নেপাল-তিব্বতে বন্যায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৫৮৪, নিখোঁজ ৫৭৫ বিদেশীসহ আড়াই হাজার

উদ্ধারকারী দলগুলো দুর্গত এলাকায় জীবিতদের উদ্ধারে দ্রুত কাজ করছে। তাদের পাশাপাশি নেপালের সেনারা প্রশিক্ষিত কুকুর দিয়ে ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়া মরদেহের সন্ধান চালাচ্ছেন। তারা জানিয়েছেন, নিহতদের পরিচয় শনাক্ত করা এবং মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠছে। এখনো প্রায় আড়াই হাজার মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। তাদের মধ্যে অনেকেই বিদেশী পর্যটক, যাদের মধ্যে হিমালয় পাদদেশে নেপালে ভ্রমণে যাওয়া ট্রেকাররাও রয়েছেন। এছাড়া তিব্বতের পবিত্র তুষারঢাকা কৈলাস পর্বতে তীর্থযাত্রায় যাওয়া বহু হিন্দু তীর্থযাত্রীও নিখোঁজ রয়েছেন।

নেপাল-চীন সীমান্ত এলাকায় হিমবাহ ধসে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যায় শুক্রবার রাত পর্যন্ত বিভিন্ন এলাকা থেকে ৫৮৪ মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে নেপালে প্রাণ হারিয়েছেন ৫৭৯ জন। আর চীনা কর্তৃপক্ষ তিব্বত অঞ্চলে পাঁচজনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে। আহত হয়েছেন আরো ১ হাজার ৪৭৩ জন।

দুর্ঘটনার দুদিন পর এখনো প্রায় আড়াই হাজার মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। তাদের মধ্যে নেপালে ৫৭৫ বিদেশী পর্যটকসহ ১ হাজার ৯২৪ জন ও তিব্বতে ৫৫৮ জনের সন্ধান পাওয়া যায়নি। এছাড়া এখন পর্যন্ত প্রায় ৪ হাজার মানুষকে উদ্ধার করা হয়েছে। খবর বিবিসি, রয়টার্স।

শুক্রবার আন্তর্জাতিক রেড ক্রস ও রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটিগুলোর ফেডারেশনের প্রতিনিধি দলের প্রধান ডেভিড ফিশার বলেন, আমাদের ধারণা, অন্তত ৯৩ হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তাদের ব্যাপক সহায়তা প্রয়োজন। তবে আমরা দ্বিতীয় দফার বন্যা নিয়ে অত্যন্ত উদ্বিগ্ন।

উদ্ধারকারী দলগুলো দুর্গত এলাকায় জীবিতদের উদ্ধারে দ্রুত কাজ করছে। তাদের পাশাপাশি নেপালের সেনারা প্রশিক্ষিত কুকুর দিয়ে ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়া মরদেহের সন্ধান চালাচ্ছেন। তারা জানিয়েছেন, নিহতদের পরিচয় শনাক্ত করা এবং মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠছে। এখনো প্রায় আড়াই হাজার মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। তাদের মধ্যে অনেকেই বিদেশী পর্যটক, যাদের মধ্যে হিমালয় পাদদেশে নেপালে ভ্রমণে যাওয়া ট্রেকাররাও রয়েছেন। এছাড়া তিব্বতের পবিত্র তুষারঢাকা কৈলাস পর্বতে তীর্থযাত্রায় যাওয়া বহু হিন্দু তীর্থযাত্রীও নিখোঁজ রয়েছেন।

বিবিসি জানিয়েছে, সবচেয়ে বেশি মরদেহ পাওয়া গেছে চিতওয়ান, নওয়ালপরাসি পশ্চিম ও নওয়ালপরাসি পূর্বের নারায়ণী নদী থেকে। এর মধ্যে রাসুয়া নদী থেকে ১২ জন, নুয়াকোট নদী থেকে ৩৭ জন, ধাদিং নদী থেকে ৩৩ জন, খোরখা নদী থেকে ৪৬ জন, চিতওয়ান থেকে ২৮, পশ্চিম নওয়ালপরাসি থেকে ১৩৪ এবং পূর্ব নওয়ালপরাসি থেকে ২২১ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।

এদিকে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা থেকে অধিকাংশ মরদেহ নদীর স্রোতে ভেসে নিচের দিকে চলে গেছে। নেপালের জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, কাঠমান্ডু থেকে প্রায় ১৮৬ কিলোমিটার দক্ষিণে চিতওয়ানে ২২১টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এ ছাড়া কাঠমান্ডু থেকে প্রায় ২০০ কিলোমিটার দক্ষিণে নওয়ালপরাসি পূর্ব এলাকা থেকে ১৩৪টি মরদেহ পাওয়া গেছে।

চিতওয়ানের চিফ ডিস্ট্রিক্ট অফিসার গণেশ আরিয়াল বলেছেন, অনেক মরদেহের অবস্থা ভালো নেই। ফলে সেগুলো সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা কঠিন হয়ে পড়েছে। স্থানীয় হাসপাতালের মর্গেও আর মরদেহ রাখার জায়গা নেই। এ কারণে মরদেহ রাখার জন্য আপাতত একটি সরকারি ভবন নির্ধারণ করেছে কর্তৃপক্ষ।

নেপালের সীমান্তবর্তী শহর তিমুরেতে পাহাড়ের ওপর থেকে উদ্ধার হওয়া ৩৫ বছর বয়সী নেপালি কাস্টমস কর্মকর্তা ওমকার যোশি বলেন, এটা যেন বিশাল এক কবরস্থান। এতে পড়ে আছে শুধু বালি আর নুড়িপাথর, মানুষের রক্তে সেগুলো লাল হয়ে গেছে।

নেপাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এরই মধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চল থেকে চার হাজার মানুষকে উদ্ধার করা হয়েছে। রাজধানী কাঠমান্ডুর বিভিন্ন হাসপাতালে অনেকে চিকিৎসা নিচ্ছেন। নিখোঁজদের মধ্যে বিভিন্ন দেশের নাগরিকও রয়েছেন। তাদের অনেকেই ট্রেকার ও তীর্থযাত্রী।

বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত নেপালের নুওয়াকোট জেলার বিভিন্ন ভবন ও সড়ক কাদায় ঢেকে গেছে। গাছের সঙ্গে আটকে আছে ধ্বংসাবশেষ। বেঁচে যাওয়া মানুষদের অনেককেই কাদায় মাখা অবস্থায় দেখা গেছে।

তিব্বতের শিগাতসে প্রিফেকচারে নদীর পাশ দিয়ে যাওয়া দুই লেনের একটি সড়ক পুরোপুরি মাটির নিচে চাপা পড়েছে। আকাশ থেকে ধারণ করা ছবিতে চীন-নেপাল সীমান্ত এলাকায় একটি হ্রদ তৈরি হয়ে বড় হতে দেখা গেছে। সেখানে সম্ভাব্য বাঁধ ভেঙে যাওয়ার বিষয়ে সতর্ক করেছে কর্তৃপক্ষ।

হিমালয় অঞ্চলের স্যাটেলাইট ছবি নিয়ে গবেষণা করা বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, ওই অঞ্চলের একটি হিমবাহের নিচের শিলাস্তর ধসে পড়েছিল। এতে হিমবাহের একটি অংশও ধসে যায়। শিলা ও গলিত পানি নিচের উপত্যকার নদীগুলোয় গিয়ে জমা হওয়ায় পানির প্রবাহ বেড়ে যায়। একপর্যায়ে কয়েক তলা ভবনের সমান উচ্চতার পানির স্রোত তৈরি হয়ে ভবন, সেতু ও মাটি ভাসিয়ে নিয়ে যায়।

এদিকে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যার ধকল কাটিয়ে ওঠার আগেই নতুন করে বিপদের মুখে পড়েছে। নেপাল-চীন সীমান্তবর্তী দুর্গত এলাকা। সাম্প্রতিক বন্যায় হিমবাহ ও বরফ-শিলার ধ্বংসাবশেষে নদীর প্রবাহ আটকে তৈরি হওয়া একটি অস্থায়ী ব্যারিয়ার লেকের পানি উপচে পড়তে শুরু করেছে। এতে ইতিমধ্যে বিপর্যস্ত এলাকাগুলোয় আবারও আকস্মিক বন্যার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ঝুঁকি বিবেচনায় কিছু সময়ের জন্য উদ্ধারকাজও বন্ধ রাখা হয়েছে।

কাঠমান্ডুভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ডেভেলপমেন্টের জলবায়ু ও পরিবেশগত ঝুঁকি বিভাগের প্রধান কিয়াংগং ঝাং বলেন, নেপাল-চীন সীমান্তের নদীর উজানে এখনো একটি বড় ধরনের বাধা রয়েছে। কর্তৃপক্ষ সতর্ক করেছে, এর ফলে দ্বিতীয় দফায় বন্যা দেখা দিতে পারে।

নেপালের বন্যা পূর্বাভাস বিভাগ বৃহস্পতিবার একটি ‘বিশেষ সতর্কবার্তা’ জারি করেছে। এতে ভূমিধসে তৈরি ধ্বংসাবশেষের কারণে একটি হ্রদের মতো জলাধার তৈরি হওয়ার কথা জানিয়ে সবাইকে অত্যন্ত সতর্ক থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে।

নেপালের বন্যাকবলিত রাসুয়া জেলার জ্যেষ্ঠ সরকারি কর্মকর্তা নরেন্দ্র পারিয়ার বলেন, হ্রদের পানি উপচে পড়ার বিষয়ে সতর্কবার্তা পাওয়া গেছে। তবে ঠিক কতটা পানি বেরিয়ে এসেছে বা হ্রদটির পানির উচ্চতা কত, তা তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি। নদীর পানির উচ্চতা বাড়ছে বলেও জানান তিনি।

এদিকে পানি বাড়ার খবর ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দেয়। প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে অনেকে উঁচু এলাকায় ছুটে যান। নদীর কাছাকাছি না যেতে মাইকিং করে সতর্ক করা হয়। পুলিশ সদস্যদের দড়ি ও স্ট্রেচার নিয়ে প্রস্তুত রাখা হয়।

নতুন করে পানি বাড়ার আশঙ্কায় নেপাল ও চীনের উদ্ধারকর্মীদেরও সাময়িকভাবে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেয়া হয়। নেপালে প্রায় ৯০ মিনিট উদ্ধারকাজ বন্ধ থাকার পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণযোগ্য মনে হলে তা আবার শুরু করা হয়। চীনের তিব্বতেও উদ্ধারকর্মী ও যানবাহন নিরাপদ এলাকায় সরিয়ে রাখা হয়েছিল।

আরও