জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, কম মজুরি ও আবাসন সংকটের প্রতিবাদে ইউরোপজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে বিক্ষোভ। গত সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি থেকে অক্টোবরের শেষ পর্যন্ত ৩১টি দেশে ১ হাজার ৭০০টির বেশি বিক্ষোভ ও সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এ আন্দোলনের কেন্দ্র হয়ে উঠেছে ফ্রান্স। দেশটিতে শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষের দুরবস্থা নিয়ে শুরু হওয়া প্রতিবাদ ক্রমে বিস্তৃত হয়েছে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও সরকারি সেবার ঘাটতির বিরুদ্ধে আন্দোলনে।
প্রায় দুই মাস আগে উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া বিক্ষোভ এখনো থামার লক্ষণ দেখাচ্ছে না। দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, গতকাল ফ্রান্সজুড়ে ১ লাখ ৪৬ হাজার মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন। এর মধ্যে রাজধানী প্যারিসে ছিলেন ৪৬ হাজার। তবে শ্রমিক সংগঠনগুলোর দাবি, দেশজুড়ে বিক্ষোভকারীর সংখ্যা ছিল ২ লাখ ৫০ হাজার, যার মধ্যে প্যারিসে ছিলেন ৭৫ হাজার।
আগের সপ্তাহগুলোর তুলনায় শনিবারের বিক্ষোভে অংশগ্রহণকারী কমলেও প্যারিসে বিক্ষোভকারীদের ওপর কাঁদানে গ্যাস ও লাঠিপেটা করে পুলিশ। দেশটির তৃতীয় বৃহত্তম শহর লিওঁর কেন্দ্রীয় সড়কে অবরোধকারীদের ওপরও নিক্ষেপ করা হয় কাঁদানে গ্যাসের শেল। এদিন নিরাপত্তা বাহিনীর প্রায় ৭০ হাজার সদস্য মোতায়েন করা হয়। এর কয়েক দিন আগে শ্রমিক সংগঠনগুলোর আয়োজিত এক সমাবেশে আনুমানিক ৫ লাখ ৭৫ হাজার মানুষ অংশ নিয়েছিলেন।
জ্বালানির উচ্চমূল্য, মজুরি, সামাজিক আবাসনসহ বিভিন্ন ইস্যুতে বিস্তৃত হয়েছে বিক্ষোভ। কোনো কোনো স্থানে আন্দোলন ঘিরে ঘটেছে লুটপাট ও সহিংসতা। অন্যদিকে বিক্ষোভ দমনে পুলিশ অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে ব্যারিকেড, কাঁদানে গ্যাস ও লাঠিচার্জ ব্যবহারের ঘটনাও ঘটেছে।
আর্মড কনফ্লিক্ট লোকেশন অ্যান্ড ইভেন্ট ডেটা (এসিএলইডি)-এর তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ১৫ সেপ্টেম্বর থেকে ৩০ অক্টোবর পর্যন্ত ফ্রান্সে শিক্ষা, সরকারি সেবা ও জীবনযাত্রার ব্যয়সংক্রান্ত ইস্যুতে ১০০ বা তার বেশি মানুষের অংশগ্রহণে ১ হাজার ২০০টির বেশি বিক্ষোভ ও দাঙ্গার ঘটনা ঘটেছে।
সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি উচ্চবিদ্যালয়গুলোয় এ আন্দোলনের সূত্রপাত। অতিরিক্ত শিক্ষার্থী, শিক্ষক সংকট ও জরাজীর্ণ ভবন নিয়ে ক্ষোভ থেকে আন্দোলনে নামে শিক্ষার্থীরা। পরে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে তা বিস্তৃত হয়। এতে যুক্ত হয় শ্রমিক সংগঠন ও ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলনের কর্মীরা। বিক্ষোভের পাশাপাশি বিভিন্ন স্থানে দাঙ্গা ও লুটপাটের ঘটনাও ঘটে।
গত ১৭ অক্টোবর এক দিনেই দেশজুড়ে বিক্ষোভে অংশ নেন ৫ লাখের বেশি মানুষ। ফরাসি সরকারের হিসাব অনুযায়ী এ সংখ্যা।
এসিএলইডির প্রধান নির্বাহী ক্লিওনাধ র্যালি ১৯ অক্টোবর জানান, গত পাঁচ বছরে ফ্রান্সে প্রতিদিন গড়ে ২০ দশমিক ৫টি বিক্ষোভের ঘটনা নথিভুক্ত করেছে সংস্থাটি। তবে চলমান আন্দোলনে এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬৬-তে, যা স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় তিন গুণেরও বেশি।
র্যালির মতে, সাধারণত কোনো বিক্ষোভের ধারাবাহিকতা প্রায় ২০ দিন স্থায়ী হয়। বড় আন্দোলনের ক্ষেত্রে তা ৩৬ দিন পর্যন্ত গড়াতে পারে। তবে এসিএলইডির হিসাব অনুযায়ী, ফ্রান্সের চলমান আন্দোলন ইতোমধ্যে ৪৫ দিন অতিক্রম করেছে এবং এখনো চলছে।
তিনি বলেন, তবে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য সংঘাতের মাত্রায়। চলমান আন্দোলনের প্রায় এক-চতুর্থাংশ বা ২৪ দশমিক ২ শতাংশ ঘটনাকে দাঙ্গা হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছে। আগের আন্দোলনগুলোর ক্ষেত্রে এ হার ছিল গড়ে মাত্র ১ দশমিক ৯ শতাংশ।
বিক্ষোভ মোকাবেলায় পুলিশের ভূমিকা নিয়েও সমালোচনা উঠেছে। গত ২৮ অক্টোবর জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদের ম্যান্ডেটপ্রাপ্ত চার বিশেষজ্ঞ ফ্রান্সে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ ছত্রভঙ্গ করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ‘অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ’ নিয়ে উদ্বেগ জানান।
এক বিবৃতিতে তারা বলেন, কয়েক হাজার মানুষকে গ্রেফতার ও আটক করার ঘটনা—যাদের বেশির ভাগই অপ্রাপ্তবয়স্ক—মাত্রাতিরিক্ত বলে মনে হচ্ছে। এ ধরনের পদক্ষেপ বিক্ষোভকারীদের মতপ্রকাশ ও শান্তিপূর্ণ সমাবেশের স্বাধীনতা চর্চায় বাধা সৃষ্টি করছে।
দেশটির উত্তরের শহর লিলে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের সময় একটি গ্রেনেড বিস্ফোরণে এক কিশোরের হাত বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
শুধু ফ্রান্সেই সীমাবদ্ধ নেই এ আন্দোলন। সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি থেকে পর্তুগাল থেকে পোল্যান্ড পর্যন্ত ইউরোপের আরো ৩০টি দেশে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, কম মজুরি ও সরকারি সেবার ঘাটতি নিয়ে বিক্ষোভ হয়েছে।
এসিএলইডির তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ১৫ সেপ্টেম্বর থেকে ৩০ অক্টোবর পর্যন্ত ইউরোপজুড়ে ১০০ বা তার বেশি মানুষের অংশগ্রহণে ১ হাজার ৭০০টির বেশি বিক্ষোভ ও দাঙ্গার ঘটনা ঘটেছে।
ফ্রান্সের তুলনায় অন্য দেশগুলোয় আন্দোলনের ব্যাপ্তি কম হলেও অসন্তোষ সীমান্ত ছাড়িয়ে ছড়িয়ে পড়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে এসব ঘটনা। গত মাসে আল জাজিরাকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে এমন মন্তব্য করেন এইচইসি প্যারিস বিজনেস স্কুলের ইউরোপীয় ইউনিয়নের আইন ও নীতিবিষয়ক অধ্যাপক আলবার্তো আলেমান্নো।
তিনি বলেন, এ আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু ফ্রান্স। তবে এখন এর বিস্তার দেশটির সীমানা ছাড়িয়ে যাওয়ার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে।
আন্দোলনের সংখ্যায় শীর্ষে রয়েছে ফ্রান্স। তবে একই সময়ে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ার পেছনে রয়েছে কিছু অভিন্ন কারণ—শিক্ষা খাতে পর্যাপ্ত অর্থায়নের অভাব, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং নাগালের বাইরে চলে যাওয়া আবাসন ব্যয়।
এসিএলইডির তথ্য বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ১৫ সেপ্টেম্বর থেকে ৩০ অক্টোবর পর্যন্ত ফ্রান্সে ১ হাজার ২০০টির বেশি বিক্ষোভ ও দাঙ্গার ঘটনা ঘটেছে। এরপর রয়েছে স্পেন ১৭৩টি, ইতালি ১৬০টি, জার্মানি ৭০টি এবং পর্তুগাল ৩৩টি।
স্পেনে অক্টোবরের শুরুতে কয়েক হাজার মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন। ২ অক্টোবর পার্লামেন্ট জরুরি আবাসনসংক্রান্ত দুটি অধ্যাদেশ প্রত্যাখ্যান করার পর এ আন্দোলন জোরালো হয়। এতে প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজের সংখ্যালঘু সরকার রাজনৈতিক ধাক্কার মুখে পড়ে।
ইতালিতে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও আবাসন সংকট নিয়ে বিক্ষোভের সময় পুলিশের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। অন্যদিকে পর্তুগালের প্রধান শহরগুলোয় জীবনযাত্রার ব্যয়, কম মজুরি ও আবাসন সংকটের প্রতিবাদে রাজপথে নামেন হাজার হাজার মানুষ।
আল জাজিরার এক্সপ্লেইনার অনুসরণে