আল জাজিরা এক্সপ্লেইনার

নতুন রণতরী, ১০ হাজার মার্কিন সেনা: ইরান যুদ্ধ কি আরো তীব্র হচ্ছে?

নতুন সেনা ও সামরিক সরঞ্জাম মোতায়েনের কারণ দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধ কিনা, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে বৃহস্পতিবার প্রকাশিত টাইম ম্যাগাজিনকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেছেন, মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানে বোমাবর্ষণ আরো বাড়ানো হতে পারে। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে চাইলে ট্রাম্প বলেন, তিনি তা বলতে পারবেন না।

ইরানের কাছাকাছি মধ্যপ্রাচ্যের জলসীমায় তৃতীয় বিমানবাহী রণতরীসহ স্ট্রাইক গ্রুপ মোতায়েন করছে যুক্তরাষ্ট্র। এর সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের দিকে পাঠানো হচ্ছে আরো কয়েক হাজার মার্কিন সেনা। নতুন করে রণতরী ও সেনা মোতায়েনে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের তীব্রতা আরো বাড়তে পারে কি না, তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের এক কর্মকর্তা আল জাজিরাকে জানিয়েছেন, ইউএসএস থিওডোর রুজভেল্ট বিমানবাহী রণতরী স্ট্রাইক গ্রুপ রোববার সান দিয়েগো ঘাঁটি থেকে মধ্যপ্রাচ্যের উদ্দেশে রওনা হয়েছে। এর একদিন পর রওনা দেয় মাকিন আইল্যান্ড মেরিন এক্সপেডিশনারি ইউনিটও (এমইইউ)। এ ইউনিটে ২ হাজারের বেশি মেরিন সেনা রয়েছে।

দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নতুন নৌ ও স্ট্রাইক গ্রুপ মোতায়েনের ফলে নাবিক ও মেরিনসহ মোট ৯ হাজার থেকে ১০ হাজার অতিরিক্ত মার্কিন সেনা এ অঞ্চলে যুক্ত হতে যাচ্ছে।

আর ইনডিপেনডেন্টের খবরে বলা হয়, কয়েকটি যুদ্ধজাহাজে করে ওই সেনাদের মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানো হচ্ছে। এ নৌবহরে রয়েছে ইউএসএস থিওডোর রুজভেল্ট ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপ। সম্প্রতি এ বহরের সঙ্গে ইউএসএস চোসিন নামের একটি ক্রুজার মোতায়েন করা হয়েছে। এ ছাড়া রয়েছে ইউএসএস মাকিন আইল্যান্ড অ্যাম্ফিবিয়াস রেডিনেস গ্রুপ। এ বহরে উভচর অবতরণকারী জাহাজ ইউএসএস জন পি মার্থা ও ইউএসএস অ্যাঙ্কোরেজ রয়েছে।

ওই মার্কিন কর্মকর্তা জানান, নভেম্বরের শেষ নাগাদ ইরানের আশপাশে তিনটি বিমানবাহী রণতরী এবং দুটি উভচর সামরিক ইউনিট অবস্থান করবে। এভাবে সামরিক শক্তি কেন্দ্রীভূত করা হলে প্রয়োজনের সময় প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হাতে আরো বিকল্প পথ খোলা থাকবে।

ওয়াশিংটন থেকে আল জাজিরার প্রতিবেদক তানিয়া নুরি জানান, নতুন মোতায়েন করা বহরে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানও রয়েছে। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যে আগে থেকেই অবস্থান করা প্রায় ৫০ হাজার মার্কিন সেনার সঙ্গে আরো সামরিক শক্তি যুক্ত হচ্ছে।

পেন্টাগন ও হোয়াইট হাউসের সূত্রের বরাতে নুরি জানান, কূটনৈতিক আলোচনা যেদিকেই এগোক না কেন, ট্রাম্পের জন্য সামরিক বিকল্পগুলো প্রস্তুত রাখাই এ পদক্ষেপের মূল উদ্দেশ্য। এমনকি ইরানের সঙ্গে কোনো সমঝোতা হলেও বর্তমানে মোতায়েন করা সামরিক সরঞ্জাম প্রত্যাহারের পরিকল্পনা পেন্টাগনের নেই।

মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথও বলেছেন, ট্রাম্প নতুন হামলার নির্দেশ দিলে মার্কিন বাহিনী ‘প্রস্তুত’ রয়েছে।

আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে কয়েক দশক ধরেই সেনা ও সামরিক সরঞ্জাম মোতায়েন করে রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র। কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশন্সের তথ্য অনুযায়ী, অঞ্চলটির অন্তত ১৯টি স্থানে স্থায়ী ও অস্থায়ী সামরিক স্থাপনা ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্র। এর মধ্যে বাহরাইন, মিসর, ইরাক, জর্ডান, কুয়েত, কাতার, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে আটটি স্থায়ী ঘাঁটি রয়েছে।

১৯৫৮ সালের জুলাইয়ে লেবানন সংকটের সময় মধ্যপ্রাচ্যে প্রথমবারের মতো মার্কিন সেনা মোতায়েন করা হয়। ওই সময় লেবাননে সর্বোচ্চ প্রায় ১৫ হাজার মেরিন ও সেনাসদস্য অবস্থান করেছিলেন।

২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ৪০ হাজার থেকে ৫০ হাজার সেনা ছিল বলে বিভিন্ন হিসাবের উল্লেখ করা হয়েছে। বড় স্থায়ী ঘাঁটির পাশাপাশি ছোট ছোট সামরিক অবস্থানে তারা মোতায়েন রয়েছেন।

ইরান যুদ্ধের আগে কী ধরনের সামরিক শক্তি পাঠিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র?

ওপেন সোর্স গোয়েন্দা বিশ্লেষক ও সামরিক উড়োজাহাজ পর্যবেক্ষণ তথ্য অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারির শুরু থেকে মধ্যপ্রাচ্যে ১২০টির বেশি সামরিক উড়োজাহাজ মোতায়েন করেছে যুক্তরাষ্ট্র। ২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধের পর মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন বিমানবাহিনীর এটিই সবচেয়ে শক্তিশালী অবস্থান বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এসব উড়োজাহাজের মধ্যে রয়েছে ই-৩ সেন্ট্রি এয়ারবর্ন ওয়ার্নিং অ্যান্ড কন্ট্রোল সিস্টেম (অ্যাওয়াক্স), এফ-৩৫ স্টেলথ যুদ্ধবিমান, এফ-২২ যুদ্ধবিমান এবং এফ-১৫ ও এফ-১৬ যুদ্ধবিমান।

সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের ঘাঁটি থেকে এসব উড়োজাহাজের অনেকগুলো রওনা হচ্ছে এবং কার্গো বিমান ও মাঝ আকাশে জ্বালানি সরবরাহকারী ট্যাংকারের সহায়তা পাচ্ছে। তাদের মতে, এটি নিয়মিত মোতায়েনের বদলে দীর্ঘমেয়াদি সামরিক প্রস্তুতির ইঙ্গিত দিচ্ছে।

গত মার্চে উপসাগরীয় অঞ্চলে আরো মার্কিন সেনা পাঠানোর নির্দেশ দেয় পেন্টাগন। এর মধ্যে ছিল ইউএসএস ট্রিপোলিকে কেন্দ্র করে ট্রিপোলি অ্যামফিবিয়াস রেডি গ্রুপ ও ৩১তম মেরিন এক্সপেডিশনারি ইউনিট, ইউএসএস বক্সারকে কেন্দ্র করে বক্সার অ্যামফিবিয়াস রেডি গ্রুপ ও ১১তম মেরিন এক্সপেডিশনারি ইউনিট এবং নর্থ ক্যারোলিনার ফোর্ট ব্র্যাগ থেকে ৮২তম এয়ারবর্ন ডিভিশনের প্রায় ২ হাজার সেনা।

দুটি মেরিন ইউনিট মিলিয়ে এ অঞ্চলে অতিরিক্ত ৪ হাজার ৫০০ মেরিন ও নাবিক মোতায়েন হয়েছে। সব মিলিয়ে ইরান যুদ্ধ শুরুর পর মধ্যপ্রাচ্যে প্রায় ৭ হাজার অতিরিক্ত মার্কিন সেনা মোতায়েন করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

নতুন সেনা মোতায়েন কী বার্তা দিচ্ছে?

নতুন সেনা ও সামরিক সরঞ্জাম মোতায়েনের কারণ দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধ কিনা, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে বৃহস্পতিবার প্রকাশিত টাইম ম্যাগাজিনকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেছেন, মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানে বোমাবর্ষণ আরো বাড়ানো হতে পারে। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে চাইলে ট্রাম্প বলেন, তিনি তা বলতে পারবেন না।

কিছু বিশ্লেষকের মতে, ইরানের সঙ্গে আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান শক্তিশালী করার কৌশল হিসেবেও নতুন করে এ সেনা মোতায়েন করা হয়ে থাকতে পারে।

কোন পর্যায়ে কূটনৈতিক আলোচনা?

বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পরোক্ষ শান্তি আলোচনা মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে অব্যাহত রয়েছে। তবে এখনো এতে কোনো বড় অগ্রগতি হয়নি।

গত মাসে নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের (ইউএনজিএ) সাইডলাইনে কাতারের মধ্যস্থতায় অনুষ্ঠিত আলোচনায় হরমুজ প্রণালি পুনরায় খোলার বিষয়টি অন্যতম জটিল ইস্যু হয়ে ওঠে। আলোচনায় ইরান কাতারের মাধ্যমে সাত দিনের একটি রোডম্যাপ প্রস্তাব করে। এতে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেয়া এবং পারমাণবিক আলোচনা শুরুর বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ প্রত্যাহার, নিষেধাজ্ঞা শিথিল এবং লেবানন ও ইয়েমেনকে অন্তর্ভুক্ত করে আঞ্চলিক যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দেয়া হয়।

ওই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে ট্রাম্প প্রশাসন। বিশ্লেষকদের মতে, চুক্তিতে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির মতো অন্যান্য বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত করতে চায় যুক্তরাষ্ট্র। টাইমকে দেয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ইরানের সর্বশেষ যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব তিনি প্রত্যাখ্যান করেছেন। তার দাবি, প্রস্তাবে এমন কিছু বিষয় ছিল যা তিনি এক বছর আগেও অনুমোদন করতেন না এবং এখনো করবেন না।

জাতিসংঘে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক ওয়াল্টজ এনবিসিকে বলেন, ইরানের জব্দ করা অর্থ ছাড় ও নিষেধাজ্ঞা শিথিলের দাবি মেনে নেওয়া সম্ভব নয়। তিনি বলেন, এসব নিষেধাজ্ঞার সবই শুধু যুক্তরাষ্ট্রের নয়; আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞাও এর সঙ্গে যুক্ত। ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচির বিষয়ে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সাতটি প্রস্তাবের কথাও তিনি উল্লেখ করেন।

জবাবে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এনবিসিকে বলেন, আবার যুদ্ধ শুরু করতে পুরোপুরি প্রস্তুত ইরান। পরে এক্সে দেয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, আমরা যুদ্ধ বিক্রি করতে নিউইয়র্কে আসিনি। আমরা শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য এসেছি।

সবশেষ বৃহস্পতিবার রাতে ট্রাম্প সতর্ক করে বলেন, বর্তমান সংঘাত খুব শিগগিরই শেষ হবে। ওয়াশিংটনের সঙ্গে চুক্তিতে না পৌঁছালে ইরানের জন্য ভয়াবহ পরিণতি অপেক্ষা করছে বলেও হুঁশিয়ারি দেন তিনি।

টেক্সাসের ডেন্টনে পিটারবিল্ট মোটরসের একটি কারখানায় দেয়া বক্তব্যে ট্রাম্প বলেন, ইরানকে হয় খুব সঠিক ও বুদ্ধিমান কিছু করতে হবে, নয়তো তাদের জন্য বেশিদিন টিকে থাকা কঠিন হবে।

কোনো চুক্তি হলে ইরান সেটি মেনে চলবে কি না, তা নিয়েও সংশয় প্রকাশ করেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করলে সেটি চুক্তির শর্ত মানবে—কিন্তু ইরানের সঙ্গে চুক্তির ক্ষেত্রে তা নাও হতে পারে।

আরও