অবলম্বনে