ফ্রান্সের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক সংকট এখন ইউরোপের আলোচনার কেন্দ্রে। মাত্র দুই বছরেরও কম সময়ে দেশটিতে পাঁচজন প্রধানমন্ত্রী পরিবর্তিত হয়েছেন। যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী রোমের রাজনৈতিক অস্থিরতাকেও ছাড়িয়ে গেছে। এমনকি ইতালির সংবাদপত্রগুলো ফ্রান্সের বিশৃঙ্খলাকে কৌতুক হিসেবে উপস্থাপন করছে।
পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখতে ২০২৪ সালের জুলাইয়ে আগাম নির্বাচন ডাকেন প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ। যদিও নতুন মন্ত্রীসভা এখনো কোনো কার্যকর সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেনি। বাজেট পাসের অনিশ্চয়তা, একের পর এক সাধারণ ধর্মঘট ও রাস্তায় বিক্ষোভ দেশকে ক্রমশ অচল অবস্থার দিকে ঠেলে দিয়েছে। এরমধ্যেই বৃহস্পতিবার ইউনিয়নগুলো পূর্ববর্তী বাজেট প্রস্তাবের বিরোধিতায় দেশব্যাপী ধর্মঘট ডেকেছিল।
ফ্রান্সে বাজেট প্রস্তাবের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ
সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে খোলামেলা উপহাস করেছে রোম ও তুরিনের সংবাদপত্রগুলো । সাবেক প্রধানমন্ত্রী ফ্রাঁসোয়া বাইরুর অপমানজনক পদত্যাগ, ঋণের অঙ্ক নিয়ন্ত্রণহীনভাবে বেড়ে যাওয়া, ফরাসি অর্থনীতি আইএমএফ-এর সাহায্যের মুখাপেক্ষী হওয়ার সম্ভাবনা—সবকিছু নিয়েই ব্যঙ্গাত্মক বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
সবচেয়ে বেশি আলোচিত হয়েছে প্রেসিডেন্ট মাখোঁর ক্ষীয়মাণ প্রভাব। রোমের ইল মেসাজারো পত্রিকার ‘এখন কোথায় সেই মহিমা?’—শিরোনামের প্রতিবেদন ইউরোপজুড়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বর্তমানে শুধু ঋণের সুদ পরিশোধেই ফ্রান্সকে ব্যয় করতে হচ্ছে ৬৭ বিলিয়ন ইউরো, যা শিক্ষা ও প্রতিরক্ষা বাদে অন্য সব সরকারি খাতের বাজেটের চেয়েও বেশি। পূর্বাভাস বলছে, দশক শেষে এ ব্যয় ১০০ বিলিয়ন ইউরোতে পৌঁছাতে পারে, যা শিক্ষাব্যয় ও প্রতিরক্ষা ব্যয়ের চেয়েও বেশি হবে।
গত শুক্রবার ফরাসি ঋণের মান কমিয়েছে আন্তর্জাতিক রেটিং সংস্থা ফিচ। ফলে সরকারের ঋণ নেয়ার খরচ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এতে ফ্রান্সের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও ঋণ শোধ করার সক্ষমতা নিয়ে আরো সন্দেহ তৈরি হয়েছে। এমনকি আইএমএফ বা ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের শরণাপন্ন হওয়ার সম্ভাবনাকেও এখন আর অবাস্তব ধরা হচ্ছে না।
ইউরোপজুড়ে যুদ্ধ, যুক্তরাষ্ট্রের বৈদেশিক অঙ্গীকার কমে আসা, সেইসঙ্গে জনগনের ক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে রাজনীতির উত্থানের মধ্যে ফ্রান্সের এই সংকট আরো তাৎপর্যপূর্ণ। এ পরিস্থিতিতে দেশটির প্রবীণ রাজনৈতিক বিশ্লেষক নিকোলা বাভেরেজ সতর্ক করে বলেছেন, ‘ফ্রান্স ও ইউরোপের সার্বভৌমত্ব এবং স্বাধীনতা যখন হুমকির মুখে, তখনই ফ্রান্স অচলাবস্থা, অক্ষমতা ও ঋণের বোঝায় বিপর্যস্ত।’
এই সংকটের সূত্রপাত ২০২৪ সালের গ্রীষ্মে। যখন মাখোঁ জাতীয় পরিষদ ভেঙে দিয়ে আগাম নির্বাচন ডাকেন। নির্বাচনের ফলে পার্লামেন্ট কেন্দ্র, বাম ও চরম ডানপন্থী— এ তিনভাগে বিভক্ত হয়। কার্যত কোনো দলই কার্যকর সরকার গঠন করতে সক্ষম হয়নি।
মিশেল বার্নিয়ে ও ফ্রাঁসোয়া বাইরু প্রধানমন্ত্রী হলেও বাজেট ও ঋণ প্রশ্নে টিকতে পারেননি। বাইরু ফ্রান্সের ৩ ট্রিলিয়ন ইউরোরও বেশি ঋণ (মোট দেশজ উৎপাদনের ১১৪ শতাংশ) নিয়ন্ত্রণে আনতে ২০২৬ সালের বাজেট থেকে ৪৪ বিলিয়ন ইউরো কমানোর প্রস্তাব দেন। কিন্তু বাম ও চরম ডানপন্থীদের অনাস্থা ভোটে তাকে বিদায় নিতে হয়। বিতর্কিত প্রস্তাবগুলোর মধ্যে আরো ছিল প্রতিরক্ষাব্যয়ের জন্য দুটি জাতীয় ছুটি বাতিলের পরিকল্পনা, যা জনগণের মধ্যেও ব্যাপক বিরোধিতার জন্ম দেয়।
ম্যাক্রোঁ এখন নিজের আস্থাভাজন ৩৯ বছর বয়সী সেবাস্তিয়েন লেকর্নুকে প্রধানমন্ত্রী করেছেন। লেকর্নু শান্ত-স্বভাবের এক নরম্যান, যিনি এলিসি প্রাসাদে রাতভর আলোচনা ও আড্ডায় মাখোঁর ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠেছেন। নতুন প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ দিয়ে মাঁখো বলেন, তিনি বিশ্বাস করেন রাজনৈতিক শক্তিগুলোর মধ্যে আপস সম্ভব। লেকর্নু নিজের রাজনৈতিক ক্যারিয়ার নিয়ে উচ্চাকাঙ্ক্ষী নন, এটাই তাকে মাঁখোর আস্থাভাজন করেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, লেকর্নুর আড়ালে কার্যত মাখোঁ নিজেই প্রধানমন্ত্রী।
সেবাস্তিয়েন লেকর্নু ও ইমানুয়েল মাঁখো
আইন অনুযায়ী, অক্টোবরের মধ্যেই নতুন বাজেট পেশ করতে হবে, আর বছর শেষের আগে তা অনুমোদন করাতে হবে। এটি কেবল পার্লামেন্টে বিদ্যমান সবগুলো পক্ষ ঐক্যমতে পৌঁছালেই সম্ভব।
কিন্তু মূল সমস্যা হলো—বামপন্থীদের দাবিগুলো (ধনীদের ওপর কর, ঋণ কমানোর লক্ষ্যমাত্রা হ্রাস, অবসর বয়স ৬৪ বছরে উন্নীত করার সংস্কার বাতিল) ডানপন্থী রিপাবলিকানদের কাছে একেবারেই অগ্রহণযোগ্য। রিপাবলিকানরা হুঁশিয়ারি দিয়েছে, এসব অন্তর্ভুক্ত হলে তারা বাজেটের বিপক্ষে ভোট দেবে।
এমনকি ফ্রান্সের প্রধান ব্যবসায়ী সংগঠন ঘোষণা দিয়েছে, কর বাড়ানোর প্রস্তাব এলে তারা রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করবে। এর মধ্যে আগামী মার্চে পৌরসভা নির্বাচন, ২০২৭ সালের মে মাসে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন পরিস্থিতিকে আরো জটিল করছে।
ফলে লেকর্নুর ঘাড়ে এসে পড়েছে ‘হারকিউলীয় দায়িত্ব’। সর্বোচ্চ সাফল্য হতে পারে একটি অস্থায়ী আপস টেনে পার্লামেন্টে হেরে যাওয়া ঠেকানো। কিন্তু এতে বাজারের কাছে বার্তা যাবে—ফ্রান্স কেবল সময়ক্ষেপণ করছে, ঋণের খরচ আরো বাড়বে। আর ব্যর্থ হলে তার পদত্যাগ অনিবার্য।
তবুও কেউ কেউ দেশ নিয়ে বেশ আশাবাদী। এ পরিস্থিতিতে সাবেক রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট জ্যঁ-ফ্রাঁসোয়া কোপে বলছেন , দেশের আমদানি-রপ্তানির ভারসাম্য দৃঢ়, বেকারত্ব খুব বেশি নয়, ব্যবসা তৈরির হারও ভালো এবং প্রবৃদ্ধিও জার্মানির চেয়ে বেশি। আরেক অর্থনীতিবিদ ফিলিপ আগিয়ঁওর অভিমত, গ্রীসের মতো আমরা ধসে যাচ্ছি না। তবে ঋণ নিয়ে বাইরুর সতর্কবার্তা প্রয়োজনীয় ছিল।
কিন্তু অন্যরা বলছেন, এ ধরনের আশাবাদ আত্মতুষ্টির নামান্তর। প্যারিসের হাই ফাইন্যান্স ইনস্টিটিউটের পরিচালক ফিলিপ দেসার্তিন সতর্ক করে বলেছেন, ‘আমরা যেন একটি বাঁধের ওপর দাঁড়িয়ে আছি, যা দেখতে মজবুত মনে হলেও ভেতরে ভেতরে সমুদ্র তা খেয়ে ফেলছে। একদিন হঠাৎ সব ভেঙে পড়বে।’