রাশিয়ার গ্যাস এড়াতে আজারবাইজানের মানবাধিকার বিষয়ে নীরব ইইউ

ইউরোপীয় ইউনিয়নের মিত্রতাকে কাজে লাগিয়ে নাগার্নো-কারাবাখে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে আজারবাইজানের সরকার। যার ফলে সেখানকার পুরো আর্মেনীয় জনগোষ্ঠী অঞ্চল ছাড়তে বাধ্য হয়েছে। সেই সঙ্গে বিতর্কিত নির্বাচনের মাধ্যমে পঞ্চম মেয়াদে ক্ষমতায় বসেন আলিয়েভ। বাড়ছে থাকে দেশটির বিরোধী দল, সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মীদের ওপর নিপীড়ন।

আজারবাইজানে শান্তিকর্মী ও সাংবাদিকদের ওপর দমন-পীড়নের ঘটনায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) নীরবতা ও নমনীয় অবস্থান নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়েছে। বিশ্লেষক ও অধিকারকর্মীরা বলছেন, রাশিয়ার গ্যাসের বিকল্প খুঁজতে গিয়ে ইইউ মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়গুলো উপেক্ষা করছে।

গত মাসে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে ৩০ বছর বয়সী শান্তিকর্মী বাহরুজ সামাদভকে ১৫ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছে আজারবাইজান সরকার। এটি প্রেসিডেন্ট ইলহাম আলিয়েভের ২১ বছরের শাসনামলে বিরোধীদের বিরুদ্ধে সবচেয়ে দীর্ঘ ও কঠোর সাজা। তবে এই রায়ের পর আজারবাইজান সরকারের চেয়ে বেশি সমালোচিত হচ্ছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। জোটটির নীরবতার সুযোগেই আজারবাইজানে মানবাধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে বলে অভিযোগ অধিকারকর্মীদের।

২০২২ সালে রাশিয়া ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন শুরু আজারবাইজানকে ইইউর ‘মূল অংশীদার’ হিসেবে অভিহিত করেন ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লিয়েন। যা ছিল মূলত গ্যাস সরবরাহে রাশিয়ার ওপর নির্ভরতা কমানোর কৌশল।

তবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের এই মিত্রতাকে কাজে লাগিয়ে আলিয়েভ সরকার নাগার্নো-কারাবাখে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে, যার ফলে সেখানকার পুরো আর্মেনীয় জনগোষ্ঠী অঞ্চল ছাড়তে বাধ্য হয়। সেই সঙ্গে বিতর্কিত নির্বাচনের মাধ্যমে পঞ্চম মেয়াদে ক্ষমতায় বসেন আলিয়েভ। বাড়তে থাকে দেশটির বিরোধী দল, সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মীদের ওপর নিপীড়ন।

এরপরেও ইইউর শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তারা প্রকাশ্যে আজারবাইজান সরকারের কঠোর অবস্থানের বিরুদ্ধে তেমন কিছু বলেননি। বরং এপ্রিলে ইইউর পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক প্রধান কায়া কাল্লাস বাকু সফর করেছেন। সেসময় তিনি আজারবাইজান-ইইউ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ‘বৃহৎ সম্ভাবনার’ কথা বলেন। অধিকারকর্মীরা বলছে, কায়া কাল্লাস বাকু সফরের সময়ে বেআইনিভাবে অন্তত ২১ জন সাংবাদিক কারাগারে ছিলেন।

আর এরপরেই ইউরোপীয় ইউনিয়নের কৌশলগত অবস্থান নিয়ে সমালোচনা শুরু হয়। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও আজারবাইজানি বিরোধীরা বলছেন, কৌশলগত সুবিধার জন্য ইউরোপ তাদের মূল্যবোধ বিসর্জন দিচ্ছে। ইইউ অবশ্য এই সমালোচনা প্রত্যাখ্যান করেছে। এক মুখপাত্র বিবিসিকে বলেন, ‘আমরা আজারবাইজানে নাগরিক পরিসরের সংকোচন নিয়ে উদ্বিগ্ন। যাদের ভিত্তিহীনভাবে বন্দী করা হয়েছে, প্রকাশ্যে গোপন আলোচনায় আমরা তাদের মুক্তির আহ্বান জানিয়ে আসছি।’

তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইইউয়ের নীতিতে স্পষ্ট দ্বৈত মানদণ্ড লক্ষ্য করা যাচ্ছে। কারণ একদিকে আজারবাইজান ইইউর গ্যাসের মাত্র ৪ দশমিক ৩ শতাংশ সরবরাহ করে। তবুও কিছু সদস্য রাষ্ট্র—যেমন বুলগেরিয়া, গ্রিস ও ইতালি —এই দেশের গ্যাসের ওপর অনেক বেশি নির্ভরশীল। বিশ্লেষক বেঞ্জামিন গডউইনের মতে, ‘ইইউ আজারবাইজানের গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল না হলেও, রাশিয়ার বিকল্প উৎস হিসেবে তারা নির্ভরতা বাড়াতে চায়।’

এ কারণে আজারবাইজানের বিরুদ্ধে ইইউর পক্ষ থেকে কোনো ঐক্যবদ্ধ ও কড়া পদক্ষেপ নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। এক সিনিয়র ইউরোপীয় কূটনীতিক বলেন, ‘এই পরিস্থিতিতে ইউরোপের হাতে আজারবাইজানের ওপর চাপ প্রয়োগের বাস্তবিক কোনো সক্ষমতা নেই।’ মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের অবস্থান অপরিবর্তিত রয়েছে বলেও দাবি করেছে ইইউ।

এদিকে আজারবাইজান সম্প্রতি রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্কেও দূরত্ব তৈরি করেছে। রুশ ক্ষেপণাস্ত্রের কারণে একটি আজারবাইজানি বিমান দুর্ঘটনায় পড়ে ৩৮ জন নিহত হওয়ার পর পরিস্থিতি আরো উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের কৌশলগত অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে আলিয়েভ একদিকে রাশিয়াকে চ্যালেঞ্জ করছেন, অন্যদিকে ইউরোপের কাছে নিজেকে পুতিন-বিরোধী হিসেবে উপস্থাপন করছেন।

এক ইউরোপীয় কূটনীতিক বলছেন, ‘আজারবাইজান সবদিক থেকেই কূটনৈতিক সুবিধা নিচ্ছে, জানে সবাই তাদের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক রাখতে চায়, আর সেই সুযোগটাই তারা কাজে লাগাচ্ছে।’

আরও