২০২৬ সালের রসায়নে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন ফরাসি রসায়নবিদ হেনরি বি. কাগান ও জাপানি রসায়নবিদ কেনসো সোয়াই। একটি অণুর আয়নার প্রতিবিম্বের মতো দুটি ভিন্ন রূপের মধ্যে সামান্য পার্থক্য কীভাবে রাসায়নিক বিক্রিয়ায় অনেক বড় ব্যবধানে পরিণত হতে পারে এবং একটি নির্দিষ্ট রূপ কীভাবে নিজেই নিজের উৎপাদন বাড়াতে পারে—সে রহস্য উন্মোচনে যুগান্তকারী গবেষণার জন্য তাদের এ পুরস্কার দেয়া হয়েছে।
গতকাল বাংলাদেশ সময় বেলা ৩টা ৪৫ মিনিটে রয়্যাল সুইডিশ একাডেমি অব সায়েন্সেস তাদের নাম ঘোষণা করে। ‘অসমমিত জৈব সংশ্লেষণে নন-লিনিয়ার প্রভাব ও অটোক্যাটালাইসিস আবিষ্কারের জন্য’ তাদের এ পুরস্কার দেয়া হয়েছে।
ফরাসি রসায়নবিদ কাগান ১৯৩০ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি দীর্ঘদিন ইউনিভার্সিতে প্যারিস-সুদে গবেষণা ও অধ্যাপনা করেছেন এবং বর্তমানে সেখানকার ইমেরিটাস অধ্যাপক। অসমমিত অনুঘটন, অর্গানোমেটালিক কেমিস্ট্রি ও জৈব সংশ্লেষণে তার গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। জাপানের হিরোশিমায় ১৯৫০ সালে জন্মগ্রহণ করেন কেনসো সোয়াই। টোকিও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৭৯ সালে পিএইচডি শেষ করার পর যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব নর্থ ক্যারোলাইনায় গবেষণা করেন। ১৯৮১ সালে টোকিও ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্সে যোগ দেন এবং ১৯৯১ সালে পূর্ণ অধ্যাপক হন। বর্তমানে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়টির ইমেরিটাস অধ্যাপক।
নোবেল কমিটি বলেছে, কাগান ও সোয়াইয়ের গবেষণা ওষুধ, খাবারের স্বাদ ও ঘ্রাণ তৈরির উপাদান, সুগন্ধি এবং নতুন ধরনের উপকরণ তৈরির রাসায়নিক প্রক্রিয়া উদ্ভাবনে রসায়নবিদদের কাজকে আমূল বদলে দিয়েছে। বিশেষ করে একই অণুর দুটি প্রায় অভিন্ন রূপের মধ্য থেকে প্রয়োজনীয় রূপটি বেছে তৈরি করার ক্ষেত্রে তাদের গবেষণা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিষয়টি বোঝার সবচেয়ে সহজ উদাহরণ মানুষের দুই হাত। ডান ও বাঁ হাত দেখতে একই রকম এবং একটি আরেকটির আয়নার প্রতিবিম্ব। কিন্তু একটি হাত আরেকটির ওপর রাখলে পুরোপুরি মেলে না। অনেক অণুও ঠিক এমন দুটি রূপে পাওয়া যায়। রসায়নের ভাষায় এ বৈশিষ্ট্যকে বলা হয় ‘কাইরালিটি’ এবং এমন অণুকে বলা হয় ‘কাইরাল’ অণু।
এই দুই রূপকে রসায়নে ‘এনান্টিওমার’ বলা হয়। দেখতে প্রায় একই হলেও জীবদেহে তাদের আচরণ এক নাও হতে পারে। কোনো ওষুধের একটি রূপ শরীরে কাঙ্ক্ষিত কাজ করতে পারে, আবার অন্য রূপটি কম কার্যকর বা ভিন্নভাবে কাজ করতে পারে। এ কারণেই ওষুধ তৈরিতে প্রয়োজনীয় আয়না-রূপটিকে যতটা সম্ভব বিশুদ্ধভাবে তৈরি করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ফ্রান্সের ইউনিভার্সিতে প্যারিস-সুদের ইমেরিটাস অধ্যাপক হেনরি বি. কাগান ‘অ্যাসিমেট্রিক অটোক্যাটালাইসিস’ বা অসমমিত স্ব-অনুঘটনের অন্যতম পথিকৃৎ। ১৯৮০-এর দশকে তার গবেষণায় দেখা যায়, কোনো রাসায়নিক বিক্রিয়ায় ব্যবহৃত কাইরাল অনুঘটকের এক ধরনের আয়না-রূপ সামান্য বেশি থাকলেই উৎপাদিত অণুতে সেই রূপের আধিক্য সরল অনুপাতে বাড়ে না; কখনো তা প্রত্যাশার তুলনায় অনেক বেশি বেড়ে যেতে পারে। এ ঘটনাই ‘নন-লিনিয়ার ইফেক্ট’ নামে পরিচিত।
সহজ করে বললে, একটি বিক্রিয়ার শুরুতে দুই আয়না-রূপের মধ্যে ব্যবধান খুব সামান্য হলেও শেষ পর্যন্ত একটি রূপ অন্যটির তুলনায় অনেক বেশি তৈরি হতে পারে। কাগানের গবেষণা দেখিয়েছে, এ ‘সামান্য থেকে অনেক’ হয়ে ওঠার পেছনে কী ধরনের রাসায়নিক প্রক্রিয়া কাজ করে।
তার এ গবেষণা শুধু একটি অদ্ভুত রাসায়নিক ঘটনা ব্যাখ্যা করেনি; বরং কোনো বিক্রিয়া কীভাবে কাজ করছে এবং কীভাবে প্রয়োজনীয় অণুর একটি নির্দিষ্ট রূপ বেশি পরিমাণে তৈরি করা যায়, তা বোঝার গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। কাগানের গবেষণা আধুনিক অসমমিত অনুঘটনের বিকাশেও বড় ভূমিকা রেখেছে।
অন্যদিকে টোকিও ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্সের ইমেরিটাস অধ্যাপক কেনসো সোয়াই ১৯৯৫ সালে এমন একটি রাসায়নিক বিক্রিয়া আবিষ্কার করেন, যেখানে বিক্রিয়ার ফলে তৈরি হওয়া একটি কাইরাল অণুই আবার একই ধরনের আরো অণু তৈরির অনুঘটক হিসেবে কাজ করে। অর্থাৎ উৎপাদিত পদার্থ নিজেই নিজের উৎপাদন ত্বরান্বিত করে। এ প্রক্রিয়াকে বলা হয় ‘অ্যাসিমেট্রিক অটোক্যাটালাইসিস’ বা অসমমিত স্ব-অনুঘটন। এটি এখন ‘সোয়াই রিঅ্যাকশন’ নামে পরিচিত।
এ বিক্রিয়ার সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক হলো শুরুতে কোনো একটি আয়না-রূপের আধিক্য অত্যন্ত সামান্য হলেও পরপর স্ব-অনুঘটন বিক্রিয়ার মাধ্যমে সেই সামান্য পার্থক্য ক্রমে বহুগুণে বেড়ে যেতে পারে। শেষ পর্যন্ত প্রায় পুরোপুরি একটি নির্দিষ্ট আয়না-রূপের অণু পাওয়া সম্ভব হয়।
সোয়াইয়ের গবেষণা জীবনের উৎপত্তি সম্পর্কিত একটি মৌলিক প্রশ্নের সঙ্গেও যুক্ত। জীবদেহে প্রোটিন তৈরির অ্যামিনো অ্যাসিড এবং ডিএনএ-আরএনএতে ব্যবহৃত শর্করার ক্ষেত্রে প্রকৃতি সাধারণত দুটি সম্ভাব্য আয়না-রূপের মধ্যে একটি রূপকেই বেছে নেয়। পৃথিবীতে জীবনের রাসায়নিক উপাদানগুলো কেন এভাবে ‘এক হাতি’ বা এক ধরনের কাইরাল রূপে গড়ে উঠেছে, সেটি দীর্ঘদিনের একটি বৈজ্ঞানিক রহস্য। সোয়াইয়ের বিক্রিয়া দেখিয়েছে, শুরুতে অত্যন্ত সামান্য একটি অসমতাও কীভাবে নিজে থেকেই বহুগুণে বেড়ে প্রায় একক রূপের অণু সৃষ্টি করতে পারে।
কাগান ও সোয়াইয়ের কাজের মাহাত্ম্য মূলত এখানেই। তারা দেখিয়েছেন, অণুর আয়না-রূপের মধ্যে শুরুতে ক্ষুদ্র যে পার্থক্য থাকে, রাসায়নিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সেটিকে কীভাবে বড় করে তোলা সম্ভব। আধুনিক ওষুধ শিল্পে এর গুরুত্ব বিশেষভাবে বেশি। কারণ কোনো ওষুধের কার্যকর উপাদানের নির্দিষ্ট ত্রিমাত্রিক গঠন মানবদেহের এনজাইম বা রিসেপ্টরের সঙ্গে ঠিকভাবে যুক্ত হওয়ার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। একই কারণে সুগন্ধি, ফ্লেভার, কৃষি রাসায়নিক এবং উন্নত উপকরণ তৈরিতেও একটি নির্দিষ্ট আয়না-রূপ বেছে তৈরি করার প্রয়োজন হয়।
কাগান ও সোয়াই আগামী ১০ ডিসেম্বর স্টকহোমে সুইডেনের রাজা ষোড়শ কার্ল গুস্তাফের কাছ থেকে নোবেল পদক গ্রহণ করবেন। আলফ্রেড নোবেলের মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে প্রতি বছর ওই দিন আনুষ্ঠানিকভাবে পুরস্কার তুলে দেয়া হয়। এ বছর নোবেল পুরস্কারের অর্থমূল্য ১ কোটি ২০ লাখ সুইডিশ ক্রোনা বা প্রায় ১২ লাখ ডলার। কাগান ও সোয়াই এ অর্থ ভাগ করে নেবেন।