সিরিয়ায় আলাউয়িদের গণহত্যা: নতুন সরকারের ছায়ায় সহিংসতার নতুন অধ্যায়

সিরিয়ার নতুন সরকারের অধীনে মার্চ ৭ থেকে ৯ তারিখ পর্যন্ত দেশটির উপকূলীয় অঞ্চলে প্রায় ১,৫০০ আলাউয়ি ধর্মাবলম্বীকে হত্যা করা হয়েছে।

রয়টার্সের এক বিস্তৃত অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, মার্চে সিরিয়ার উপকূলীয় অঞ্চলে আলাউয়িদের বিরুদ্ধে সংঘটিত হত্যাকাণ্ড ছিল পূর্বপরিকল্পিত। সংস্থাটি ২০০-র বেশি নিহত পরিবারের সদস্য, ৪০ জন নিরাপত্তা কর্মকর্তা, যোদ্ধা, ও তদন্তকারীর সঙ্গে কথা বলেছে এবং ভিডিও, সিসিটিভি ফুটেজ, ও হাতে লেখা মৃতের তালিকা পর্যালোচনা করেছে।

সিরিয়ার নতুন সরকারের অধীনে মার্চ ৭ থেকে ৯ তারিখ পর্যন্ত দেশটির উপকূলীয় অঞ্চলে প্রায় ১,৫০০ আলাউয়ি ধর্মাবলম্বীকে হত্যা করা হয়েছে। রয়টার্সের এক অনুসন্ধানে জানা যায়, এই সহিংসতা পরিকল্পিতভাবে পরিচালিত এবং এর কমান্ড চেইন পৌঁছেছিল সরাসরি দামেস্ক পর্যন্ত। এই হত্যাকাণ্ড ঘটে বহিষ্কৃত প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের প্রতি অনুগত নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে নতুন বিদ্রোহের প্রতিশোধ হিসেবে। সরকার দাবি করেছে, বিদ্রোহে ২০০ জন নিরাপত্তা কর্মী নিহত হয়।

রয়টার্স ৪০টির বেশি স্থানে গণহত্যা ও লুটপাটের প্রমাণ পেয়েছে। নতুন প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারআর নেতৃত্বাধীন ইসলামপন্থী গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত বহু যোদ্ধা এই হত্যাকাণ্ডে অংশ নেয়। গোষ্ঠীটি একসময় আল-কায়েদার সিরিয় শাখা নুসরা ফ্রন্ট নামে পরিচিত ছিল।

রয়টার্সের এক বিস্তৃত অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, মার্চে সিরিয়ার উপকূলীয় অঞ্চলে আলাউয়িদের বিরুদ্ধে সংঘটিত হত্যাকাণ্ড ছিল পূর্বপরিকল্পিত। সংস্থাটি ২০০-র বেশি নিহত পরিবারের সদস্য, ৪০ জন নিরাপত্তা কর্মকর্তা, যোদ্ধা, ও তদন্তকারীর সঙ্গে কথা বলেছে এবং ভিডিও, সিসিটিভি ফুটেজ, ও হাতে লেখা মৃতের তালিকা পর্যালোচনা করেছে।

প্রতিশোধমূলক এই হামলায় বহু হামলাকারী নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের হত্যার জন্য নামের তালিকা নিয়ে এসেছিল—বিশেষ করে যারা পূর্বে আসাদ বাহিনীর সদস্য ছিলেন। হামলাকারীরা আলাউয়িদের ঘরবাড়ি লক্ষ্য করে অভিযান চালিয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে পুরো পরিবার খুন হয়েছে।

ভিডিওতে দেখা গেছে, মুখোশধারী যোদ্ধারা 'আলাউয়িদের জবাই করো' স্লোগান দিতে দিতে অভিযান চালায়। আলাউয়ি পুরুষদের কুকুরের মতো হামাগুড়ি দিতে ও ডাকতে বাধ্য করা হয়। অনেক ভিডিওতেই দেখা যায় মৃতদেহের স্তূপ। কিছু গ্রামে নারী, শিশু ও বৃদ্ধসহ সম্পূর্ণ পরিবার খুন হয়। এক এলাকায় ৪৫ নারীসহ ২৫৩ জন নিহত হয়েছে, আরেক গ্রামে ১০ শিশুসহ ৩০ জন নিহত।

প্রবেশকারী যোদ্ধারা সবার আগে প্রশ্ন করতো: 'তুমি সুন্নি না আলাউয়ি?' মূলত এ প্রশ্নই ছিল হত্যার সূচক।

৭ মার্চ ভোরে উপকূলবর্তী এম৪ ও এম১ মহাসড়ক ধরে ২৬টি স্থানে হামলা শুরু হয়। সবচেয়ে বড় হামলা হয় আল-মুখতারিয়াহ গ্রামে। সকাল ৬টায় শতাধিক সশস্ত্র ব্যক্তি বাড়িঘরে হানা দিয়ে মানুষজনকে টেনে বের করে হত্যা করে। এক ঘণ্টার মধ্যে ১৫৭ জন নিহত হয়, যা গ্রামের মোট জনসংখ্যার প্রায় এক চতুর্থাংশ। অনেক পরিবার পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। এক নারী বলেছিলেন, 'গুলির বৃষ্টি হচ্ছিল, কোথায় লুকাব বুঝতে পারিনি।' আরেক নারী নিহত স্বামীর লাশ দেখিয়ে বলেন, 'এটি আমার পরিবার।'

সবচেয়ে বেশি রক্তপাত হয়েছিল আসাদপন্থী আলাউয়ি সম্প্রদায়ের আল-ক্লাজিয়া গোষ্ঠীর গ্রামগুলোতে। সোনোবার গ্রামে এইচটিসির ইউনিট ৪০০ এবং আরও নয়টি মিলিশিয়া একযোগে হামলা চালায়। সেখানে কৃষক, ছাত্র, মেকানিকসহ বহু নিরস্ত্র মানুষকে হত্যা করা হয়। সুলতান সুলেইমান শাহ ব্রিগেডও এই হামলায় জড়িত ছিল বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছে।

৭ মার্চ সোনোবার গ্রামে ২৩৬ জন নিহত হয়। এদের বেশিরভাগ ১৬–৪০ বছরের তরুণ। এক নারী জানান, গর্ভবতী অবস্থায় গুলিবিদ্ধ হয়ে সন্তান হারান তিনি। আরেক নারী বলেন, পাঁচটি ভিন্ন মিলিশিয়া পালাক্রমে বাড়ি দখল করে ভয়াবহ নির্যাতন চালায়। রাতে স্বামীকে খুঁজে পান তিনি—চোখ ও বুকে গুলি করা এক লাশ।

এক বাড়ির দেয়ালে লেখা ছিল: 'তোমরা সংখ্যালঘু ছিলে, এখন নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছ।'

৮ মার্চ আল-রুসাফা গ্রামে নতুন হামলা হয়। বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন করে ঘরবন্দি মানুষজনকে বের করে ছেলেদের কুকুরের মতো হাঁটতে ও ডাকতে বাধ্য করা হয়। একজন বাবা ফোনে জানতে পারেন, ছেলেকে হত্যা করে হৃদপিণ্ড কেটে নেয়া হয়েছে। ওই দিন ৬০ আলাউই নিহত হয়, সবচেয়ে ছোটটি মাত্র ৪ বছরের শিশু। হামলাকারীরা দেয়ালে বার্তা লিখে যায়: 'আমরা সুন্নি পুরুষরা তোমাদের রক্ত ঝরাতে এসেছি।'

কুরফাইসের কাছে এক খামারের বারান্দায় চারজন মধ্যস্থতাকারী যোদ্ধাদের বোঝানোর চেষ্টা করেছিলেন যে গ্রামে আসাদপন্থী কেউ নেই। যোদ্ধারা আলোচনার মধ্যেই তাদের হত্যা করে।

পরদিন শনিবার নতুন ৮০টি গাড়ির বহর আসে। গুলি ছুঁড়ে সবাইকে আতঙ্কিত করে তোলা হয়। দুই দিনে ২৩ জন নিহত হয়। ৯ মার্চে সহিংসতা কমতে শুরু করে। মৃতদেহ গোপনে কবর দেয়া হচ্ছিল। বনিয়াসে ২৫৩ জনের লাশ মেলে। জাবলেহ শহরে ৭৭ জন আলাউই নিহত হন। এখানে ইউনিট ৪০০, ওসমান ব্রিগেড, সুলেমান শাহ, হামজা, ও বিদেশি যোদ্ধাদের তুর্কিস্তান ইসলামিক পার্টি হামলা চালায়।

লাতাকিয়া, তারতুস ও হামার বহু আলাউই গ্রাম ফাঁকা হয়ে গেছে। হাজার হাজার মানুষ রাশিয়ান ঘাঁটিতে আশ্রয় নেয় নতুন গণহত্যার ভয়ে। মে-জুনে আরো ২০ জন আলাউইকে গুলি করে হত্যা করা হয়। কে করেছে, জানা যায়নি।

জাতিসংঘকে জানানো হয়েছে কয়েক ডজন হামলাকারী আটক হয়েছে। কিন্তু মার্চের গণহত্যার জন্য কাউকে অভিযুক্ত করা হয়নি। সরকার মৃতদের কোনো সরকারি সংখ্যা দেয়নি।

প্রেসিডেন্ট আল-শারআ ডিসেম্বর মাসে বিভিন্ন মিলিশিয়া নেতাকে পদোন্নতি দেন। জইশ আল-ইসলাম, সুলতান সুলেমান শাহ, হামজা ডিভিশন ও তুর্কিস্তান ইসলামিক পার্টির নেতারা উচ্চপদে ওঠেন। মে মাসে তুর্কিস্তান ইসলামিক পার্টি সরাসরি সেনাবাহিনীতে যুক্ত হয়। ৩০ মে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় নতুন আচরণবিধি জারি করে, কিন্তু এই পদোন্নতি বা অভিযোগ নিয়ে কোনো মন্তব্য করেনি।

আর্জা গ্রামেও প্রতিশোধের হামলা হয়। এক সময় আসাদপন্থী আল-সুলেইমানরা প্রতিবেশী খাত্তাব গ্রামে আক্রমণ করেছিল। এবার খাত্তাবের লোকজন আর্জা আক্রমণ করে ২৩ জনকে হত্যা করে, বাকি বাসিন্দারা পালিয়ে যায়।

রয়টার্সের অনুসন্ধান বলছে, ৭-৯ মার্চে ১,৪৭৯ জন আলাউই নিহত হয়েছে, ৪০টি স্থানে গণহত্যা ও লুটপাট হয়েছে। স্থানীয়দের হাতে লেখা তালিকা, ছবি ও গণকবরের তথ্য যাচাই করে এই সংখ্যা নির্ধারণ করা হয়।সিরিয়ান নেটওয়ার্ক ফর হিউম্যান রাইটস বলছে, মোট নিহত ১,৬৬২ জন। সিরিয়ান অবজারভেটরি ফর হিউম্যান রাইটস বলছে, ১,৫৫৭ জন বেসামরিক মানুষ মারা গেছেন। তবে সরকার কোনো পূর্ণাঙ্গ হিসাব প্রকাশ করেনি।

সিরিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ও প্রেসিডেন্টের দপ্তর এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি। প্রেসিডেন্ট আল-শারআ এই সহিংসতার নিন্দা করে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন।

উপকূলীয় তর্তুস প্রদেশের গভর্নর আহমেদ আল-শামী স্বীকার করেছেন, অন্তত ৩৫০ জন নিহত হয়েছে। তবে তিনি দাবি করেন, আলাউয়িরা লক্ষ্যবস্তু ছিল না।

মূলত এই হত্যাকাণ্ডে হাজারো আলাউই নিহত হয়, বহু গ্রাম জনশূন্য হয়ে যায়, এবং অপরাধীদের অনেকে সরকারি বাহিনীর নেতৃত্বে পদোন্নতি পায়। এখনো সঠিক বিচারের কোনো উদ্যোগ হয়নি।

আরও