যুক্তরাষ্ট্র-কানাডার শুল্কযুদ্ধের খরচ শেষ পর্যন্ত গুনতে হবে ভোক্তাকে

যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মধ্যে নতুন করে শুরু হয়েছে পাল্টাপাল্টি শুল্কারোপ। এর প্রভাব পড়ছে দুই দেশের ব্যবসা থেকে শুরু করে ভোক্তা পর্যায়ে।

গাড়ি, নির্মাণসামগ্রী, আসবাব, গৃহস্থালি পণ্যসহ বিভিন্ন পণ্যের দাম বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে এরই মধ্যে। একই সঙ্গে ব্যবসার খরচ ও অনিশ্চয়তা বাড়ছে।

নতুন এ শুল্কযুদ্ধে দুই দেশের সাধারণ মানুষ ও ব্যবসার ওপর কী ধরনের প্রভাব পড়তে পারে, তা উঠে এসেছে বিবিসির বিশ্লেষণে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, উত্তর আমেরিকার দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে কয়েক মাস ধরে চলা বাণিজ্য উত্তেজনা নতুন মাত্রা পেয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয়বার হোয়াইট হাউজে ফেরার পর থেকেই দুই দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক বিরোধ চলছে। এরই মধ্যে গত সপ্তাহের শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মধ্যে একটি বাণিজ্য আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার পর দুই দেশের বাণিজ্য বিরোধে উত্তেজনা বাড়ে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আরোপ করা সর্বশেষ দফার শুল্কের জবাব হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন পণ্যের ওপর সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ পর্যন্ত পাল্টা শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেয় কানাডাও।

বিশ্লেষকরা বলছেন, নতুন এ শুল্কযুদ্ধের সরাসরি প্রভাব পড়বে দুই দেশের সাধারণ মানুষ ও ব্যবসা-বাণিজ্যের ওপর। বিশেষ করে গাড়ি, বাড়ি নির্মাণ, গৃহস্থালি পণ্য ও অ্যালকোহল খাতে এর প্রভাব স্পষ্ট হতে পারে। তবে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি শুধু পণ্যের দাম বাড়া নয়। দীর্ঘমেয়াদে চাকরি, বিনিয়োগ ও সীমান্তপারের ব্যবসাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

গাড়ির দাম বাড়ার আশঙ্কা

শুল্কযুদ্ধের বড় শিকার হতে পারে গাড়ির বাজার। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর মধ্যে গাড়ি, ট্রাক ও যন্ত্রাংশের বড় ধরনের বাণিজ্য রয়েছে। এসব পণ্যের উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থা তিন দেশের সীমান্ত পেরিয়ে বিস্তৃত। ফলে একটি দেশে শুল্ক বাড়লে তার প্রভাব অন্য দেশেও পড়ে।

ট্রাম্প কানাডায় তৈরি গাড়ির ওপর শুল্ক ২৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫০ শতাংশ করার হুমকি দিয়েছেন। এ শুল্ক ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারি থেকে কার্যকর হতে পারে। এমনটা হলে কানাডার গাড়ি শিল্পের ওপর আরো চাপ তৈরি হবে।

আগের শুল্কের কারণে গাড়ি নির্মাতাদের উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে। তবে এখন পর্যন্ত এর বড় অংশ সামাল দিয়েছে গাড়ির ডিলাররা। অক্সফোর্ড ইকোনমিকসের প্রধান অর্থনীতিবিদ বার্নার্ড ইয়ারোসের মতে, সে চাপ সামলানোর সক্ষমতা এখন কমে আসছে। নতুন করে ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ হলে বাড়তি ব্যয় সরাসরি ভোক্তার ওপর পড়ার সম্ভাবনা বেশি।

তিনি জানান, ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে গাড়ির দাম বাড়তে পারে। নতুন গাড়ির সরবরাহ কমে গেলে তুলনামূলক কম দামের গাড়ির সংকটও দেখা দিতে পারে। এতে গাড়ি নির্মাতারা বেশি লাভজনক বিলাসবহুল গাড়ি, এসইউভি ও পিকআপ ট্রাক তৈরিতে বেশি মনোযোগ দিতে পারেন। একই সঙ্গে ব্যবহৃত গাড়ির দামও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

কানাডার পক্ষ থেকেও যুক্তরাষ্ট্রের গাড়িতে ২৫ শতাংশ আমদানি শুল্ক রয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত ট্রাম্পের প্রস্তাবিত ৫০ শতাংশ হারের সঙ্গে মিল রেখে এ খাতে শুল্ক বাড়ায়নি কানাডা।

বাড়তে পারে বাড়ি নির্মাণের খরচ

শুল্কযুদ্ধের আরেকটি বড় প্রভাব পড়তে পারে আবাসন খাতে। ইস্পাত, অ্যালুমিনিয়াম ও কাঠের মতো নির্মাণসামগ্রীতে আগে থেকেই শুল্ক ছিল। কানাডা নতুন করে ধাতব পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের সমান ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছে।

এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা প্লাইউডসহ বিভিন্ন কাঠজাত পণ্যে শুল্ক বসিয়েছে কানাডা। কাঠ জোড়া লাগাতে ব্যবহৃত স্ক্রুর মতো ছোট পণ্যও রয়েছে এর আওতায়। ফলে সামনের দিনে নির্মাণ প্রতিষ্ঠানগুলোর খরচ বাড়বে। সে বাড়তি ব্যয় যোগ হতে পারে পণ্যের দামে। শেষ পর্যন্ত এর প্রভাব পড়তে পারে নতুন বাড়ির দামে। অর্থাৎ শুল্কযুদ্ধের কারণে শুধু আমদানিকারক বা নির্মাণ প্রতিষ্ঠান নয়, বাড়ি কিনতে যাওয়া সাধারণ মানুষও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

কানাডার ফরেস্ট প্রডাক্টস অ্যাসোসিয়েশন জানায়, দুই দেশের বাজারেই খরচ বাড়াবে শুল্ক। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অব হোম বিল্ডার্সের চেয়ারম্যান বিল ওয়েন্সও নির্মাণসামগ্রীকে শুল্কের আওতার বাইরে রাখার আহ্বান জানান। তার মতে, যুক্তরাষ্ট্রে এমনিতেই আবাসনের ব্যয় সাধারণ মানুষের জন্য বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। নির্মাণসামগ্রীর ওপর শুল্ক বাড়লে সে সংকট আরো বাড়বে।

গৃহস্থালি পণ্যে বিকল্পের সুযোগ

কানাডার নতুন শুল্কের আওতায় রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন গৃহস্থালি পণ্য। এর মধ্যে আছে কার্পেট, ওয়াশিং মেশিন, আসবাব, ফ্রিজ ও ছুরি-কাঁটা-চামচের মতো সামগ্রী।

তবে এসব পণ্যের দাম বাড়লে ভোক্তাদের ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি নাও হতে পারে। কারণ কানাডার ক্রেতারা এসব পণ্যের স্থানীয় বিকল্প বেছে নিতে পারেন।

ক্যাপিটাল ইকোনমিকসের উত্তর আমেরিকাবিষয়ক অর্থনীতিবিদ ব্র্যাডলি সন্ডার্স বলেন, ‘কানাডা এমন পণ্যকেই শুল্কের আওতায় এনেছে, যেগুলোর স্থানীয় বিকল্প সহজে পাওয়া যায়। ফলে আমেরিকান পণ্যের বদলে কানাডার তৈরি পণ্য কেনার সুযোগ রয়েছে।’

সবচেয়ে বড় ঝুঁকি চাকরিতে

শুল্কযুদ্ধের প্রভাব শুধু পণ্যের দামেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। এর বড় প্রভাব পড়তে পারে ব্যবসা ও কর্মসংস্থানে। দুই দেশের অনেক প্রতিষ্ঠান সীমান্তপারের সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। শুল্ক বাড়লে তাদের উৎপাদন ব্যয় বাড়বে। একই সঙ্গে ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত নেয়া কঠিন হবে। পাশাপাশি নতুন বিনিয়োগের পরিকল্পনা পিছিয়ে যেতে পারে। ফলে নতুন চাকরি তৈরির গতিও কমতে পারে।

সন্ডার্সের মতে, পরিবারগুলোর জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকি শুধু মূল্যবৃদ্ধি নয়, চাকরি হারানোও হতে পারে। উদাহরণ হিসেবে তিনি ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার একটি বিশেষায়িত আসবাব উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের কথা বলেন। যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য রফতানির ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক বসলে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবসা বন্ধ হওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। এর সরাসরি প্রভাব পড়বে সংশ্লিষ্ট কর্মীদের ওপর।

দীর্ঘমেয়াদে বাড়বে অনিশ্চয়তা

সাম্প্রতিক কানাডা-যুক্তরাষ্ট্র শুল্কযুদ্ধে মার্কিন ভোক্তাদের জীবনযাত্রার ব্যয়ে বড় ধরনের পরিবর্তন নাও আসতে পারে। তবে এর দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। বিশেষ করে উত্তর আমেরিকার মুক্তবাণিজ্য কাঠামো নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়ছে। কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র ও মেক্সিকোর মধ্যে কার্যকর মুক্তবাণিজ্য চুক্তিটি ইউএসএমসিএ নামে পরিচিত। কানাডা ও মেক্সিকো চুক্তিটি আরো ১৬ বছরের জন্য বাড়াতে চায়। তবে যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, বর্তমান কাঠামোয় তারা চুক্তিটি নবায়ন করবে না।

বিশ্লেষকদের মতে, চুক্তিটি এখনো কার্যকর থাকলেও শুল্কযুদ্ধ ভবিষ্যৎ আলোচনাকে জটিল করে তুলতে পারে। সীমান্তপারের বাণিজ্যে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে। ব্যবসাগুলো বিনিয়োগ ও সরবরাহ ব্যবস্থার বিষয়ে সতর্ক হয়ে উঠতে পারে।

ইয়েলের বাজেট ল্যাবের সহযোগী পরিচালক জন ইসেলিনের হিসাব অনুযায়ী, কানাডার সঙ্গে সাম্প্রতিক শুল্কযুদ্ধের কারণে গড়ে একজন মার্কিন পরিবারের অতিরিক্ত খরচ প্রায় ৩ ডলার হতে পারে। কিন্তু ট্রাম্পের বিশ্বের অন্যান্য দেশের সঙ্গে চলমান বাণিজ্যযুদ্ধও হিসাবের মধ্যে নিলে গড় মার্কিন পরিবারের অতিরিক্ত ব্যয় প্রায় ১ হাজার ডলারে উঠতে পারে।

ইসেলিনের মতে, কানাডার সঙ্গে বিরোধটিকে আলাদা করে দেখার সুযোগ কম। কারণ একই ধরনের শুল্কসংঘাত যুক্তরাষ্ট্রের আরো অনেক দেশের সঙ্গে চলছে। এসব পদক্ষেপ মিলেই ব্যবসার পরিবেশকে কঠিন করে তুলছে।

আরও